মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ১৪ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ব্রিটেনের রানির পুরস্কার পেলেন বিদ্যানন্দের কিশোর

আপডেট : ১৯ মে ২০২২, ২১:৪১

অভাব সঙ্গী করে বেড়ে উঠা। প্রায়সময়ই পেট ভরে খেতে পারেননি। জীবনে হতাশ হয়ে একাধিকবার প্রাণনাশের চিন্তাও করেছেন; একসময় হতাশা থেকে জীবনের মানে খুঁজতে গিয়ে গড়ে তুলেছেন দাতব্য সংস্থা ‘বিদ্যানন্দ’। যার মাধ্যমে আজ হাজারো অসহায় মানুষের খাবার জুটছে; মাত্র এক টাকায় তারা পাচ্ছে শিক্ষা, চিকিৎসা ও আইনি সেবা। বলছিলাম অসহায়ের সহায় কিশোর কুমার দাশের গল্প।

কিশোরের বাবা ছিলেন তৃতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মচারী। বাবার সামান্য আয়ে পাঁচ ছেলেমেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো প্রতিনিয়ত। কিশোর ছিলেন পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয়। শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ থাকার কারণে স্কুলে কেউ তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করত না। পরিবারেও কিশোর ছিলেন আলাদা, অনেকটা একাকী।পড়াশোনায়ও ছিলেন পিছিয়ে, প্রতিবারই পরিক্ষায় ফেল করতেন কয়েক বিষয়ে। অবাক বিষয়, মাধ্যমিকে উঠেই নব্বই-পঁচানব্বই করে পাওয়া শুরু করলেন; পড়ালেখায় হয়ে গেলেন মনোযোগী। কিন্তু মাধ্যমিকের পর টাকার অভাবে দুই বছর বন্ধ ছিল পড়ালেখা। তারপর টিউশনি করিয়ে টাকা জমিয়ে আবার ভর্তি হন।

এরপর চুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন, অল্প সময়ের ব্যবধানেই চাকরি পেয়ে যান ওয়ারিদ টেলিকমে (এয়ারটেল)। পড়াশোনা শেষ হলো, চাকরি হলো, অভাব ঘুচল; কিন্তু হতাশা আবার সঙ্গী হলো। বিয়ের অল্পদিনে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ায় হতাশ জীবনে অত্মহত্যার চেষ্টা করেন। সেবার সৃষ্টিকর্তার কৃপায় বেঁচে যান। বেঁচে থাকা থেকে খুঁজতে শুরু করেন জীবনের মানে! এই জীবনের মানে খুঁজতে গিয়ে মানুষের সেবা করার এক মানবিক পথ খুঁজে পান। মাত্র পাঁচ জনকে নিয়ে পড়ব, শিখব, খেলব—এই স্লোগান ধারণ করে ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করেন বিদ্যানন্দের।

শুরুর দিকে নারায়ণগঞ্জের রেলস্টেশনে পথশিশুদের পড়ানো হতো। ধীরে ধীরে পরিধি বাড়লো। এখন সারাদেশে ১২টি শাখার অধীনে পাঁচটি বিদ্যালয়ে ১২ শতাধিক শিক্ষার্থীর পড়ালেখা করানো হয়। পাশাপাশি অসহায়, গরিব শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার দায়িত্ব নেওয়া হয়। বিদ্যানন্দ এখন লাখ লাখ অভুক্ত, বঞ্চিত, আশাহীন মানুষের বেঁচে থাকার ভরসা, আশার প্রদীপ।

কিশোর বোঝেন ক্ষুধার কষ্ট! ভাবলেন তার মতো লাখো মানুষ প্রতিনিয়ত ক্ষুধায় কষ্ট করছেন। তাদের জন্য কিছু করার চিন্তা করলেন। যেই চিন্তা সেই কাজ— অসহায়দের মুখে খাবার তুলে দিতে চালু করেন ‘এক টাকায় আহার’। পর্যাক্রমে সবার মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ‘এক টাকায় শিক্ষা’, গরিবদের চিকিৎসাসেবা দিতে ‘এক টাকায় চিকিৎসা’, আইনি সেবা দিতে ‘এক টাকায় আইন সেবা’সহ বেশ কয়েকটি প্রজেক্ট চালু করেন। এমন অভিনব উদ্যোগের কারণ হলো, কেউ যাতে বলতে না পারে বিনামূল্যে খাচ্ছে, পড়ছে, সেবা নিচ্ছে। তাই সেবার বিনিময় এক টাকা নিচ্ছেন। এসব প্রজেক্টের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য আইন সেবা সহজলভ্য হয়েছে, মাত্র এক টাকায় তারা অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে আইন সেবা পাচ্ছেন, গরিব ও অসহায় কিন্তু মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষাবৃত্তি পাচ্ছেন।

এছাড়াও বিয়ে, রমজান, ঈদ, পূজা-অর্চনাসহ বিভিন্ন উৎসবের দিনে ব্যতিক্রমী আয়োজন করে বিদ্যানন্দ। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের ১২টি শাখা থেকে এই ধরনের উত্সবগুলোতে সুবিধাবঞ্চিতদের মাঝে বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ, উৎসবের বিভিন্ন খরচসহ নানা উপহার সামগ্রিক বিতরণ করে থাকে। রাজবাড়ী, কক্সবাজারের রামু, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, রুমা, আলীকদম ও খাগড়াছড়িতে তাদের ছয়টি অনাথালয়ে কয়েকশ শিশু বিনামূল্যে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্হানসহ সকল মৌলিক সুবিধা পেয়ে থাকে।

করোনা শুরুর পর থেকেই সাধারণ মানুষের মাঝে হ্যান্ড সেনিটাইজার, মাস্ক বিতরণ করেছে সারাদেশে। কিশোর তার স্বেচ্ছাসেবী কাজের জন্য দেশের সাধারণ মানুষের মন যেমন জয় করেছেন, তেমনি বিদেশ থেকেও মিলেছে স্বীকৃতি। মানুষের ক্ষুধা দূরীকরণে পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ, জনগণের ক্ষমতায়ন, চিকিৎসা সেবা, আইনি সহয়তা এবং মানসম্পন্ন শিক্ষায় প্রবেশাধিকার উন্নত করতে অবদান রাখার জন্য এ বছর ‘কমনওয়েলথ পয়েন্টস অব লাইট’ পুরস্কার পেয়েছেন কিশোর। উল্লেখ্য, প্রতি বছর ৫৪টি কমনওয়েলথভুক্ত দেশ থেকে একজন করে অনুপ্রেরণামূলক স্বেচ্ছাসেবকদের ধন্যবাদ জানাতে এবং তাদের কাজের স্বীকৃতি জানাতে এ পুরস্কার দিয়ে থাকেন ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে উদ্ভূত পরিবর্তন মোকাবিলার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন রাদওয়ান মুজিব

বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে তাদের অনুভূতি

বাজেট ২০২২-২৩

তরুণরা যা ভাবছেন

ফোর্বসে সাত বাংলাদেশি তরুণ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

চা কিনলে ফ্রি বই পড়ার সুযোগ

নোয়াখালীর ক্রীড়াঙ্গনের ‘মিলন স্যার’ 

শিশুদের জন্য অনন্তার ‘টড-লার্ন’

দেশের সর্বাধুনিক শিক্ষা প্রযুক্তি নিয়ে শিখো’র পথচলা