শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সেদিন যখন বিলুপ্ত হয়েছিলাম

আপডেট : ২৭ মে ২০২২, ১০:০৭

ওয়্যার স্ট্রিটের ঢাউস করিডরযুক্ত পুরনো একটি বাড়ির সব ক’টা দরজা ও জানালা ছিল খড়খড়ি দেওয়া। খড়খড়ি দেওয়া জানালাগুলোকে বলা হতো ল্যুভর উইন্ডো। বিরাট বিরাট ঐসব জানালা ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত নেমে এসেছে। সিঁড়িঘরের অনেকটা অংশ জুড়ে বিস্তৃত দু-তিনটে দরজা। লু্যভর উইন্ডোগুলোর ওপর আমরা নতুন করে গ্লাস বসিয়ে নিয়েছিলাম, পর্দাও টেনে দিয়েছিলাম। মোটা ও পুরু ওয়াল, কড়ি বর্গা দেওয়া ছাদ। মন কেমন করা গন্ধ বাড়িময়! ছাদে এখন আর খুব একটা যাই না তেমন। বাড়ির উলটোদিকে ইলেকট্রিসিটির ট্রান্সমিশন স্টেশন এবং রাথিয়াদের ফ্ল্যাট। গাইনি স্পেশালিস্ট সে। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করে বিসিএস-এর জন্য প্রস্ত্ততি নিচ্ছে। বিভিন্ন প্রাইভেট হসপিটালে প্র্যাকটিসও করে রাথিয়া। ওদের ফ্ল্যাটের সঙ্গেই আরো দুটো কটেজ পাশাপাশি।

সিঁড়ির রেলিংয়ে দু-হাত রেখে রাথিয়াদের ফ্ল্যাটের দিকে ঝুঁকে বিকেলের আকাশটাকে দেখছি। কখনো কালো, কখনো মুমূর্ষু সূর্যের আভা ঈষৎ মেঘাচ্ছন্ন, কখনো বা রংহীন ভেজা মেঘ আকাশকে আঘাত করছে জোরসে। সেদিনের বৃষ্টিতে দরজা-জানালার খড়খড়িগুলো ভিজে রংহীন হয়ে গিয়েছিল। আমার শরীরের টি-শার্টটাও বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। কিন্তু বৃষ্টি তো বাইরে, আমার টি-শার্ট কীভাবে ভিজল? তাহলে কি ভেন্টিলেটারের ফাঁক দিয়ে বৃষ্টি ছিটকে এসেছে? কী জানি, হতে পারে। আজ সারাটা দিন বৃষ্টি ঝরছে। যাকে বলে থেমে থেমে বর্ষণ! বাড়ির কম্পাউন্ডে বৃষ্টির পানি জমে গেছে।

সুলগ্না ভার্সিটি থেকে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই বাসায় ফিরল। মা বলল— কী দরকার ছিল এভাবে আসার? দেখিস, আজ তোর ঠান্ডা লাগবেই।

সুলগ্না বলল— এত চিন্তা কেন করছ মা? কিচ্ছু হবে না।

নিজের বেডরুমের দিকে চলে গেল সুলগ্না। মনে হয় ভেজা কাপড়চোপড়গুলো চেঞ্জ করবে সে! আমি তখনো সিঁড়ির রেলিং ধরেই দাঁড়িয়ে আছি। কী করব, ভাবছি। ভেজা টি-শার্ট গায়ে একটু শীত শীত করছে আমার। রুমে এলাম। টি-শার্টটা চেঞ্জ করে ওয়াড্রব থেকে আরেকটা টি-শার্ট বের করে গায়ে দিলাম। এমন স্যাঁতসেঁতে দিনে পুরনো সবকিছুকেই কেন জানি ভীষণ মনে পড়ে। ড্রয়ার থেকে পুরনো অ্যালবাম বের করলাম। আজ এতদিন পর অ্যালবামটার পাতা ওলটাতে ওলটাতে আনমনা হয়ে যেতে থাকলাম। ভার্সিটিতে পড়ার সময় কলাভবন, অপরাজেয় বাংলা, মধুর ক্যান্টিন, টিএসসিতে কত পোজের ছবি যে তুলতাম আমরা বন্ধুরা মিলে! মনে পড়ছে আজ কত কথা, কত রকম স্মৃতি! জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের সময়গুলোতে যারা পাশে থাকে, তারাও একদিন দূরে সরে যায়। অ্যালবামটা বন্ধ করলাম। বাইরে তখনো বৃষ্টির শনশন শব্দ। আজ কি তবে বৃষ্টিরা ভালোবেসে বেসে ঝরতেই থাকবে? সুলগ্না আমার রুমে এলো।

