শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রাঙাদি

আপডেট : ১০ জুন ২০২২, ১১:৪৭

বয়সে কিছু বড় হলেও রাঙাদি আর আমি বন্ধুর মতোই ছিলাম। ঈশ্বর আছে কি নেই— এ নিয়ে আমার প্রিয় রাঙাদির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হতো। রাঙাদি সারা দিন লক্ষ্মী মেয়ের মতো ঘরের সব কাজ করত, কাউকে কোনো প্রশ্ন করত না, শুধু উত্তর দিত আর নানান জাতের নানা লেখকের বই পড়ত। প্রায় দশ বছর পর ওর সঙ্গে দেখা হয়ে খুব আনন্দ হলো। সে-ই এসেছে আমাকে দেখতে। অনেক দিন পর দেশে এসেছি। তার আনন্দিত মুখ আমার আনন্দ আরো বাড়িয়ে দিল।

তাকে পুরনো বিতর্ক মনে করিয়ে দিতেই সে শুরু করে দিল—জানিস, অনেকে বলে ঈশ্বর বলে কিছু নেই। এই কথা শুনলে আজকাল কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। কিন্তু ছোটবেলায় যখন কেউ এমন কথা বলত, শিউড়ে উঠতাম। আমার মামা প্রায়শই এ কথা বলত। আমার বাবাও বলত। তখন আমার বয়স বারো-তেরো বছর। সেই সময় আমি ভক্তিতে গদগদ থাকতাম। ঠাকুরকে নমো করার মধ্যে যে কী আনন্দ—তা আমিই জানতাম। কাউকে বলে বোঝাতে পারতাম না।

রাঙাদি এক মনে বলে যেতে লাগল, মামা এক লক্ষ্মীপুজোর দিন আমাকে খুব করে বোঝাল, ভগবান বলে কিছু নেই। ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেনি। মানুষই ঈশ্বরের সৃষ্টি করেছে। আমি অত্যন্ত আঘাত পেয়েছিলাম এ কথা শুনে। সাধ্যমতো তর্ক করেছিলাম। তর্কে আমার মামাই জিতেছিল, কারণ মামার বয়স অনেক বেশি। শিক্ষিত, অনেক পড়াশুনা করেছে, অর্থাত্ তার তূণে অনেক অস্ত্র আছে যা দিয়ে একটা বারো-তেরো বছরের মেয়েকে ঘায়েল করা নিতান্তই ছেলেখেলা। তর্কে হেরে আমি বিষণ² হয়ে বসে রইলাম। ধীরে ধীরে মামার যুক্তিগুলো নিজের মনে আলোচনা করতে লাগলাম এবং কিছু কিছু যুক্তি মেনেও নিলাম। অবশেষে ভাবতে বাধ্য হলাম ঈশ্বর বলে হয়তো কিছু নেই। কিন্তু তা হলে আমার কী হবে? আমার তো কোথাও দাঁড়াবার জায়গা থাকবে না। কিন্তু কিছু করার নেই, যা সত্যি, অর্থাত্ ঈশ্বর যে নেই, এই সত্যিকে মেনে নিতে হবে।

এরপর তুমি নাস্তিক হয়ে গেলে, তাই তো?

আমার প্রশ্ন শুনেই সে বলে উঠল, হ্যাঁ এরপর বহু বছর আমি নাস্তিক ছিলাম, ঈশ্বরকে ত্যাগ করেছিলাম যদিও ঈশ্বর আমাকে ত্যাগ করেননি আমার হূদয়দুয়ার বন্ধ থাকলেও, তিনি একপাশে ঘাপটি মেরে বসেছিলেন। ফিরে যাননি।

খুব কষ্ট হয়েছিল তোমার, তাই না?

আমার প্রশ্নের উত্তরে রাঙাদি এক মনে বলে যেতে লাগল, ঈশ্বরকে ত্যাগ করার জন্য কষ্টও পেয়েছি কম না। আমার মন কোনো আশ্রয় পাচ্ছিল না, ছায়া পাচ্ছিল না, নির্ভরতা পাচ্ছিল না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিক শক্তি পাচ্ছিলাম না। কারণ একটাই—ঈশ্বরকে দূরে ঠেলে রেখেছিলাম। আর যত কষ্ট পাচ্ছিলাম, ততই ঈশ্বরবিরোধী হয়ে পড়ছিলাম। মনে হচ্ছিল, ঈশ্বর বলে যদি কেউ থেকে থাকে তা হলে পৃথিবীতে এত কষ্ট কেন? সব চেয়ে কষ্ট পেতাম রবীন্দ্রনাথের পূজা পর্যায়ের গানগুলো গাইতে। ইস। রবীন্দ্রনাথও ঐ ভুলের বৃত্তে ঘুরে মরেছেন। আমার মামার মতো কোনো গাইডের দেখা পাননি। ঐ গানগুলো মানুষের মনকে প্রেমে ভক্তিতে ভরিয়ে দেয়। কিন্তু আমি যেহেতু প্রতারিত হব না, তাই ঐ গানগুলোকে একদম দূরে ঠেলে রেখেছিলাম। শুনবও না, গাইবও না, ব্যস। ফলে আমার কষ্টের সীমা-পরিসীমা ছিল না। একে তো অভাব দারিদ্রে্য অশান্তিতে ডুবে ছিলাম। তার ওপর এ যেন ডেকে অশান্তি আনা। অবশেষে এই যন্ত্রণার থেকে মুক্তি পাওয়া গেল। ঈশ্বর আমার কষ্ট দেখতে পারছিলেন না। তিনি নিজে আমাকে দেখা দিলেন।

