শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ন্যান্সি পেলোসির সম্ভাব্য তাইওয়ান সফর ও চীনের প্রতিক্রিয়া

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২২, ০৭:১৫

বিগত কয়েক দিন যাবত বিশ্বরাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির সম্ভাব্য তাইওয়ান সফর| এ সফরকে ঘিরে ফোনে কথা বলেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন| পিপলস লিবারেশন আর্মি দিবসে প্রথমবারের মতো ডিএফ-১৭ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে চীন| ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরকে ঘিরে স্বভাবতই বেশ সতর্ক দেশটি| মূলত নানা ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাত যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ককে অবনতির দিকে নিয়ে গেছে| এসবের প্রেক্ষিতে বাইডেন এবং শির ফোনে কথা বলা বেশ জরুরি ছিল| যদিও এই ফোনকলের অন্যতম কারণ হলো— ‘তাইওয়ান ইস্যু’|
চীন ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, তাইওয়ান ইস্যুতে চীনা সরকার ও চীনা জনগণ সহাবস্থানে রয়েছে| জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রশ্নে চীনের ১.৪ বিলিয়নেরও বেশি জনগণ দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ| কাজেই চীনের জনমতকে লঙ্ঘন করার ফল খারাপ হবে| আগুন নিয়ে খেললে নিজের হাত পুড়বে| চীন আশা করে— মার্কিন পক্ষ এটি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারবে| মার্কিন পক্ষের উচিত হবে ‘এক চীন নীতি’ মেনে চলা এবং ‘থ্রি কমিউনিকস (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সরকার কর্তৃক প্রণীত যৌথ বিবৃতি)’ বাস্তবায়ন করা|

ন্যান্সি পেলোসির সম্ভাব্য তাইওয়ান সফরে তাইওয়ানে আসলে এমন কী ঘটতে পারে, যাতে এত উদ্বিগ্ন চীন; যার ফলে দুই পক্ষকে আলোচনায় বসতে হচ্ছে, সতর্ক অবস্হান নিতে হচ্ছে? ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ হয়ে গেছে ইতিমধ্যে| এর পরও এই সফরের সম্ভাবনাকে ঘিরে বেইজিং বেশ সতর্ক, শঙ্কিত! মূলত তাইপেতে পেলোসির মতো একজন হাই-প্রোফাইল রাজনীতিকের সফর চীনকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলছে| এতে চীনে যথেষ্ট অস্থিরতা, উত্তেজনা বিরাজ করছে| পেলোসির বিমানকে গুলি করার হুমকি দিয়ে টুইটারে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন গ্লোবাল টাইমসের সাবেক প্রধান সম্পাদক হু জিজিন| পরবর্তীকালে অবশ্য হুকে টুইটটি মুছে ফেলতে হয়|

চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ‘মার্কিন হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি তাইওয়ান সফর করলে চীনের সামরিক বাহিনী চুপ করে বসে থাকবে না|’ চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আসলেই ধাপ্পাবাজি বা গালগল্প করছে না| কেননা, ন্যান্সি পেলোসির সম্ভাব্য সফর ঘিরে পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) শক্তি প্রদর্শনস্বরূপ তাইওয়ানের উপকূলে লাইভ ফায়ার এক্সারসাইজ করেছে ইতিমধ্যেই| সামুদ্রিক মহড়া ও তাইওয়ান প্রণালির উপকূলবর্তী এলাকা বন্ধের ঘোষণাসংক্রান্ত একটি স্ক্রিনশট টুইটারে শেয়ার করেছে চীনের সংবাদমাধ্যম পিপলস ডেইলি| তাছাড়া, ফুজিয়ানে ট্যাংকসহ সামরিক সরঞ্জামাদি নিয়ে যাওয়ার একাধিক ভিডিও শেয়ার করা হয়েছে টেলিগ্রাম ও টুইটারে| ফুজিয়ান উপকূলে পিএলএ লাইভ ফায়ার এক্সারসাইজ করেছে বলে বেশ কিছু ভিডিওতে দাবি করা হয়| অবশ্য কিছু ভিডিও পুরোনো ছিল যেগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি|

পেলোসির সম্ভাব্য সফরকে ঘিরে চীনের সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল হয়ে উঠেছে| চীনা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরম ওয়েইবোতে ‘পিএলএ বসে থাকবে না এবং পেলোসি তাইওয়ান সফর করলে দেখে নেওয়া হবে’ হ্যাশট্যাগটি ১.৭২ বিলিয়ন বার দেখা হয়েছে| ‘পেলোসি তাইওয়ানের মূল ভূখণ্ডে গেলে নিষ্পত্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে’ হ্যাশট্যাগটি ওয়েইবোতে ৪৬০ মিলিয়ন বার দেখা হয়েছে| ‘পেলোসির সফরে পিএলএর প্রতিক্রিয়া কী’— এটি সর্বাধিকবার অনুসন্ধান করা হয়েছে চীনা সার্চ ইঞ্জিন বাইডুতে|

১৯৯৭ সালে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার নিউট গিংরিচের তাইওয়ান সফরের পর ন্যান্সি পেলোসির সফরটি হবে কোনো ‘হাই-প্রোফাইল সফর’ মার্কিন কর্মকর্তার সফর| তাই এ সফরকে ঘিরে এত উত্তেজনা—অস্থিরতা| যদিও আগেই ধারণা করা হয়েছিল, পেলোসির সফরটি হতে পারে সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ; কেননা, পেলোসির সম্ভাব্য সফরের সময়ে চীনে চলবে পিএলএ’র ৯৫তম বার্ষিকীর উদযাপন|

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ১লা আগস্ট তিন ব্যক্তিকে বিশেষ পদকে ভূষিত করেছেন| এর মধ্যে একটি পদক সেই সব ব্যক্তিদের জন্য যারা পিএলএ এবং সহযোগী সামরিক পরিষেবাগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন| পুরস্কার প্রাপ্ত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি হলেন কিয়ান কিহু, যিনি আন্ডারগ্রাউন্ড স্টিল গ্রেট ওয়াল তথা চীনের আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) মজুতকে পারমাণবিক আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য চীনের গোপন সুড়ঙ্গ ব্যবস্থার নির্মাতা| কিয়ান পিএলএ’র একজন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিত্ব, যিনি প্রতিপক্ষের ফার্স্ট স্ট্রাইক থেকে কৌশলগত মিসাইল রিজার্ভ রক্ষার মাধ্যমে চীনের সেকেন্ড স্ট্রাইক প্রতিরোধ ক্ষমতা সুরক্ষিত করার ব্যবস্থা করেছেন| ‘আন্ডারগ্রাউন্ড স্টিল গ্রেট ওয়াল’ হাইপারসনিক মিসাইলের আক্রমণকেও রুখে দিতে পারে বলে মনে করা হয়|

হাইপারসনিক ডিএফ-১৭ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম প্রকাশ্য ব্যবহারের একটি ক্লিপ প্রকাশ করেছে চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন মিলিটারি চ্যানেল| ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি রোড-মোবাইল ট্রান্সপোর্টার ইরেক্টর লঞ্চার (টিইএল) থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়| চীনের হাতে যে হাইপারসনিক ডিএফ-১৭ মিসাইলের মজুত আছে, তা বিশ্বের কাছে প্রথম প্রকাশ করা হয় ২০১৯ সালের অক্টোবরে জাতীয় দিবসের সামরিক কুচকাওয়াজের সময়| এই মিসাইলের অপারেশনাল রেঞ্জ ১,৮০০-২,৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে|

পিএলএ দিবসকে ঘিরে চীনা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের একটি জনপ্রিয় উইবো পোস্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে| ওয়েইবোতে পিএলএ’র ৮০তম গ্রুপ আর্মি ‘যুদ্ধের জন্য প্রস্ত্তত’ শিরোনামের পোস্টটিতে ১.৮ মিলিয়ন লাইক পড়েছে| বহু ব্যবহারকারী ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফর সংক্রান্ত পোস্টের সঙ্গে এটি লিঙ্ক করে দিয়েছেন|

শি জিনপিং দ্য ইউনাইটেড ফ্রন্ট ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্টের (ইউএফডব্লিউ) কেন্দ্রীয় সম্মেলনে বক্তৃতা করেছিলেন সর্বশেষ ২০১৫ সালে| সেখানে তিনি ঘোষণায় বলেছিলেন, ‘বিদেশী শক্তিগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্ক শক্তিশালী করা প্রয়োজন| জ্ঞান ও বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত করা দরকার| দেশপ্রেমিক বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিনিময় ও পারস্পরিক শিক্ষার প্রচার ও প্রসার অত্যন্ত জরুরি|’

বেইজিংয়ের যাবতীয় রাজনৈতিক কাজকর্ম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্য ইউনাইটেড ফ্রন্ট ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্টের (ইউএফডব্লিউ) গুরুত্ব অত্যধিক| অভ্যন্তরীণ কিংবা বৈদেশিক উভয় বিষয়েই ইউএফডব্লিউ মূলত চীনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর| ইউএফডব্লিউকে ‘জাদু অস্ত্র’ও বলা হয় দেশটিতে| তিব্বত এবং জিনজিয়াং ইস্যুর ক্ষেত্রেও ইউএফডব্লিউকে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হিসেবে বিবেচনা করা হয়|

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্যে অবশ্য বেইজিংয়ের নিজের ঘরেও একটি সংকট চলছে, যা বহু চীনা পরিবারকে উদ্বেগের মুখে ফেলেছে—আবাসন খাতের নিম্নমুখীতা| এ খাতের বাজার এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে| ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, সংকটের মুখে পড়া পরিবারগুলিকে ১৪৮ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দেওয়ার পরিকল্পনা করছে বেইজিং| ‘পিপলস ব্যাংক অব চায়না’ প্রাথমিকভাবে কম সুদে ঋণ ইস্যু করার কথা চিন্তা করছে| অসমাপ্ত গৃহ প্রকল্পের বিরুদ্ধে মর্টগেজ দিতে অস্বীকার করে একশর বেশি চীনা শহরের বহু পরিবারের সম্মিলিত প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে বেইলআউট দিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে| চলমান এই সংকটকে গেল বছরের এভারগ্রান্ডের আর্থিক অস্থিরতার কালো ছায়া হিসেবে দেখছেন অনেকেই|

যাই হোক, অভ্যন্তরীণ ছোট-বড় সংকটের মধ্যে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় কংগ্রেসকে সামনে রেখে ন্যান্সি পেলোসির সম্ভাব্য তাইওয়ান সফরকে ঘিরে একটা অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে চীন| যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কর্মকর্তা বা রাজনীতিকরা একেবারেই তাইওয়ানে যান না, বিষয়টি এমন নয়| কিছুদিন আগেও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও তাইপে সফরে গিয়েছিলেন| কিন্তু এবারের হিসাবটা আলাদা| ন্যান্সি পেলোসি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনীতিকদের একজন| প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের পরেই তার অবস্থান| ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাট দলের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতাও তিনি| মার্কিন রাজনৈতিক মহলে সবসময়ই তাকে কট্টর চীন-বিরোধী হিসেবে দেখা হয়| কেননা, চীনের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বরাবরই সোচ্চার| চীন সফরে গিয়ে তিয়েনানমেন স্কয়ারে গিয়েছিলেন তিনি| নির্বাসিত চীনা ভিন্নমতালম্বীদের সঙ্গে তার যোগাযোগের কথা সবারই জানা| কাজেই, এমন একজন ব্যক্তির তাইওয়ানে যাওয়ার পরিকল্পনাকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি উসকানি হিসেবে দেখছে চীন| বিশেষ করে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বর্তমান যে প্রেক্ষাপট, তাতে এই সময়ে ন্যান্সি পেলোসির এই সফর চীনের ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে অস্বস্তি তৈরি করছে|

হ লেখক :কলামিস্ট ও বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে চীনের সাবেক মিডিয়া সাংবাদিক| বর্তমানে লন্ডন ইউনিভার্সিটি অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে চীনের আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে কাজ করছেন

দ্য প্রিন্ট থেকে ভাষান্তর :সুমৃত্ খান সুজন

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কেন আমি তাইওয়ানে কংগ্রেসের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিলাম

ন্যান্সি পেলোসির সম্ভাব্য তাইওয়ান সফর ও চীনের প্রতিক্রিয়া

চীন সাগরে দ্বিপাক্ষিক সংঘাত ও তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ

বাইডেন প্রশাসনের নতুন চ্যালেঞ্জ