—বলল, কী করছিস ভাইয়া?

—কই, কিছু না তো! কিছু বলবি?

—আজ আপু ফোন করেছিল!

—নেহার?

—জি।

—ওর প্রেগন্যান্সির কী কান্ডিশন এখন?

—দু-এক দিনের মধ্যেই নাকি ওর ডেলিভেরি ডেট! হসপিটালে অ্যাডমিট করাতে হবে।

আমি বললাম—তো? এতে এত টেন্সড হওয়ার কী আছে?

সুলগ্নার চোখে-মুখে আমি দ্বিধা টের পেলাম। সেই দ্বিধা কীসের, বুঝতে পারিনি। সিজারিয়ান অপারেশন তো এখন একটা ফ্যাশন। তাহলে সুলগ্নার নিশ্বাস জুড়ে নিশ্চুপতা ফুটে উঠল কেন? ওর অস্তিত্বে আমি আগুন দেখছি, দুশ্চিন্তার আগুন।

২.
পেডিকেয়ার নিউবর্ন বেবি হসপিটাল, উত্তরা, ঢাকা। গতকাল ডেলিভারি পেইন উঠলে নেহারকে ওখানেই অ্যাডমিট করিয়েছে রাহেল। অ্যাজ অ্যা হাজব্যান্ড রাহেল ইজ কেয়ারিং ফর নেহার। হসপিটালের কেবিনগুলো গ্রিসলি রেসপেনডেন্ট অ্যান্ড ট্রান্সপ্যারেন্ট। টু সিং ইনভায়ার্নমেন্ট অব দ্য হসপিটাল উই উড বি ইমপ্রেজেস। আমরা তখন নেহারের জন্য বুকড কেবিনে বসে আছি। পাশের কেবিনের নিচের দিকে তিন-চারটে রক্তমাখা ত্যানা স্তূপ করে রাখা। সম্ভবত একটু আগেই সিজার করা হয়েছে। রক্ত-পুঁজ দেখলে আমার গা গুলিয়ে ওঠার অভ্যাসটা অনেক পুরনো। এখনো তার ব্যতিক্রম হলো না। গা গুলিয়ে উঠল। অনেকেরই বোধহয় এরকম হয়! কিন্তু কী করব? এটুকু তো মেনে নিতেই হবে। গাইনি স্পেশালিস্ট রাথিয়া নেহারের সিজারিয়ান অপারেশন করছে। রাহেল তখনো ক্লিনিকে আসেনি। আসেনি, ঠিক তা নয়! আমরা এখানে আসার পর সে বাসায় গেছে ফ্রেশ হওয়ার জন্য। কদিন থেকেই অনেক ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে ওকে। আমি কেবিন ছেড়ে বাইরে এলাম। গভীরভাবে তাকিয়ে আছি কোথায়, জানি না। মনে হলো আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলছি দূর অজানায়। নেহারের জন্য মনটা অস্হির হয়ে উঠছে খুব। সেদিন সুলগ্নাকে সাহস দিলেও আমিও যে মনে মনে ভেঙে পড়িনি, তা কিন্তু নয়! আমাদের ওয়্যার স্ট্রিটের বাড়িতে বিয়ের পর নেহার খুব একটা যেত না। রাহেলও ব্যস্ত থাকত ওর অফিস কিংবা ফ্যামিলি নিয়ে। অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ ছিল ওদের। সুলগ্নার মতো নেহারের সঙ্গেও আমার বন্ডিংটা ছিল ফ্রেন্ডলি। আমি এখন সম্পূর্ণ অপ্রস্ত্তত। দরজার ওপাশের কেবিনে তখনো কোনো সাড়া-শব্দ নেই। কান খাড়া করে বাইরে দাঁড়িয়ে আছি একা। মা আমার কাছে এলো। কী বিষণ্ন মা-র চেহারাখানি! বলল, তুই এখানে অনন্য?

—জি! কেন, কী হয়েছে

মা?

—না, কিছু হয়‌ি

ন।

মাও যে ভালো নেই, সে কথা তো আমার অজানা নয়। হতবাক হয়ে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আছি। দৃঢ়চেতা মনটা আমার আজ কেন ভেঙে ভেঙে পড়ছে বারবার?

৩.
সুইস উলের কামিজ, ইতালিয়ান সিল্কের স্কার্ফ আর রংদার সালোয়ারের ওপর ডাক্তারি অ্যাপ্রন পরে অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এলো রাথিয়া। অপারেশন সাকসেসফুল। মা-শিশু দুজনেই অনেক ভালো আছে। রাথিয়া আমাকে বলল, দেয়ার ইজ নো প্রবলেম। অল আর সাকসেসফুল মিস্টার অনন্য। আমি কী বলব, ভেবে পাচ্ছি না। রাথিয়ার দিকে তাকিয়ে আছি। সে তাকানোয় হয়তো বা টেকসই ভালোবাসা ছিল! আমার বুকের ঠিক মাঝখানটায় রিস্টওয়াচের মতো টিকটিক করছে হূত্পিণ্ডটা। কিছু কি বলব রাথিয়াকে? রাথিয়ার দৃষ্টিও যে আমাকে অবলোকন করছিল—ওর ঐ চাহনির দাগটানা ইতিহাস আমার সিক্স সেন্সকে নাড়া দিয়ে গিয়েছিল তখনই। ওর তাকানোয় আমি আমার জন্য পুনর্জন্মের ইতিকথা খঁুজে পেয়েছিলাম। হালকা-পাতলা গড়ন, মানানসই উচ্চতা, শ্যামবরণ গায়ের রং রাথিয়ার। ওর মায়াবী ঠোঁটের ওপর ছোট্ট একটা তিল, বড় বড় দুটো চোখ আমাকে বরাবরই ভীষণ টানে। রাথিয়া ওর চেম্বারে চলে গেল। আমি নেহারের পাশে গিয়ে বসলাম। নেহার ঘুমাচ্ছে। সেন্স ফেরেনি তখনো।

নেহারের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়লাম। এ কী, ওর মুখটা কেন জানি টোপা টোপা! প্রেগন্যান্সির সময় এরকম একটু-আধটু তো হয়ই। আমি রাথিয়ার চেম্বারের দিকে এগিয়ে গেলাম সময় পার করার জন্য। কিন্তু দরজার পর্দা টেনে ভেতরে দেখলাম রাথিয়া ওর চেম্বারে নেই। সে কি তাহলে চলে গেছে? ওর পিএ বলল—রাথিয়া ম্যাডাম তো এখনি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। অন্য হসপিটালে আরেকটা সিজারিয়ান অপারেশন আছে। কিছু বলতে হবে তাকে?

আমি বললাম, না!

স্বভাবতই আমি থমকে গেলাম। নিজের অজান্তেই রাথিয়াকে ঘিরে ভালোলাগাগুলো লাট খেতে থাকে বুকের ভেতর। আমি কি তাহলে টারশিয়েরি যুগের বিলুপ্ত কোনো প্রেমিকের ক্ষয়প্রাপ্ত ফসিল?

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন