ডেঙ্গুর ভয়াবহতা যেন ফি বৎসরই নূতনরূপে আমাদের সামনে হাজির হইতেছে। আশঙ্কা করা হইতেছে, এই বৎসরও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হইয়া উঠিবে, যাহা ইহারই মধ্যে দৃশ্যমান। গত জুনের তুলনায় চলতি জুলাই মাসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হইয়াছে। শুধু তাহাই নহে, গবেষণায় ডেঙ্গুর ধরন পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলিতেছে, বাড়িতেছে সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি। জানা গিয়াছে, চলতি বৎসরে আক্রান্তদের একটি বড় অংশের শরীরে ডেনভ-৩ ধরন শনাক্ত হইয়াছে। অর্থাৎ, বর্ষার দাপট যত বাড়িতেছে, ডেঙ্গুর আশঙ্কাও তত বৃদ্ধি পাইয়া চলিয়াছে।
এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত জুনে ডেঙ্গু আক্রান্ত ছিল ২ হাজার ৯০৭ জন। অথচ জুলাইয়ের মাত্র ২১ দিনেই আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়াইয়া গিয়াছে ৫ হাজার। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী দিনগুলিতে পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যাইতে পারে। বৎসরের শুরুতেই ঢাকা, বরগুনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব বিপজ্জনক পর্যায়ে থাকিবার খবর পাওয়া গিয়াছিল। তখনই সতর্ক করা হইয়াছিল যে, বর্ষা নামিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করিতে পারে। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান, এখন সেই আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ লইতেছে। উদ্বেগের বিষয় হইল, হাসপাতালে আসা অনেক রোগীর অবস্থা এখন জটিল হইতে জটিলতর। চিকিৎসকেরা বলিতেছেন, রক্তচাপ কমিয়া যাওয়া, পেটে ব্যথা, বমি কিংবা অন্যান্য উপসর্গ বেশি দেখা যাইতেছে। এমনকি জ্বর কমিয়া যাওয়ার পরও কোনো কোনো রোগীর শারীরিক জটিলতা দেখা দিতেছে। অর্থাৎ, ডেঙ্গুকে নিছক মৌসুমি জ্বর ভাবিয়া অবহেলা করিবার কোনো সুযোগ নাই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং যথাসময়ে উপযুক্ত চিকিৎসা ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি কমাইতে পারে।
প্রশ্ন হইল, আমরা সতর্ক হইব আর কবে? প্রতি বৎসর বর্ষা আসিবার পূর্বেই বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেন, তাগিদ দেন এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংসের; কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়িলে কিছুদিন ব্যাপক তৎপরতা চলিলেও পরিস্থিতি যখন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে, তখন সেই তৎপরতায় ভাটা পড়িয়া যায়। এইরূপ মন-মানসিকতার পরিবর্তন সাধন করিতে হইবে। এইখানে জনসাধারণের দায়িত্বও কম নহে। এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার জমা পানিতে বংশবিস্তার করে এবং দিনের বেলায়—বিশেষত সকাল ও বিকালের দিকে এই মশা কামড়াইলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হইবার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এই সকল বিষয়ে অনেকে আজও সচেতনতার পরিচয় দিতেছেন না। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের পাত্র, ভাঙা বোতল কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের জমা পানি এডিস মশার আদর্শ প্রজননস্থল। অর্থাৎ, অতি সামান্য অবহেলা হইতেই এডিসের বিস্তার ঘটিতেছে। এমতাবস্থায় বাড়িঘর ও আশপাশে পানি জমিতে দেওয়া যাইবে না। নিয়মিত বাড়ি ও আশপাশের আঙিনায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করিতে হইবে। এইখানে সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত তৎপরতাও জরুরি। কীটনাশকের কার্যকারিতা, লার্ভিসাইডের সঠিক প্রয়োগ, নিয়মিত মশা জরিপ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করিতে হইবে। শহরের পাশাপাশি নজরদারি বাড়াইতে হইবে গ্রামাঞ্চলেও। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলিতে পর্যাপ্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত জনবল প্রস্তুত রাখিতে হইবে। ক্ষুদ্রকায় মশকের নিকট আমাদের এই অসহায় আত্মসমর্পণ আর কতদিন ধরিয়া চলিবে? কথায় বলে, প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধই উত্তম। তাই ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হইবার পূর্বেই ডেঙ্গুর প্রজন্ম নির্বংশ করিতে উদ্যোগী হইতে হইবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে এডিস মশার বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হইতেছে। ফলে ডেঙ্গু মোকাবিলায় বর্ষাকেন্দ্রিক তৎপরতার পরিবর্তে বৎসরব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করা সবচাইতে জরুরি। এই ক্ষেত্রে আমরা সিংগাপুরের আদর্শ গ্রহণ করিতে পারি। তাহারা নিয়মিত মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ, প্রজননস্থল শনাক্তকরণ ও ধ্বংস এবং কঠোর জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাফল্য লাভ করিয়াছেন। আমাদেরও সেই নীতি ও কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করিতে হইবে।

