মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট ২০২২, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা এবং একজন কাঙ্গাল হরিনাথ

আপডেট : ২১ মে ২০২২, ০২:৫২

উনিশ শতকে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে জন্ম নিয়েছিলেন একজন প্রাতঃস্মরণীয় সাংবাদিক, সমাজসংস্কারক ও প্রজাদরদি ব্যক্তিত্ব। তার নাম কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার। সেই ১৮৬৩ সালে স্বশিক্ষিত কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩-১৮৯৬) ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ নামের পত্রিকা সম্পাদনা ও যাবতীয় সাহিত্যকর্মে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন।

ইংরেজ আমলের গোড়ার দিকে কুষ্টিয়ার পরিচয় দিতে বলা হতো ‘কুমারখালীর কুষ্টিয়া’। কবি-সাহিত্যিক ও ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ পুরোনো জনপদ হচ্ছে কুমারখালী। সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার সম্পাদিত ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকা কলকাতার গিরীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন যন্ত্রে প্রথম মুদ্রিত হয়। পরবর্তীকালে ১৮৭৩ সালে কাঙ্গালের নিজ বাড়িতে প্রেস স্হাপনের পর সেখানেই প্রাচীন বাংলার অন্যতম এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো। কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার সম্পাদিত ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকায় প্রজাদের ওপর অত্যাচার ও নিপীড়ন-নির্যাতনের কথা তুলে ধরা হতো সাহসিকতার সঙ্গে।

সামাজিক সমস্যা-নিপীড়ন, শোষণ কিংবা যে কোনো অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হতো গ্রামবার্ত্তা পত্রিকায়। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় কলকাতার অদূরে কোনো এক গভীর জঙ্গলে বসে কাঙ্গাল হরিনাথ ইংরেজবিরোধী পুস্তিকা-লিফলেট প্রকাশ করতেন বলেও জনশ্রুতি রয়েছে। সংবাদপত্র ও সাহিত্যসেবী কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার তেমন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে না পারলেও শিক্ষা-সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চায় তার ছিল প্রবল আগ্রহ। হরিনাথ মজুমদারের ক্ষুরধার লেখনীর কারণে তত্কালে তার মুদ্রণযন্ত্রটি বাজেয়াপ্ত ও নিলামে বিক্রি করা হলে কুমারখালীর ব্যবসায়ী মুথুরানাথ বাবু তা কিনে নেন।

পরবর্তীকালে তিনি কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের কাছে এই মুদ্রণযন্ত্রটি হস্তান্তর করেন। তারপর থেকেই কাঙ্গাল কুঠিতে স্হাপিত সেই ছাপাখানাটি এম এন প্রেস নামেই পরিচিত লাভ করে। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কৃষক-প্রজা-রায়ত-শ্রমজীবী মানুষ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থের অনুকূলে সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা হিসাবে ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ কুমারখালীর নিভৃত মফস্সল থেকে প্রকাশিত হয়েছে টানা ২২ বছর। তত্কালে দারুণ সুখ্যাতি লাভকারী গ্রামবার্ত্তা পত্রিকাটি যুগের পর যুগ পেরিয়ে আজ অবধি সাংবাদিক- সাহিত্যসেবী ও গুণীজনদের কাছে চিরস্মরণীয়। ইতিহাস-ঐতিহ্যের নিদর্শন প্রাচীন বাংলার প্রথম মুদ্রণযন্ত্রটি কালের সাক্ষী হিসেবে এখন কুমারখালীর কুণ্ডুপাড়ায় কাঙ্গাল কুটিতে সংরক্ষিত। জরাজীর্ণ ও ক্ষয়িষ্ণু সেই এম এন প্রেসসহ মুদ্রণযন্ত্র ও ছাপায় ব্যবহূত ধাতব অক্ষরগুলো ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ লেখনীর এক উজ্জ্বল নিদর্শন ও কালের সাক্ষী হিসেবে আজও সংরক্ষিত কাঙ্গাল কুঠিতে।

আর্থিক দীনতায় বালক বয়সে কুমারখালী বাজারের এক কাপড়ের দোকানে দৈনিক দুই পয়সা বেতনে কাঙ্গাল হরিনাথ কাজ নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে ১৮৫০ সালে তিনি ৫১টি নীলকুঠির হেড অফিস কুমারখালীতে শিক্ষানবিশ হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। কিন্তু মানবদরদি ও সত্যনিষ্ঠ হরিনাথ বেশি দিন টিকে থাকতে পারেননি। নীলকুঠিতে স্বল্পকালীন কর্মজীবনে রায়ত-প্রজার ওপর কুঠিয়ালদের অত্যাচার ও শোষণের চিত্র নিজ চোখে দেখেন কাঙ্গাল হরিনাথ। ফলে শোষণের শৃঙ্খল ভাঙার চিন্তা থেকেই কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকা সম্পাদনার কাজে হাত দেন। 

