শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

মার্কিন অর্থসহায়তা কি ইউক্রেনকে রক্ষা করতে পারবে?

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৫:০৮

ইউক্রেনের মরিয়া আবেদনে কয়েক মাস ধরে দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে ইউক্রেনের জন্য ৬০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক সহায়তা অনুমোদন করে একটি বিল পাশ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস। যদিও সিনেটের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিকতা এখনো শেষ হয়নি। তবে আগেই সিনেট কর্তৃক অনুরূপ ব্যবস্থার অনুমোদন এবং ইউক্রেনের সহায়তায় বাইডেনের স্পষ্ট আগ্রহ থাকায় বাকি কাজ সম্পন্ন হতে বেশি সময় লাগবে না। প্রশ্ন উঠতে পারে, মার্কিন সহায়তা কি ইউক্রেনকে নিশ্চিত পরাজয় থেকে রক্ষা করতে পারবে? এর উত্তর মোটেও সহজ নয়। তবে এটা নিশ্চিত বলা যায়, এখন অল্প সময়ের জন্য হলেও ইউক্রেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার সুযোগ পাবে এবং কিছু ক্ষেত্রে তারা রাশিয়ার আক্রমণকে প্রতিহত করার শক্তি ও সাহস জোগাড় করতে পারবে।

সিনেট ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুমোদন ছাড়াও ইউক্রেনকে এখনো কিছু লজিস্টিক জটিলতা কাটিয়ে উঠতে হবে। জরুরি কাজে ব্যবহূত সামরিক মেশিনারি, বিশেষ করে প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ ইতিমধ্যে পোল্যান্ডে মজুত করা হয়েছে। তবে সেগুলোকে যুদ্ধের ময়দানে সামনের সারিতে নিয়ে যাওয়া এবং সেখানে ইউক্রেনীয় সেনাদের দ্বারা প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ কাজে ব্যবহার করার জন্য কী কৌশল অবলম্বন করা হবে, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। মার্কিন সহায়তা আসার সংবাদ শুনে ইউক্রেনীয় সেনাদের মনোবল কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পাবে। মনোবল সঞ্চারের পাশাপাশি নতুন মার্কিন সরবরাহ ইউক্রেন পৌঁছানোর পর যুদ্ধের ময়দানে ইউক্রেনের বর্তমান পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই মার্কিন সহায়তার প্রতিশ্রুতি রাশিয়ার বিরুদ্ধে জয় লাভ করতে ইউক্রেনকে কতটা এগিয়ে নিয়ে যাবে, তা বেশ কয়েকটি ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভর করছে। কারণ প্রতিশ্রুত মার্কিন সহায়তার আর্থিক মানদণ্ড ছাড়াও একটা রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসে এই বিল পাশ হতে দেরি হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল প্রেসিডেনসিয়াল নির্বাচনের বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতা। কয়েক মাস ধরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানানোর পর গত সপ্তাহে ট্রাম্প রিপাবলিকান হাউজের স্পিকার মাইক জনসনকে বিল পাশের জন্য ভোটাভুটির ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান। তবে বেশির ভাগ রিপাবলিকান সদস্যরাই বিল পাশের বিরোধিতা করেন।

চলতি বছরের নভেম্বর নির্বাচনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি হোয়াইট হাউজে ফিরে আসেন, তাহলে ইউক্রেন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বিরুদ্ধে তার ব্যক্তিগত ক্ষোভ প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাছাড়া ট্রাম্পের মুখে ভ্লাদিমির পুতিনের প্রশংসা শুনে বোঝা যায়, ট্রাম্প জয়লাভ করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়া ও ইউক্রেনের ত্রিভুজ সম্পর্কের নতুন মোড় দেখা যেতে পারে। ইউক্রেনের সমর্থনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা প্রদানের বিল পাশ হওয়ার শেষ মুহূর্তে আটকে গিয়েছিল ইইউ-এর ২৭টি রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের মধ্যে মাত্র এক জনের রাশিয়াপন্থি ঝোঁকের কারণে। রাশিয়াপন্থি হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবান এখন স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকোর সমমনা মিত্র খুঁজে পেয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। রবার্ট ফিকো ইউক্রেনে পুনরায় সামরিক সহায়তা প্রদানের বিরোধিতা করেছিলেন এবং বলেছিলেন ইউক্রেনের উচিত মস্কোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা।

আগামী জুন মাসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাচনের পর ইউক্রেনের জন্য উন্মুক্ত সমর্থনের বিরোধিতাকারী রাশিয়াপন্থি সদস্যদের একটি বড় অংশ পুনরায় ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে অধিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও অর্থায়নের সিদ্ধান্তের ওপর তাদের প্রভাব অনেক বেশি সীমিত, তবে তারা অবশ্যই ইউক্রেনের ইইউ যোগদানের আলোচনায় ভেটো প্রদানের মাধ্যমে জটিলতা তৈরি করতে পারে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের প্রতিরক্ষা ঘাঁটিগুলো রাশিয়ার বর্ধিত সামরিক আউটপুট এবং তার নিজস্ব শক্তিশালী প্রতিরক্ষা খাতের তুলনায় খুবই দুর্বল। লম্বা সময় ধরে যুদ্ধে জড়িত থাকার পরও ইরান, উত্তর কোরিয়া এবং চীনের সমর্থন ও অস্ত্র সরবরাহের কারণে রাশিয়ার অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়নি।

ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৫ সালের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের পাশাপাশি ইউক্রেনে সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। একই সময়ে রাশিয়া তার সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বর্তমান হার বজায় রাখতে সক্ষম হবে কি না, তা নিয়েও কিছুটা সন্দেহ রয়েছে, বিশেষ করে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীন, ইরান ও মস্কোকে আরো বেশি সহায়তা প্রদান করা থেকে বিরত রাখতে পারে। তবে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক জটিলতা বৃদ্ধি পেলেও পশ্চিমের সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় টেকসই বিনিয়োগের অভাবে অদূর ভবিষ্যতে ক্ষমতার ভারসাম্যে যুগান্তকারী পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

উপরন্তু, যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের তুলনায় রাশিয়ার সামরিক সদস্যের সংখ্যা অনেক বেশি। তাছাড়া রাশিয়ার অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তেমন সুবিধা করতে পারছে না। মার্কিন সহায়তায় ইউক্রেন যদি রাশিয়ান সেনাদের আক্রমণ করে, তাহলে রাশিয়া যে কোনো মুহূর্তে তার আক্রমণ দ্বিগুণ করে দিতে পারে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা পৌঁছানোর আগেই রাশিয়া দ্রুত ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা দুর্বল করতে আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে।

পশ্চিমা বিশ্ব এই মুহূর্তে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, তার মধ্যে ইউক্রেনই একমাত্র বড় নিরাপত্তাসংকট নয়। মার্কিন হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভস তার ইউক্রেন সমর্থন বিল পাশ করার পাশাপাশি ইসরাইল ও তাইওয়ানের জন্য সম্ভাব্য ১০০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের সামরিক সমর্থনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। বিদ্যমান ৩৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের ফেডারেল ঋণের আলোকে এই ধরনের সহায়তা বিল পাশের সমর্থন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াটাই স্বাভাবিক।

বিশাল অঙ্কের এই মার্কিন-সহায়তার ফলে ইউক্রেন এক বছরের মধ্যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে জয়ী হবে, এমন অতিরিক্ত আশাবাদী চিন্তাভাবনা কতটুকু যুক্তিযুক্ত—তা সময়ই বলে দেবে। তবে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে এত সামরিক সহায়তা পাওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত যদি আলোচনার টেবিলে বসেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান করতে হয়, তাহলে এটা ইউক্রেনের পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বেরও একটা বড় পরাজয় বলে বিবেচিত হবে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যদি কোনো পক্ষেরই জয় না হয়, তাহলে এই যুদ্ধ যে আমাদের ধারণার চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

লেখক: যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘দ্য কনভারসেশন’-এর সম্পাদক
দ্য কনভার্সেশন থেকে অনুবাদ: আব্দুল্লাহ আল মামুন

ইত্তেফাক/এসটিএম