ঐ যে মনে আছে তোর, যেবার খুব অসুস্হ হয়েছিলাম। প্রচণ্ড জ্বর, সঙ্গে কাশি, সর্দি, গলাব্যথা, মাথার যন্ত্রণা। সারা রাত ছটফট করেছি। সারা রাত বারবার ঘড়ি দেখেছি। ক’টা বাজে, কখন সকাল হবে? কখন ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনে খাব? কোনো ওষুধ হাতের কাছে ছিল না। ছটফট করতে করতে অবশেষে বিছানা থেকে উঠে পড়লাম, রাত থাকতেই। উঠে বাইরে বারান্দায় গিয়ে বসলাম, একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে। তখন প্রায় চারটে বাজে। চারদিক অন্ধকার। কিন্তু পুব আকাশের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে অন্ধকার যেন একটু হালকা হয়ে আসছে। পুব আকাশে শুকতারাটা জ্বলজ্বল করছে। মনে হচ্ছে শুকতারাটা আমার দিকে চেয়ে আছে, বলছে কীসের কষ্ট তোমার? আমি তো আছি। চারদিকে আবছা অন্ধকার, তারায় ভরা আকাশ। ধীরে ধীরে আলো ফুটছে। সেই সময় আমি ঈশ্বরকে যেন প্রত্যক্ষ দেখতে পেলাম। খুব কাঁদলাম; বললাম—ভগবান, তুমি আমাকে আর পরিত্যাগ কোরো না।

আমি বলে বসলাম, তার পর কি তোমার জীবন খুব সুখে ভরে গিয়েছিল?

রাঙাদি বলে উঠল, না, তা নয়, পরিস্থিতি একই ছিল—অভাব, দারিদ্র্য, অশান্তি, লোকের শত্রুতা সবকিছুই ছিল। কিন্তু আমি সে সবের সঙ্গে যুঝবার শক্তি পেয়েছিলাম। অন্যায় সহ্য করতাম না। যথাসাধ্য লড়তাম। ভগবান দেখছেন, ভগবান রুষ্ট হবেন। আমার ভিতরে একটা পরিবর্তন এসেছিল। মানসিক শক্তি বেড়ে গিয়েছিল। আর সব সময় বেশ আনন্দে থাকতাম, কেন জানি না।

রাঙাদি একমনে বলে গেল, এখন মনে প্রশ্ন জাগে মামা কেন আমাকে ঐভাবে নাস্তিকতা শেখাতে চেয়েছিল? আমার মা লক্ষ্মীপুজো করে, তাকে কখনো নাস্তিকতা বোঝায়নি। দিদা করে, তাকেও বোঝায়নি। দিদার মৃতু্যর পর পুজোর ভার ছিল মামিমার হাতে। মামা পুজোর উপকরণ নিয়মিত কিনে আনত। কোথাও কোনো সমস্যা ছিল না। তবে আমায় কেন? কারণ একটাই—আমার মধ্যে যে বিশ্বাস দেখেছিল, তাকে ভাঙতে চেয়েছিল। ওদের মধ্যে বিশ্বাস ছিল না। পুজো-আচ্চা করত নেহাত চিরাচরিত রীতি পালন করার জন্য। তবে মামা আমার একটা উপকার করেছিল। সেই সময় দুর্গা, লক্ষ্মী, কালী—সকল দেবতাকেই মনে মনে পূজা করতাম। কৃষ্ণ, রাধা থেকে শুরু করে রাজা হরিশচন্দ্র, আরো সব নানাপ্রকার পৌরাণিক মুনি-ঋষি কেউই আমার ভক্তির তালিকা থেকে বাদ যেত না। এমনকি লেনিনকেও পূজা করতাম। আমার বাবা ছিলেন বামপন্থি। লেনিন-মার্কসের সম্বন্ধে নানা চমত্কার কাহিনি বলতেন। শুনে মুগ্ধ হতাম। একবার লেনিনের জন্মদিনে তাঁর ফটোর সামনে হাতজোড় করে বসে পুজো করেছিলাম। কপালে চন্দনের ফোঁটা দিয়েছিলাম। মালাও পরিয়েছিলাম। মামা আমার মনকে অমন ধাক্কা না দিলে এখনো তেমনই অচেতন পূজক হয়ে থাকতাম। তখন যাকেই মহৎ মানুষ মনে হতো, তাকেই পুজো করতাম, অন্তত মনে মনে তো করতামই। এখন সে সবের থেকে মুক্তি পেয়েছি।

সব শুনে আমি বললাম, এখন ভাবলে নিশ্চয় তোমার হাসি পায়। কিন্তু সেই পূজার পাত্ররা অযোগ্য হলেও তোমার ভক্তিতে এতটুকু খাদ ছিল না। তাই তোমার পূজা ব্যর্থ হয়নি। রাঙাদি তার সুরেলা কণ্ঠে গেয়ে উঠল, রবীন্দ্রনাথের একটি গান:

‘বাইরে তুমি নানা বেশে ফেরো নানা ছলে

জানি নে তো আমার মালা দিয়েছি কার গলে।

আজকে দেখি পরান মাঝে, তোমার গলায় সব মালা যে

সব নিয়ে শেষ ধরা দিলে গভীর সর্বনাশে।’

 
ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন