শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আইনের চোখে ‘নগরবধূ’ 

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২২, ০৭:৪০

‘নগরবধূ’ বলতে আমাদের সমাজের দেহপসারিণীকে বোঝানো হয়। নগরবধূদের ক্রিয়া-কলাপ উপমহাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত হলেও তা সর্বদা সম্মানজনক ছিল না। বর্তমান বাংলাদেশের আইনি প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নগরবধূ বা যৌনবৃত্তির দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, আমাদের সংবিধানে জনস্বাস্হ্য ও নৈতিকতাবিরোধী কাজ নিবারণ করা রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(২) অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে বলে যে, জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতার জন্য হানিকর হিসেবে গণিকাবৃত্তি বা যৌনবৃত্তি নিরোধের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্হা গ্রহণ করবে। সেই কারণে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে বাংলাদেশের সংবিধান এবং বলবৎ আইন অনুসারে পেশা হিসেবে যৌনবৃত্তি কি অবৈধ?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশে বিদ্যমান ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধিসহ অনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৩৩, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ ইত্যাদি সব আইনে যৌনবৃত্তির উদ্দেশ্যে কাউকে বিক্রি করা, ক্রয় করা, ভাড়া নেওয়া এবং ভাড়া দেওয়া গুরুতর অপরাধ। সেই সঙ্গে কাউকে যৌনবৃত্তির কাজে উত্সাহিত করা, কোনো যৌনকর্মীর আয়ের ওপর জীবিকা নির্বাহ করা, বেআইনি বা অসত্ উদ্দেশ্যে নারী অপহরণ বা নারী ব্যবসা পরিচালনার জন্য যৌনপল্লি স্হাপন প্রভৃতি সব কিছু অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌনবৃত্তির উদ্দেশ্যে বিক্রি করা, ক্রয় করা, ভাড়া নেওয়া, ভাড়া দেওয়া দণ্ডবিধি ৩৭২ এবং ৩৭৩ ধারা অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং যার সাজা হিসেবে অপরাধীকে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা যায়। যৌনবৃত্তির কাজে উত্সাহিত করা, কোনো যৌনকর্মীর আয়ের ওপর জীবিকা নির্বাহ করা, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে যৌনকর্মী হিসেবে কাজে লাগানো ইত্যাদির শাস্তির কথা বলা আছে অনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৩৩ এর বিভিন্ন ধারাসমূহে। যেখানে উক্ত কাজগুলোর জন্য তিন বছর মেয়াদে কারাদণ্ড বা ১ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে। ২০১২ সালে তৈরি হওয়া মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে যৌনপল্লি স্হাপনের শাস্তিকে কঠোর করা হয়। যেখানে ১২ (১) ধারায় বলা আছে, কোনো ব্যক্তি পতিতালয় স্হাপন বা পরিচালনা করিলে অথবা তাহা স্হাপন বা পরিচালনা করিতে সক্রিয়ভাবে সহায়তা বা অংশগ্রহণ করিলে তিনি অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন এবং উক্তরূপ অপরাধের জন্য তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বত্সর এবং অনূ্যন ৩ (তিন) বত্সর সশ্রম কারাদণ্ডে এবং ইহার অনূ্যন ২০ (বিশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। উক্ত আইনের ১৩ ধারায় আরো বলা হয়েছে, যদি কেউ কোনো স্হানে পতিতাবৃত্তির উদ্দেশ্যে কাউকে ইশারা বা ভাষায় আহ্বান জানায়, তবে তাকে সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬-এ পতিতাবৃত্তির উদ্দেশ্যে কাউকে প্ররোচিত করা বা শোষণ করাকে উপদ্রব হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু কোনো আইনেই পুরুষকে যৌন সুখ ভোগ করাতে নিজেদের দেহ দিয়ে জীবিকা অর্জনকারী যৌনকর্মী বা তার পেশাকে অপরাধ বলা হয়নি এবং যৌনবৃত্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইন লিঙ্গ নিরপেক্ষ আচরণ করেনি, কারণ পুরুষ যৌনকর্মী বিষয়ে কোনো বিধান আইনে উল্লেখ নেই। বাংলাদেশের আইন পর্যালোচনায় দেখা যায়, যৌনকর্মীদের কর্মক্ষেত্র অবৈধ কিন্তু পেশা হিসেবে যৌনকর্ম করা অবৈধ না। সংবিধানসহ বলবত্ আইনগুলোতে গণিকাবৃত্তি বা যৌনবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ ও নিরোধের কথা বলা হলেও উক্ত পেশাকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়নি।

এই নিয়ে ১৯৯৯ সালের নারায়ণঞ্জের টানবাজার-নিমতলী যৌনপল্লি উচ্ছেদ ঘটনা অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। সেই উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে ১০০ জন যৌনকর্মী ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্হা’র সহায়তায় মহামান্য হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দাখিল করেন। সেই পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০০ সালে বিচারপতি মো. ফজলুল করিম ও বিচারপতি এম এ ওয়াহাব মিয়ার সমন্বয়ে গঠিত একটি ডিভিশন বেঞ্চে ঐতিহাসিক এক রায়ে মতামত দেন যে, প্রচলিত আইনে যাই থাকুক যৌনপল্লি পরিচালনা ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌনকর্মে নিয়োগ নিষিদ্ধ হলেও পেশাদার যৌনকর্ম কোনো আইনেই নিষিদ্ধ নয়। নারী যৌনকর্মীর বয়স ১৮ বছরের ওপরে হলে এবং যৌন ব্যবসাই তার একমাত্র আয়ের উত্স হিসেবে প্রমাণ করতে পারলে তিনি বৈধভাবে এই ব্যবসায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন। উক্ত রায়ে আরো বলা হয় যে, জীবন ও জীবিকার স্বাধীনতা ও আইনের সুরক্ষা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার সব নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য; যৌনকর্মীরাও তার বাইরে নন।

তাই বাংলাদেশের আইনি প্রেক্ষাপট বিবেচনায় প্রতীয়মান হয় যে, যৌনবৃত্তি জীবিকা হিসেবে বৈধ এবং আইন স্বীকৃত পেশা। সেই সঙ্গে উক্ত পেশাকে আইন দ্বারা যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা হয়েছে।

কেউ পেশাদার যৌনকর্মী হতে চাইলে, তাকে আদালতে উপস্হিত হয়ে হলফনামার মাধ্যমে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ঘোষণা করতে হবে যে, যৌনবৃত্তি ছাড়া তার অন্য কোনো পেশা না থাকায় স্বেচ্ছায় এই পেশা বেছে নিচ্ছেন এবং যৌনবৃত্তিই তার আয়ের একমাত্র উত্স। তবে শর্ত থাকে যে, ১৮ বছরের কম বয়সের কেউ কোনোভাবেই এ পেশায় যোগদান করতে পারবে না।

লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, ঢাকা

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন