তরুণদের ভাবনায় বাংলা নববর্ষ

আজ বাংলা নববর্ষের প্রথমদিন। চারদিকে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। প্রতিবছরই ব্যাপক জাঁকজমকের সাথে বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়। এই দিনটিকে উপলক্ষ করে কয়েকজন তরুণ তাদের ভাবনা ও প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন। গ্রন্থনা করেছেন শাকিরুল আলম শাকিল, মো. আরিফ হাসান ও জহিরুল কাইউম ফিরোজ

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০২২, ০০:১১

অনেক সময়ের, অনেক সংস্করণের মধ্য দিয়ে আজকের নববর্ষ উৎযাপন নিজস্ব একটা রূপ ও উদ্দেশ্যে এসে পৌঁছেছে। বর্তমান সময়ে নববর্ষ উৎযাপনের অন্য সব অনুসঙ্গের মধ্যে সবথেকে দরকারী হয়ে উঠেছে 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'। ১৯৮৯ সাল থেকে 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ'এর আয়োজনে এটি আমাদের নববর্ষ সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। ২০১৬ সানে 'ইউনেস্কো' এটিকে বিশেষত্ব দিলেও সেটা বিশেষ কথা না। আমরা এটাকে কতটুকু গ্রহণ করতে পারছি সেটা দেখার বিষয়। 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' র উদ্দেশ্য হলো আমাদের দেশীয় এবং রক্তের খুব কাছাকাছির গল্প-কথা, জিবনী সামগ্রী, ভাব ও প্রেম নিয়ে সার্বজনীন মঙ্গলের জন্য আরেকবার সবাই মিলে পথে নামা। মঙ্গল শোভাযাত্রা শিক্ষা দেয়, বড় কোন কাজ করতে বা পরিবর্তন আনতে বিশেষ বাজেট বা নির্ভরশীলতার প্রয়োজন পড়েনা। দরকার হয় সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তির। আশা রাখি এমনি কোন এক সম্মিলিত যাত্রা আমাদেরকে মঙ্গলের পথ দেখাবে।
—শাহনেওয়াজ পারভেজ, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

সূর্য ডুবলেই পৃথিবী আঁধারে ডুবে যায়। রাত ১২ টার পর থেকে নাকি নতুন তারিখ শুরু হয়। কিন্তু দিনের সুচনা হয় ভোরের সূর্য উঠার মাধ্যমে। এভাবেই একটি দিনের পর আরেকটি শুরু হয়। ১৪২৮ এর ৩০শে চৈত্রের পরের দিনের সূর্যের আগমনের মাধ্যমে ১৪২৯ বঙ্গাব্দের সূচনা ঘটে। সেদিন হয় পহেলা বৈশাখ, নববর্ষের প্রথম দিন। বাঙালীর ক্যালেন্ডারে নতুন বছর শুরু হয়। নববর্ষের প্রথম দিন আসলেই একটা গানের কথা মনে পড়ে যায়, রবী ঠাকুরের লেখা ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’। তার পাশাপাশি আরো অনেক গান শুনি এদিনে। দাদুর মুখে শুনেছি বহুকাল আগে নাকি এদিনে হালখাতা হতো, মেলা বসতো, যাত্রা পালা হতো, বিভিন্ন ধরনের মজার মজার খেলা হতো। যদিও এর কিছু কিছু এখনো হয়, তবে আগের সেই আমেজ এখন আর পাওয়া যায় না।

এখন নববর্ষের প্রথমদিন বাঙালীরা পান্তা ইলিশ খায়, প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রয়াসে। এই দিনকে কেন্দ্র করে তরুণ তরুণীরা পাঞ্জাবী শাড়ি পরে রাস্তায় বের হয় বিভিন্ন ধরনের শোভাযাত্রার জন্য৷ বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয় এদিনে। নববর্ষের প্রথম দিন পুরনো দিনে সকল অসত্য, অসুন্দর ও অমঙ্গলকে ঝেড়ে ফেলে সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলজনক বার্তা বয়ে আনে পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে থাকা বাঙালীর জন্য। পহেলা বৈশাখ বাঙালির জন্য একটা আনন্দঘন দিন উপহার দেয়।
—ফারিহা আলম ঝরা, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

 

একটি জাতির নিজস্ব পরিচয় গড়ে ওঠে কীভাবে— সহজ উত্তর হল, তার সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে। আমাদের বাঙালি জাতির সংস্কৃতির সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে মিশে আছে বাংলা নববর্ষের উৎসব। বাড়িতে বাড়িতে লেগে যায় উৎসবের আমেজ, যে আমেজে বাঙালি মাতোয়ারা হয়ে আছে হাজার বছর ধরে। দেশের সর্বস্তরের মানুষ যুগের পর যুগ ধরে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব পালন করে আসছে। তবে শহুরে যান্ত্রিকতা আর নাগরিক সংস্কৃতির চাপে আমাদের গ্রাম বাংলার চিরায়ত উৎসব যেন কিছুটা ম্রিয়মান। কৃত্রিমতার চাদরে ঢাকা পড়েছে প্রানের এ উৎসব। বর্তমানে আমরা দেখি বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে হয় নানবিধ আয়োজন, কিন্তু গ্রাম বাংলার প্রানের ছোঁয়াটাই যেন অনুপস্থিত। তাই শিকড়ের সাথে আত্মার যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করাই হোক আমাদের এবারের নববর্ষের লক্ষ্য, নববর্ষের নব আহ্বানে জেগে উঠুক আমাদের বাঙালি সত্ত্বা।
—শরীফ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

পহেলা বৈশাখ কথাটি অতি প্রাচীন হলেও মঙ্গল শোভাযাত্রা কথাটি আধুনিক কালের। পহেলা বৈশাখ শুধু নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার একটি উৎসব নয়, এটি বাংলার মানুষের ঐতিহ্যও বটে। ইউনেস্কো থেকে স্বীকৃতি পাওয়া দিনটিকে বাঙালি উৎসাহের সাথেই পালন করে। চারিদিকে সাজ সাজ রব ওঠে। আমি মনে করি, ধর্ম-বর্ণ সবকিছু ভুলে সার্বজনীনভাবে পহেলা বৈশাখকে বাংলার সংস্কৃতি হিসেবে সবার মেনে নেওয়া উচিত। কারণ ধর্ম যার যার প্রাণে, দিন শেষে কিন্তু আমাদের পরিচয়, আমরা বাঙালি।
—ফারহানা আফরিন নিলা, শিক্ষার্থী, নোয়াখালী সরকারি কলেজ

 

বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালির স্বীকৃতির অন্যতম দিক। বাঙালিয়ানাকে ফুটিয়ে তোলে এই আয়োজন। বৈশাখ মানে উদ্দীপনা। ভেতরের সত্তাকে জাগিয়ে তোলা। বৈশাখী আয়োজন অন্য সবকিছুর চেয়ে ভিন্ন তার নিজস্বতার কারণে। আমাদের সংস্কৃতির যে শক্তিশালী অবস্থান বাংলা ও বাঙালিকে আলাদা করে রেখেছে, তার অনেকখানি কৃতিত্ব এই পহেলা বৈশাখের।
—আরিফ আহমেদ, সংগঠক ও সমাজকর্মী

 


নববর্ষ কেবল প্রাত্যহিকতার জন্য জীবন থেকে মুক্তির আর নতুন সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে আসে না, বাঙালির জীবনে নববর্ষ আসে নানা অনুষ্ঠান আর উৎসবের ডালা সাজিয়ে। পহেলা বৈশাখ বাংলার প্রতিটি ঘর মেতে ওঠে নতুন আনন্দে। নতুন পোশাকে, নতুন শাড়ি গহনায় সাজে অনেকেই। বৈশাখী মেলায় মেতে উঠে বাংলার গ্রামগঞ্জ ও জনপদ। নগর জীবনেও বাংলা নববর্ষ জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন ও উৎসাহ উদযাপিত হয়। এ যেন বাংলার ইতিহাসের সাথে আধুনিকতার মেলা বন্ধন। ছেলেরা পড়ে যান করে পায়জামা-পাঞ্জাবি, মেয়েরা পরিধান করে লাল পেড়ে সাদা শাড়ি, কপালে টিপ, হাতে বাহারি রঙের চুড়ি, খোপায় ফুল, গলায় ফুলের মালা। আর পহেলা বৈশাখের শুভক্ষণে নতুন বছরকে বরণ এর আয়োজনে রাজধানী ঢাকায় এক আনন্দ মেলায় পরিণত হয়।

নববর্ষের উৎসব অনুষ্ঠান একটি সার্বজনীন অসম্প্রদায়িক অনুষ্ঠান। এ উৎসবের মধ্য দিয়ে আমাদের সামষ্টিক ও মানবিক চেতনা আরও উজ্জীবিত হয়। এই নবর্ষে কামনা করি আমরা যেন ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের ঊর্ধ্বে উঠে পারস্পরিক প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নির্মাণ করতে পারি সুন্দর সমাজ।
—মিরাজ উদ্দিন, শিক্ষার্থী, কবি নজরুল কলেজ, ঢাকা