মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট ২০২২, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা

আপডেট : ০৯ জুন ২০২২, ০৬:০৪

গত ১৮ মে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে পারে। ইউরোপের ‘শস্য ভান্ডার’ বলা হয় ইউক্রেনকে। বিশ্বের খাদ্যশস্যের বড় রপ্তানিকারক রাশিয়া এবং ইউক্রেন। চলমান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক খাদ্যসংকট তীব্রতর হচ্ছে। 

বিশ্ববাজারে গমসহ অনেক খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে গেছে। ইতিমধ্যে ভারত গম রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাছাড়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় সার রপ্তানিকারক দেশ রাশিয়া। যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বৈশিক বাজারে সারের সংকট দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশকে খাদ্যশস্যের বড় একটা অংশ আমদানি করতে হয়; অন্যদিকে কৃষিতে যে সার দরকার হয়, তার একটি বড় অংশও আমদানির ওপর নির্ভরশীল। কাজেই এ দুটি বিষয় আমাদের কৃষি এবং খাদ্য সরবারহের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে—এটি সহজেই অনুমেয়। তাৎক্ষনিক প্রভাব না পড়লেও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনা করে আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর জোর দিতে হবে।

প্রথমত, আমরা সার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ নই। দেশে রাসায়নিক সারের বিপুল চাহিদা থাকায় সার সরবরাহের ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আরো কিছুদিন চলতে থাকলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে বিশ্ববাজারে সারের দাম বাড়বে। সেজন্য আমাদের অভ্যন্তরীণ সার উৎপাদনের পরিমাণ বাড়াতে হবে। জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর জন্য কৃষকদের পর্যাপ্ত সহায়তা দিতে হবে। কোনোভাবেই যেন সারের অপচয় না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। তাছাড়া অনেক সময় কৃষকেরা বুঝতে পারেন না কোন জমিতে কতটুকু সার দিতে হয়। তিউনিসিয়া, মরোক্কোসহ যেসব দেশ থেকে আমরা সার আমদানি করে থাকি তাদের সঙ্গে আগে ভাগেই তিন অথবা পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তি করা যেতে পারে, যেন কোনোভাবেই রাসায়নিক সারের সংকটে উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যাহত না হয়।

দ্বিতীয়ত, ক্রমেই আমাদের কৃষিজমির পরিমাণ কমছে। আশার কথা হচ্ছে, নতুন নতুন জাতের উদ্ভাবনের ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পূর্বে যে জমিতে ২০ মণ ধান হতো সে জমিতে এখন ৩৫-৪০ মণ ধান হচ্ছে। একই সঙ্গে দুঃখের কথা হচ্ছে, দেশে উদ্ভাবিত উন্নত জাতের ফসলগুলো প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। এখনো সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ হচ্ছে অনেক জায়গায়। কৃষি জমির পরিমাণ চাইলেই বাড়ানো সম্ভব নয়, তাই উত্পাদনশীলতার ওপর জোর দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। যেহেতু বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট তীব্রতর হচ্ছে, সেহেতু আমাদের আগে থেকে পদক্ষেপ নিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে চেষ্টা করতে হবে। উন্নত জাতের ফসলের বীজ দেশের সর্বস্তরের কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ২০২১-২২ অর্থবছরে কৃষিখাতে মোট ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আসন্ন বাজেটে কৃষি খাতে প্রণোদনা আরো বাড়াতে পারলে ভালো হবে।

মোটকথা, কৃষিসেবা জোরদার করতে হবে। কৃষি প্রণোদনা বাড়াতে হবে। কৃষকের দোর গোড়ায় কৃষিসেবা পৌছাতে হবে। ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে হবে। মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা দায়িত্ব সহকারে কাজ করছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। সেবা পেতে অসুবিধা হলে হট লাইন নম্বরে কল করে অভিযোগ জানানোর সুযোগ রাখতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান কমছে, অথচ দেশের ১৮০ মিলিয়ন লোকের খাদ্য সরবারহ করছে কৃষি। তাই আমাদের কৃষির ওপর জোর দিতে হবে। কোনোভাবেই যেন আমাদের খাদ্যসংকটের মুখোমুখি হতে না হয়। সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ে দশ ফোঁড়। কাজেই যা করার এখনই করতে হবে।


লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/ ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

অর্থনীতিতে জ্বালানি মূল্যস্ফীতির প্রভাব

বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা 

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই সমন্বিত উদ্যোগ 

বইপড়ুয়া জাতির তালিকায় নাম নেই কেন?

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

সুপারচার্জড বায়োটেক ধান ধানের ফলন বাড়তে পারে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত 

আশার আলো ‘সৌরবিদ্যুৎ’ 

মোটরসাইকেল যেন মৃত্যুযান! 

বিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্ভাবনা