তার পত্রিকায় প্রজাদের ওপর অত্যাচার, নিপীড়ন-নির্যাতনসহ জমিদার, মহাজন ও নীলকরদের বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে লিখেছেন কাঙ্গাল হরিনাথ। নিজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে না পারলেও শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চায় তার প্রবল আগ্রহ ছিল। তত্কালে কলকাতার বাইরে দূর মফস্সল কুমারখালীতে সাংবাদিকতা, শিক্ষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছিলেন কাঙ্গাল হরিনাথ। কিন্তু উপার্জনের নির্দিষ্ট উত্স না থাকায় গ্রামবার্ত্তা পত্রিকা প্রকাশ করতে ঋণগ্রস্ত হয়ে আক্ষরিক অর্থেই ‘কাঙ্গাল’ হয়ে পড়েন হরিনাথ মজুমদার। ১৮৫৪ সালে তিনি কুমারখালীতে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্হাপন করেন—যা এখনো ছড়াচ্ছে শিক্ষা ও জ্ঞানের দু্যতি। হরিনাথ ফকির লালনের শিষ্য ছিলেন। বাউল গানের ক্ষেত্রে কাঙ্গালের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি প্রায় ১ হাজার বাউল গান ও ৩৭টি বই লিখেছেন। ‘বিজয় বসন্ত’ তার লেখা প্রথম উপন্যাস। হরিনাথ মজুমদারের অনুপ্রেরণা ও সহায়তায় বিষাদ-সিন্ধুর রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন, জলধর সেন, চন্দ্রশেখর করের মধ্যে সাহিত্যনুরাগ সঞ্চারিত হয়েছিল।

উল্লেখ্য, মুদ্রণযন্ত্রটির মাথার ওপর ডানা প্রসারিত ইগল পাখিটা ওপর থেকে নিচের দিকে উড়ে এসে আবার যথাস্হানে ফিরে যেত—ছাপাকালে এমন চিত্রই ফুটে উঠত। লন্ডনের ১০ ফিন্সবারি স্ট্রিটের ক্লাইমার ডিক্সন অ্যান্ড কোম্পানি থেকে ১৮৬৭ সালে এ মুদ্রণযন্ত্রটি তৈরি। কুমারখালীতে ছাপাকল প্রতিষ্ঠার খবরটি তত্কালে কলকাতার অমৃতবাজার পত্রিকায় (বাংলা ১২৮০ সালের ১৭ শ্রাবণ সংখ্যায়) প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৮৪ সালের পর থেকে এ যন্ত্রটিতে ছাপা বন্ধ রয়েছে বলে হরিনাথের পঞ্চম বংশধর অশোক মজুমদারের স্ত্রী গীতা মজুমদার জানান।

উনিশ শতকের গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃত্ ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির প্রতিনিধি ছিলেন কাঙ্গাল হরিনাথ। তিনি একাধারে ছিলেন সাহিত্যসাধক, সাংবাদিক, সমাজসংস্কারক, শিক্ষাব্রতী, জনহিতৈষী ও প্রজাদরদি। তিনি কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে এক দরিদ্র পরিবারে ১৮৩৩ সালের ২২ জুলাই (বাংলা ১২৪০ সালে ৫ শ্রাবণ) জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম হলধর মজুমদার ও মাতা কমলিনী দেবী। হরিনাথ মজুমদার ১৮৯৬ সালের ১৬ এপ্রিল মৃতু্যবরণ করেন। মৃতু্যর পর তার নিজ বাসগৃহের একটি কক্ষের মধ্যেই তাকে সমাহিত করা হয়।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ২০১৭ সালে কাঙ্গাল কুঠির সন্নিকটে কুমারখালী শহরে লালচে ইট রঙের নয়নাভিরাম কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর স্হাপন করা হয়েছে। প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দ্বিতল ভবনের জাদুঘরটি খুবই মনোমুগ্ধকর। জাদুঘরের দোতলায় হরিনাথ মজুমদার, কবি-সাহিত্যিক বিভিন্ন মনীষীর ছবি, মুদ্রণযন্ত্রের অবিকল নকল ছবি, ছাপাখানায় ব্যবহূত ধাতব টাইপ সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

এছাড়া দোতলায় লাইব্রেরিতে রয়েছে সাহিত্য, গদ্য-পদ্যসহ পাঁচ শতাধিক বই। নিচতলায় ১০০ আসনবিশিষ্ট অত্যাধুনিক অডিটোরিয়াম। হরিনাথ মজুমদারের বংশধররা অডিটোরিয়ামে হস্তান্তর না করে পুরোনো সেই এম এন প্রেসের জীর্ণ ঘরেই মুদ্রণযন্ত্রটি আটকে রেখেছে। হরিনাথের পঞ্চম বংশের দুই ছেলে ও দুই ছেলের স্ত্রীকে অডিটোরিয়ামে চাকরিসহ ছয়টি শর্ত উল্লেখ করে হরিনাথের চতুর্থ বংশের গীতা রানী মজুমদার জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালককে আবেদনপত্র দেন। ঐ আবেদনপত্রের কোনো সাড়া না পাওয়ায় তারা ঐতিহ্যমণ্ডিত মুদ্রণযন্ত্রটি অডিটোরিয়ামে হস্তান্তরে আপত্তি জানিয়েছেন। জাদুঘরের প্রবেশপথের সামনে কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের আবক্ষ প্রতিকৃতিসহ উন্মুক্ত মঞ্চ। এ উন্মুক্ত মঞ্চে জাদুঘর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব আয়োজন কিংবা যে কোনো সংগঠন ৩ হাজার টাকা ভাড়ায় আলোচনাসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদি পালন করতে পারে।

লেখক-ইত্তেফাকের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি।

ইত্তেফাক/বিএএফ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পবিত্র আশুরা: অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের চেতনা

কাঁচা মরিচের ডাবল সেঞ্চুরি

বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও ‘আদিবাসী’ প্রসঙ্গ

হিরোশিমা ও নাগাসাকি ট্র্যাজেডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

অর্থনীতিতে জ্বালানি মূল্যস্ফীতির প্রভাব

পবিত্র আশুরার তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য

প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা

বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের নেপথ্যের কারিগর