শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শাহীন রেজা রাসেল

দেশের প্রথম জলবায়ু জাদুঘর প্রতিষ্ঠা হলো যার হাত ধরে

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২২, ০৪:০১

ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির প্রতি ভালোলাগা রাসেলের। স্কুলে পড়ার সময় এলাকার সমবয়সী বন্ধুদের নিয়ে গঠন করেন 'বার্ডস ক্লাব'। বাইনোকুলার হাতে তারা ছুটে যেতেন পাখি দেখতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর রাসেল গঠন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পরিবেশবাদী সংগঠন 'পরিবেশ সংসদ'। সেই রাসেল এবার গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশের প্রথম পরিবেশ ও জলবায়ু জাদুঘর। ছোট পরিসরে খড়কুটোয় তৈরি একটি কুঁড়েঘরে এই জাদুঘর যাত্রা করলেও এর পেছনের স্বপ্ন মোটেও ছোট নয়। রাসেল বিশ্বাস করেন, তার এই জাদুঘরের ভাবনা একদিন ছড়িয়ে যাবে বিশ্বমঞ্চে।

যার কথা বলছি, সেই তরুণের পুরো নাম শাহীন রেজা রাসেল। মাগুরা জেলার ছায়া সুনিবিড় শান্ত গ্রাম শ্রীপুরের সন্তান। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন দুরন্ত। ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন। পড়াশোনার পাশাপাশি জড়িত ছিলেন বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে। তবে খুব অল্পবয়সেই শরীরে বাসা বেঁধে বসে এক দুরারোগ্য ব্যধি। এই রোগের ফলে একপর্যায়ে চলাচলের শক্তি হারিয়ে ফেললেও মনোবল হারাননি। ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের ৬১টি জেলা। প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় মানুষকে সচেতন করতে কাজ করছেন দিনরাত।

মাগুরার শ্রীপুর গ্রামে সম্প্রতি তিনি পরিবেশ ও জলবায়ু জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেখানে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের গাছের পাতা, বীজ ও কাঠের দুই শতাধিকের বেশি নমুনা। রয়েছে বিভিন্ন জেলার মাটি, নদনদীর পানি এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ে বেশকিছু সচেতনতামূলক পোস্টার।

পরিবেশ ও জলবায়ু জাদুঘর। ছবি: সংগৃহীত

রাসেল বলেন, 'খুব ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি আমার এক ধরনের ভালোলাগা বা ভালোবাসা কাজ করতো। ২০০৪-০৫ সেশনে আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগে ভর্তি হই, সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো পরিবেশ সংগঠন ছিল না। আমি এই বিষয়টা নিয়ে কাজ শুরু করি। গড়ে তুলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ সংসদ।'

শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের শিক্ষার্থী হয়েও পরিবেশ নিয়ে কাজ করার প্রেরণা কী, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আমি মনে করি সমাজের শৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় থাকার সঙ্গে পরিবেশের নিবিড় সম্পর্ক। যেমন দেখুন সিডর বা আইলার মতো দুর্যোগগুলো আমাদের উপকূল এলাকার সাধারণ মানুষের জীবনে ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। তাদের শান্তি বিনষ্ট হয়। অথচ পরিবেশ বা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যদি আমরা সচেতন হই, তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করার একধরনের সামাজিক সমাধান তৈরি হবে। আমি আমার পড়াশোনার বিষয়ের সঙ্গে এভাবেই পরিবেশ সচেতনতার যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছি।'

রাসেল জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত থাকার সময় থেকেই পরিবেশ জাদুঘর নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা ছিল, তবে নানা ব্যস্ততায় তা হয়ে ওঠেনি। ২০১১ সালে তিনি স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ২০১৩ সালে চাকরিতে যোগ দেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর সহকারী পরিচালক হিসেবে। তিনি মনে করেন, বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম— যেখান থেকে উত্তরণের উপায় হলো জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর দিকগুলি সম্পর্কে মানুষকে ভালোভাবে জানানো।

এরপর গেল বছর করোনাকালে বাড়িতে থাকার সময় জাদুঘরের ভাবনাটি বাস্তবে রূপ দেন রাসেল। খড়কুটো আর বাঁশ-কাঠ দিয়ে একচালা ও পরিবেশবান্ধব একটি ঘর তৈরি করেন। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের জন্য পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে নানা উপকরণ দিয়ে সাজান জাদুঘরটি। জাদুঘরের ভেতরে দেয়ালে টাঙানো হয়েছে বেশকিছু পোস্টার। পরিবেশ দূষণের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও ছবি সংযোজন করা হয়েছে। কী কী কারণে পরিবেশ দূষণ হয়, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে। একজন দর্শনার্থী এই জাদুঘরে প্রবেশ করলে পরিবেশ সম্পর্কে নানা তথ্য পাবে, জানতে পারবে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর দিকগুলো।

পরিবেশ রক্ষায় মানুষকে সচেতন করতে শাহীন রেজা রাসেলের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ইতোমধ্যেই নানা মহলের প্রশংসা কুড়িয়েছে। অনেকেই জাদুঘর দেখতে যাচ্ছেন। ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিচ্ছেন। বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমও এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। রাসেল বলেন, সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই জাদুঘরকে বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করা সম্ভব। স্থানীয় স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা আগ্রহ নিয়ে দেখতে আসছেন এই পরিবেশ ও জলবায়ু জাদুঘর।

পরিবেশ ও জলবায়ু জাদুঘরের অন্দর। ছবি: সংগৃহীত

রাসেল বলেন, প্রকৃতি বদলে গেছে। এক ঋতুর আচরণ হয়ে গেছে অন্য ঋতুর মতো। যখনতখন ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে, ফুল ফোটার সময় ফুল ফুটছে না। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগও আমাদের দেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলেও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। যুবসমাজ যদি এসব বিষয়ে সচেতন হয় তবে জলবায়ু পরিবর্তনকে মোকাবেলা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।

রাসেল বলেন, 'আমার জাদুঘরের মাধ্যমে আমি সবেমাত্র কাজটি শুরু করেছি। বিভিন্ন নদ-নদীর পানি সংগ্রহ করেছি। রয়েছে বিভিন্ন ধরনের গাছের পাতা, বিভিন্ন ধরনের বীজ, কাঠের নমুনা, বিলুপ্তপ্রায় বাবুই পাখির বাসা এবং বেশকিছু ছবি। ভবিষ্যতে দেশের সব জেলার মাটি সংগ্রহ করতে চাই। বিভিন্ন প্রাণীর স্টাফড নমুনা রাখতে চাই। আমি চাই একদিন যেন এই জাদুঘরে পরিবেশ নিয়ে গবেষণা করার মতো পর্যাপ্ত উপকরণ থাকে ও তথ্যভাণ্ডারটি ক্রমাগত সমৃদ্ধ হয়।

প্রকৃতিপ্রেমী রাসেল একজন সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠকও বটে। তীরন্দাজ নাট্যদলের প্রতিষ্ঠাতা এবং আবৃত্তি সংগঠন 'বৈঠক'-এর সভাপতি ছিলেন তিনি। তার পথচলায় সবচেয়ে বড় বাঁধা বিরল এক রোগ। ২০০০ সালে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় কারাতে শিখতে গিয়ে একদিন পায়ে দুর্বলতা অনুভব করেন। নানা পরীক্ষানিরীক্ষার পর ভারতে চিকিৎসা করাতে গিয়ে 'মাসকুলার ডিসট্রফি' শনাক্ত হয়। চিকিৎসক জানান, দশ বছরের মধ্যে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হবে রাসেলকে। এই রোগের চিকিৎসা আবিষ্কার হয়নি। ধীরে ধীরে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অকার্যকর হয়ে মৃত্যু ঘটাবে। এই কথাগুলো ছিল বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো। ২০১৬ সাল থেকে হুইলচেয়ার ব্যবহার শুরু করতে হয় রাসেলকে। ধীরে ধীরে পুরো শরীরে প্রভাব ফেলছে রোগটি। তবে তিনি দমে যেতে রাজি নন।

রাসেল বলেন, 'যখন আমার রোগের কথা নিশ্চিত হই, তখন মানসিকভাবে ভীষণ ধাক্কা খেয়েছিলাম। তবে দমে যাইনি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যে কয়দিন বেঁচে থাকব ততদিনই ভালো কাজ করে যাবো। এমন কিছু করব যা পরিবেশ ও প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করবে। মাসকুলার ডিসট্রফি আমার হৃদপিণ্ডকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আমার হৃদযন্ত্রের রক্ত সঞ্চালন ক্ষমতা এখন মাত্র ৩৬ ভাগ। হয়তো তা ধীরে ধীরে আরও কমবে। কিন্তু মৃত্যুর আগেই আমি মরে যেতে চাই না, আমি চাই জীবনকে উপভোগ করতে, এই পৃথিবীকে অন্যের জন্যও উপভোগ্য করে রেখে যেতে।'

ইত্তেফাক/এসটিএম