মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

হাসপাতালে হাঁসফাঁস 

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২২, ২১:৫৫

মেইন রোড ধরে হাঁটছিল মন্তাজ। পথচারী তেমন নেই। গাড়ি চলাচলও কম। কিন্তু কেন জানি হঠাৎ তার গাটা ছমছম করে উঠছে। চলতে চলতে পিছনে তাকিয়েই তার পিলেতে চমক। তেড়েফুড়ে ছুটে আসছে একটা জিপ। তার দিকেই।

মন্তাজ তাড়াহুড়ো করে রাস্তার এক পাশে সরে এলো। তাতেও নিরাপদ মনে হলো না। জিপটা এখন ফুটপাত ঘেঁষে ছুটে আসছে। কেন জানি জিপটার মতলব ভালো নয় বলে মনে হলো। সে চট করে ফুটপাতের উপর উঠে এলো। উঠে স্বস্তি। নিশ্চিন্ত হয়ে সামনে হাঁটা শুরু করল। কিছুদূর আপন মনে হাঁটতে হাঁটতে তার খেয়াল হলো, জিপটার যত তাড়াহুড়ো ছিল, সেটাকে তো ফুটপাতের পাশ দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে যেতে দেখা যায়নি! অন্য কোনো পথ বা গলি ধরে চলে গিয়েছে নাকি?

কৌতূহলে পিছনে তাকিয়ে দেখল, জিপটা এখনো তার পিছনে পিছনে আসছে। তবে তার হাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেন জানি তার স্পিডও এসেছে কমে। বেশ খানিকটা দূরত্বেই রয়েছে। এবার তাকে রাস্তা পেরুতে হবে। যেতে হবে ওপাশে। ওদিকেই তার গন্তব্য।

ফুটপাত থেকে নেমে এলো মেইন রোডে। এদিক ওদিক তাকিয়ে রাস্তাটা পেরুতে যাচ্ছে যেই, তখনই জিপটা হুড়মুড় করে এসে চড়াও হলো তারই উপর। পড়ে যেতে যেতে টের পেল, চোখের সামনে তারাবাতি জ্বলছে। ঐ ফাঁকেই ড্রাইভারকে দেখতে পেল। খুব বকবক করছে। কী বকবক কে জানে! তাকেই বোধহয় ধুমছে গালাগাল করছে। অপরাধ জিপের নয়, সেই বোধহয় লাফিয়ে এসে পড়েছে জিপের সামনে।

মুহূর্তে জ্ঞান লোপ। কতক্ষণ জানা নেই তার। বেশিক্ষণ নয় বোধহয়। এখনো সে রাস্তাতেই। চেতন ফিরলে দেখতে পেল, তিনজন দশাসই লোক তাকে চ্যাংদোলা করে কৌতূহলী মানুষজনের ভিড় ঠেলে রাস্তা পেরিয়ে যাচ্ছে।

সড়কের ওপাশেই একটা হাসপাতালে এনে তাকে তুলল। তার কাছ থেকে ফোনটা বের করে নিয়ে টেলিফোন করে করে স্বজনদের ডেকে এনে ভর্তি করিয়ে দিল হাসপাতালে। উত্তম চিকিত্সার জন্য। চিকিৎসা মানে মহাযজ্ঞ। চলল বেশ ক’দিন। আজ এটা তো কাল ওটা পরীক্ষা। এই ডাক্তার ঐ ডাক্তারের দেখাদেখি। সবাই বিশেষজ্ঞ। অজ্ঞ রোগীর ট্রিটমেন্টে ব্যতিব্যস্ত। নড়াচড়া কিছু কিছু কাটাছেঁড়া হতেও বাদ গেল না। এই করে করেই হাসপাতালে সুদর্শনা সুরূপা স্মার্ট নার্স-ব্রাদারদের সেবা-যত্ন-শুশ্রূষায় মন্তাজ একদিন তাজা তাজা বোধ করছে বলে মনে করল।

সুস্হতার নাম করে সার্টিফিকেটসহ হাসপাতাল থেকে যেদিন তাকে রিলিজ অর্ডার দেয়া হলো, সে সময়ই একইসঙ্গে তার হাতে ধরিয়ে দেয়া হলো বিপুল টাকার বিল। মন্তাজের পিলে আবারো চমক খেল। মাথায় জমতে থাকল বিন্দু বিন্দু ঘাম। ঘাম বুঝি পায়েও জমছে। ঘেমো পায়েই সে ছুটল হাসপাতালের বড়কর্তার সন্ধানে।

চেম্বারের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তার বুক এতটুকুও কাঁপল না। হাতে ধরা মোটা অঙ্কের বিল তার সাহসটা যেন বাড়িয়েই দিয়েছে। ঢুকেই পড়ল চেম্বারে।

জাঁদরেল সাহেব। একেবারে মুখোমুখি। বসে আছে নবাবজাদার ভঙ্গিতেই। রিভলবিং চেয়ারে।

দেখেই দুই পা পিছিয়ে গেল মন্তাজ। এবার হাসপাতালের হর্তাকর্তা সাহেবের মুখ দেখেই পিলেটা চমকে উঠেছে। এ তো সেই জিপটারই ড্রাইভার। ড্রাইভার সাহেব, নাকি সাহেব ড্রাইভার?

সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে বলল: বিল কমাতে তদবির করতে এসেছেন?

মন্তাজ ঘাবড়ে গিয়েছে। তার মুখ থেকে কথা যেন বেরুতেই চাইছে না। সে মুখটা কাঁচমাচু করে শুধু মাথা ঝাঁকাল।

সাহেবের কণ্ঠস্বরের গম্ভীরতায় এতটুকু চির ধরল না। পরিষ্কার গলায় জানিয়ে দিল: এক পয়সাও কম নয়। পাই-পয়সা হিসাব করে সব টাকা শোধ করতে হবে।

মন্তাজ পেছন ফিরে এক দৌড়ে বেরিয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যাবে কি না ভাবছিল। দরজার দিকে ফিরতে গিয়েই সে চমকে উঠল।

দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছে দশাসই সাইজের সেই তিনজন। নিষ্ঠুর বাঁকা হাসি তাদের মুখে। মন্তাজের মনে পড়ল, এই তিনজনই তাকে চ্যাংদোলা করে এমন একটা হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল, যে হাসপাতালের হর্তাকর্তা স্বয়ং ড্রাইভার হয়ে তার ঘাড়ের উপর জিপ তুলে দিয়েছিল।

ঠিক এ সময়ই এক অতিশয় সুন্দরী তরুণী চেম্বারে ঢুকল। তিন দশাসই সম্ভমের সঙ্গে দরজা থেকে সরে গিয়ে তার ঢোকার পথ করে দিল। তরুণী ভিতরে ঢুকতেই তারা আবার আগের মতো দরজা আগলে দাঁড়াল।

তরুণী মন্তাজের দিকে ফিরেও তাকাল না। এসে দাঁড়াল কর্তার পাশে। কর্তার ঠোঁটে মোলায়েম হাসি। তাকাল তরুণীর দিকে।

তরুণী বলল: মোটর ওয়ার্কসপ থেকে। জিপ মেরামতের বিলটা দিয়ে গিয়েছে স্যার।

কর্তার ইঙ্গিতে দরজায় দাঁড়ানো এক দশাসই এগিয়ে এসে তরুণীর হাত থেকে জিপ মেরামতের জন্য ওয়ার্কসপের বিলটা নিয়ে মন্তাজের হাতে ধরিয়ে দিল।

কর্তা এবার তার দিকে তাকিয়ে রুক্ষ কণ্ঠে বলল: দেখেছেন, আপনার কারণে আমার জিপটার কী দশা হয়েছিল, যার কারণে ওয়ার্কসপ ঘুরে আসতে হলো। হাসপাতালের বিলের সঙ্গে জিপ মেরামতের বিলটাও আপনাকেই দিতে হবে।

জিপ মেরামতের বিলে টাকার পরিমাণ দেখে মন্তাজের শরীরটা টলে উঠল। মাথাটাও চক্কর দিয়ে উঠছে।

চেম্বারের ফ্লোরে আবার পড়ে যাওয়ার উপক্রম হতেই তিন দশাসই দরজা থেকে ছুটে এসে তাকে ধরে ফেলল। চ্যাংদোলা করে তাকে নিয়ে আবার ছুটল এমার্জেন্সিতে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন