রোববার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

১৭ আগস্টের সেই নৈরাজ্য 

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২২, ০৩:৩৫

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশের ৬৩ জেলার প্রায় ৫০০ স্পটে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দেয় নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)। এতে দুই জন নিহত ও শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। এই সিরিজ বোমা হামলার পর জঙ্গিরা যে আলটিমেটাম দিয়েছিল তার ভিত্তিতেই তারা সুইসাইডাল অ্যাটাক করতে থাকে। জুডিশিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সঙ্গে যারা জড়িত, জুডিশিয়াল প্রসেসের জন্য নিবেদিত, অর্থাৎ বিচারক, উকিল ও পুলিশের ওপর হামলা চালানো হয়। এই তিন শ্রেণির ওপরই একাধিক হামলা করে বেশ কিছু ব্যক্তিকে হতাহত করে তারা। 

আসলে সেদিন ছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্য কঠিন এক দুঃসময়। বিএনপি-জামায়াত জোট তখন ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে। সেই আমলে ঘটেছে বিরোধী দল আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার পাঁয়তারা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল তৎকালীন সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে। শেখ হাসিনার ওপর সেই ভয়ংকর হামলার এক বছর অতিবাহিত হওয়ার আগেই শোকাবহ আগস্টেই ঘটে দেশব্যাপী বোমা হামলার ঘটনা। আগস্ট পরিণত হয় বিএনপি-জামায়াত তথা স্বাধীনতাবিরোধীদের জন্য উল্লাসের মাস। আর সাধারণ মানুষের কাছে এই মাস শোক ও শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং জঙ্গিবাদ প্রতিরোধের প্রতিজ্ঞার সময়।

অবশ্য আজ এই ২০২২ সালে উন্নয়নের সঙ্গে সুশাসন প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব প্রাধান্য পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহ রক্ষা পাচ্ছে। অপরাধীদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু জঙ্গিগোষ্ঠীর নানা অপতত্পরতার ইতিহাসও আমাদের মনে রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে গত ১৩ বছর দেশ জুড়ে নাশকতার প্রস্তুতি ও ধ্বংসাত্মক কাজের সন্ধান পাওয়া গেছে। র‍্যাব ও পুলিশের অভিযানে অনেকে ধরাও পড়েছে। এই অভিযান কেবল নয়, কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, সামাজিকভাবে তাদের প্রতিরোধ করাও জরুরি। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করে তরুণ সমাজকে দেশপ্রেমের মন্ত্রে অনুপ্রাণিত করতে হবে।

বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে বিনষ্ট এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টার অংশ হিসেবে জঙ্গিগোষ্ঠীরা বিভিন্ন ধরনের ঘটনা ঘটাতে সর্বদা সচেষ্ট। জঙ্গিবাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সহিংসতা তাদের মোক্ষম হাতিয়ার। জঙ্গিবাদীরা আক্রমণাত্মক আদর্শের অনুসারী এবং নিজেদের মতাদর্শকে সর্বশ্রেষ্ঠ মতাদর্শ হিসেবে বিবেচনা করে। এ দেশের জঙ্গিবাদীরা তাদের মতাদর্শের ধর্মীয়করণ ঘটিয়েছে। আর সেই বিভ্রান্তিকর ‘ধর্মীয় চেতনা’ ও মতাদর্শের আধিপত্য কায়েমের জন্য ভিন্নমতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের ঘোষণা দিয়ে উদার গণতন্ত্রের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফ্যাসিবাদী হিটলারের মতোই সব জঙ্গিবাদীর সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আক্রমণ, বলপ্রয়োগ এবং যুদ্ধ করে নিজের মতবাদ ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা।

