যখন লিখতে বসেছি, আমার অবস্থান কলকাতায়। মন পড়ে ছিল রাজধানী ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে। ২১ আগস্টের নিহতদের স্মরণে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা উপস্থিত হলেন। বললেন, ‘আঘাত হয়তো আরো আসবে, তারা বসে থাকবে না।’
বার্নার্ড ক্রিক বলেছিলেন যে, ‘রাজনীতি হলো নীতিমালার একটি স্বতন্ত্র রূপ, যার দ্বারা মানুষ নিজেদের পার্থক্য মিটিয়ে ফেলার জন্য, বৈচিত্র্যময় আগ্রহ ও মূল্যবোধ উপভোগ করার জন্য এবং সাধারণ প্রয়োজনের বিষয় পরিচালনায় সরকারি নীতি তৈরির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মিলেমিশে কাজ করে।’
দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক সত্তা শেখ হাসিনা বললেন, ‘আব্বা যখন দেশটাকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ১৫ আগস্ট ঘটেছে। আজ উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতার চেতনায় যখন জয় বাংলা ফিরেছে, তারা আঘাত হানার চেষ্টা করবেই। দেশবাসীকে তাই সতর্ক থাকতে হবে।’
আমার প্রশ্ন, মিলেমিশে একটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে। আদর্শিক জায়গাগুলোয় ভিন্নতা থাকবে। কিন্তু, ভিন্ন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যারা শাসন ক্ষমতায় চলে যেতে চায়, তারা কি সত্যিই রাজনীতিক বা কোনো রাজনৈতিক দলকে প্রতিনিধিত্ব করে?
বাংলাদেশে তাহলে কথিত জাতীয়তাবাদী শক্তি কিংবা একাত্তরের বিজিত শক্তিকে মূলধারার রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখার কি কোনো সুযোগ আছে? কাউকে হত্যা করে কেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যেতে হবে? কেন এক মহান নেত্রী শেখ হাসিনা ঘর থেকে ছুটে এসে বলবেন, ওরা অপেক্ষায় আছে! যেখানে তিনি এক যুগের ওপর বেশি সময় নিয়ে রাষ্ট্রের সেবায় থেকে বাংলাদেশ বদলে দেওয়ার লক্ষ্যকে ধ্যানজ্ঞান করেছেন।
ভ্লাদিমির লেনিনের বিখ্যাত মতবাদ অনুযায়ী একজন শেখ হাসিনা কি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন না? যখন লেনিন বললেন, ‘রাজনীতি হলো অর্থনীতির সবচেয়ে ঘনীভূত বহিঃপ্রকাশ।’ অন্যদিকে বাংলাদেশি এক দার্শনিক বলেছেন, মানুষ আত্মপ্রয়োজনে এই গ্রহের সবচেয়ে হিংস্র জীব। এই আত্মপ্রয়োজনেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে থাকা অপশক্তি ১৫ আগস্ট ঘটায়। ২১ আগস্ট করে। ওরা আমাদের মারে কেন—এই প্রশ্নের উত্তর মিলে গেল। কারণ, তাদের প্রয়োজনে তারা হিংস্র, বর্বর ও পৈশাচিক হতে সময় নেয় না।
পলিটিক্স শব্দটি এসেছে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ধ্রুপদী রচনা পলিটিকা থেকে। তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষ স্বভাবতই একটি রাজনৈতিক প্রাণী।’ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এবং অতঃপর শেখ হাসিনা। তারা উভয়েই রাজনৈতিক অতি সত্তা। যারা সাড়ে ৭ কোটি থেকে আজকের বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের জনস্বার্থের জন্য নিজের জীবন দিয়েছে ও দিতে চায়।
কলকাতার প্রেসক্লাব। এখানেও ২১ আগস্ট নিয়ে আলোচনাসভা রয়েছে। আমিও কিছু বলতে চাই। বলব! এখানকার সংবাদকর্মীদেরও প্রশ্ন, ওরা এমন কেন? কেন তারা বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে না? কেন তাদের পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় আসতে হয়?
রাজনৈতিক জীবদ্দশায় আঞ্চলিক পরিসর ছেড়ে পুরো বাংলাদেশের সাংগঠনিক পথচলাকে মসৃণ করতে আগ্রহী হয়েছি। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ গড়ার জন্য। রাজনৈতিক অপশক্তি যেন আর আঘাত না আনতে পারে তার জন্য। একজন শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য জীবনকে সঁপে দেওয়ার মানসিকতায় থাকার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে। তিনি জীবনের পরোয়া করেননি বলেই ঝুঁকি নিতে পেরেছেন। ঝুঁকি নিতে সচেষ্ট হয়েছিলেন বলেই বাংলাদেশকে নিয়ে আজ প্রবাসেও গর্ব করা যায়। ‘আঘাত’ নামক শব্দটাকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করতে হবে। এমন লক্ষ্যে আমাকে পারতে হবে। আমাদেরও পারতে হবে।
গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পক্ষের প্রথম প্রবক্তা হিসেবে আমরা অ্যারিস্টটলকে পেয়েছিলাম। কিন্তু, নিজেদের উপযোগী শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে নিজস্ব কৃষ্টিকে সংরক্ষণ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাবহারিক প্রণেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ঠিক সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে রাজনৈতিক অপশক্তিমুক্ত বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে কার মাধ্যমে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি নারীসত্তা শেখ হাসিনার বদৌলতে।
শেখ হাসিনার মতো করে আমার মনের মধ্যেও শঙ্কা আছে। তিনি তো বললেনই, ওরা আঘাত করতে চায়। আবারও চায়! শুক্রবার জুমার নামাজ আদায়ের পর যখন আমরা ডালভাত খেতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসি, ওরা অন্য একটা টেবিলে বসে হোমওয়ার্ক করে। ঘরে ফেরে না! এমন তথ্য কানে আসে, দেশপ্রেমিক কর্মীরাও তথ্য দেয়। বিহিত তাই করতে হবে। আওয়ামী লীগ পারবে তা রুখতে। দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে পারতেই হবে।
লেখক : প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