বাংলাদেশে এযাবৎ চিহ্নিত জঙ্গি দল, গ্রুপ বা শক্তির সংখ্যা মোট ১২৫টি বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে কোনোটি হয়তো শুধু একটি ইউনিয়নের মধ্যেই কাজ করছে। কোনোটি হয়তো একটি অঞ্চলে কাজ চালায়, কোনোটি সারা দেশে কাজ করে আবার কোনোটির নেটওয়ার্ক হয়তো আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিস্তৃত রয়েছে। এই ১২৫টি সংগঠনের কোনোটিই কোনোটি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, যদিও আপাতদৃষ্টিতে এদের নাম, কর্মক্ষেত্র, নেতৃত্ব পরস্পর পৃথক বলে মনে হয়; কিন্তু এদের মূল যোগাযোগের ক্ষেত্রটি হচ্ছে ইসলাম কায়েমের জন্য ‘রাজনৈতিক ক্ষমতা’ দখলের অভিন্ন লক্ষ্য। এদের সবার গুরু হচ্ছে প্রধান ইসলামি রাজনৈতিক দল বর্তমানে নিবন্ধনহীন ‘জামায়াতে ইসলামী’।

বাংলাদেশের জন্মলগ্নে ১৯৭২ সালে আমরা যে সংবিধানটি পেয়েছিলাম তাতে ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র পরস্পর অবিচ্ছেদ্যভাবে মিলেছিল এবং তখন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব স্বাভাবিকভাবেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দেশের ইতিহাস উলটো দিকে ঘুরিয়ে দেন জিয়াউর রহমান। তার শাসনকালেই ধর্মভিত্তিক দলের রাজনীতি পুনরায় শুরু হয় এবং ধর্মীয় জঙ্গিবাদ বিস্তার লাভ করে। ১৯৮০-এর দশকে আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধে আমেরিকা ও পাকিস্তান আফগানিস্তানকে সহায়তা করে। এই যুদ্ধে আফগানিস্তানের পক্ষে জামায়াত-শিবিরের সদস্যসহ বেশ কিছু বাংলাদেশি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এরা পাকিস্তানে আইএসআইয়ের অধীনে এবং আফগানিস্তানে তালেবানদের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। পরে এদের মধ্যে কিছুসংখ্যক বাংলাদেশি প্যালেস্টাইন ও চেচনিয়া যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছিল। এরা প্রায় সবাই বাংলাদেশে ফিরে আসে। এসব যুদ্ধফেরত সদস্যই পরে বাংলাদেশে আইএসআই/তালেবান ও আল-কায়েদার স্থানীয় সদস্য হিসেবে এ দেশে আইএসআই/এলইটির (লস্কর-ই-তৈয়বা) এজেন্ট হিসেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মূলত আশির দশকের পর জামায়াতসহ মৌলবাদী সংগঠন ও তালেবানপন্থি গোষ্ঠী সংগঠিত হয়ে রাজনীতির আড়ালে ও ইসলামের নামে জঙ্গি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ বাংলাদেশকে মৌলবাদী ও তালেবান রাষ্ট্র বানানোর একই অভীষ্ট লক্ষ্যে কাজ শুরু করে। ১৯৯১-এ জামায়াতের সমর্থনসহ বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণ করার পর ১৯৯২ সালে জামায়াতের সহযোগিতায় জঙ্গি সংগঠন ‘হরকাতুল জিহাদ’ আত্মপ্রকাশ করে প্রকাশ্যে জিহাদের ঘোষণা দেয়। পরে কথিত জিহাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামি শাসন চালুর অভিন্ন আদর্শে জামায়াত ও ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলো একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ চালাতে থাকে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর ২০০৬ পর্যন্ত সারা দেশে জঙ্গিবাদের বিস্ময়কর উত্থান বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দেয়। কারণ জোট প্রশাসন জঙ্গিদের প্রত্যক্ষ সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিল। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টে জেএমবির দেশব্যাপী বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা।

তবে মনে রাখতে হবে, মানবতাবিরোধী চক্র, যারা নাশকতার মাধ্যমে দেশকে পাকিস্তান বানানোর উদ্যোগ নিয়েছিল, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী বোমা হামলা চালিয়ে তারা এখন নিশ্চিহ্ন। তবে গোপনে সংগঠিত জঙ্গিবাদী অন্যান্য গোষ্ঠী তাদের অপকৌশল বজায় রেখেছে। রুখতে হবে তাদের; তাদের জন্য বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যেন বিনষ্ট না হয় সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখা দরকার; যেন আর কখনো জঙ্গিবাদী তত্পরতায় মানুষের জীবন বিপন্ন না হয়।

লেখক : বঙ্গবন্ধু গবেষক এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন