বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বড় হয়ে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই: মারইয়াম মাসুদ

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান মারইয়াম মাসুদ তার ফেসবুক-ইউটিউব চ্যানেল ও গাইড ইউএস টিভিতে ‘কোরআন উইথ মারইয়াম’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সারাবিশ্বের লাখ লাখ শিশু-কিশোরদের শেখাচ্ছেন পবিত্র কুরআন শুদ্ধ উচ্চারণ। পড়ছেন দশম গ্রেডে। এরমধ্যে অংশে নিয়েছেন বিশ্বের এগারোটি দেশে বিভিন্ন সেমিনার ও ওয়ার্কশপে। বিশ্বজুড়ে পিতৃ-মাতৃহীন শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন একাধিক সংস্থার শুভেচ্ছাদূত হিসেবে। মানবিক এবং অসামান্য কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসউইমেন থেকে পেয়েছেন কনগ্রেশনাল অ্যাওয়ার্ড। সম্প্রতি তার কার্যক্রম, বেড়ে ওঠা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন ইত্তেফাকের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফরিদ উদ্দিন রনি

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২২, ২১:৪৪

ইত্তেফাক: মাত্র দুই বছর চেষ্টায় আপনি কুরআনে হাফেজা হয়েছেন; এত অল্প সময়ে, কম বয়সে কুরআনে হাফেজা হওয়ার পেছনে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে?

মারইয়াম: সর্বপ্রথমে আমি আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তা’য়ালার কাছে শুকরিয়া জানাই যে, তিনি আমাকে কোরআন মেমোরাইজ (মুখস্থ) করার তৌফিক দিয়েছেন। আমি কুরআন মুখস্থ করতে শুরু করেছি সাত বছর বয়সে, আমার আম্মু খুব ছোটবেলা থেকে আমাকে কুরআন মেমোরাইজ করার জন্য খুব অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। আম্মু বিভিন্ন টেকনিক অবলম্বন করেছেন আমাকে শেখাতে; তাছাড়া আমার আগ্রহ এবং একনিষ্ঠভাবে লেগে থাকা— এ ব্যাপারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।


ইত্তেফাক: আমরা যতটুকু জানি, আপনি কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি না হয়ে মায়ের মাধ্যমে পুরো কুরআন মুখস্থ করেছেন, পূর্বে বলেছেন আপনার মা বিভিন্ন টেকনিক অবলম্বন করে আপনাকে কুরআন শিখিয়েছেন—এই দীর্ঘযাত্রায় আপনার মা কী টেকনিক অনুসরণ করেছেন?

মারইয়াম: আমার কুরআন মেমোরাইজ করার পেছনে আমার আম্মুর কন্ট্রিবিউশন সবচেয়ে বেশি। আমাকে কুরআন শেখানোর জন্য আমার আম্মু অনেক স্টাডি করেছেন। প্রিপারেশন নিয়েছেন, আমাকে অনেক সময় দিয়েছেন। আমার আম্মু ইসলামিক অনেক ক্লাস (কোর্স) করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বললে- আল মাগরিব ইনিস্টিউট থেকে কুরআন কোর্স করেছেন। তাছাড়া তাজবিদের উপর কোর্স করেছেন। তারপর আমাকে শুদ্ধ কুরআন শিখিয়েছেন। আমার আম্মু আমাদেরকে বলেন যে, বাচ্চাদেরকে খুব ছোটবেলা থেকে কুরআন বেশি বেশি পড়ার এবং মেমোরাইজ করার জন্য অনুপ্রেরণা দিতে হবে। আর আমার আব্বু-আম্মু আমাদের বাসায় সবসময় ইসলামিক এনভায়রনমেন্ট বজায় রাখেন। আর এটাও নিশ্চিত করেন যে, আমরা যাদের সাথে মিশি, চলাফেরা করি তাদের মেন্টালিটিটাও আমাদের মতো। 

মারইয়াম মাসুদ
ইত্তেফাক: কুরআন মুখস্থ করার ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?

মারইয়াম: ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য কুরআন মুখস্থ করা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কুরআন আমরা মেমোরাইজ করি আল্লাহর ভালোবাসা এবং সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। একইসাথে তার ইবাদত পালন করতে। তবে এটা ঠিক যে, কুরআন মুখস্থ করার পর তা স্মৃতিতে ধরে রাখা কঠিন। এ ব্যাপারে ছেলেরা একটু বেশি সুযোগ-সুবিধা পায়। যদি উদাহরণ হিসেবে বলি- ছেলেরা তারাবিহ'র নামাজে লিড করতে পারে, কুরআন রিভিউ করার সুযোগ পায় তেলাওয়াতের মাধ্যমে। মেয়েদের জন্য আমার মেসেজ থাকবে, আগ্রহ এবং প্রচেষ্টার ফলে আমরাও কুরআন মুখস্থ করতে পারি, এবং হৃদয়ে সংরক্ষণ করে রাখতে পারি। 


ইত্তেফাক: আপনি বিভিন্ন দেশে অনেক প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেছেন এবং গাইডইউএস টিভিতে ‘কোরআন উইথ মারইয়াম’ নামে একটা অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছেন। স্কুল এবং পড়ালেখার সাথে তাল মিলিয়ে কিভাবে এ সমস্ত কাজগুলো করছেন?

মারইয়াম: অনেস্টলি এতো কিছু করা কখনো পসিবল হতো না আমার আব্বুর কন্ট্রিবিউশন ছাড়া। এজন্য আমি সর্বপ্রথম আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তা’য়ালার কাছে শুকরিয়া জানাই, একইসাথে আমার আব্বুর সুস্থতা এবং নেক হায়াতের জন্য দোয়া করি। সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাকে এস্টাবলিশ করার পেছনে সবচেয়ে বড়ো ভুমিকা আমার আব্বুর। কুরআন উইথ মারইয়ামসহ সকল কিছুর আইডিয়া আসলে আমার আব্বুর কাছ থেকে আসে। সব লজিস্টিক্যাল চ্যালেঞ্জ  প্রোগ্রাম, ইভেন্ট— সবকিছু আমার আব্বু ম্যানেজ করেন। আর আমার কাজগুলো আব্বু খুব ইজি করে দেন। এজন্য আমি অনেক সময় পাই স্কুল এবং পড়াশোনা করার জন্য। 


ইত্তেফাক: অবসর কীভাবে কাটে?

মারইয়াম: অবসর সময়ে আমি পেইন্টিং করতে পছন্দ করি আর আমার বোন ফাতিমা এবং মায়িশার সাথে সময় কাটাই৷ এর পাশাপাশি কিছু সময় জিমনাস্টিক করতে পছন্দ করি আর আমার বোনদের সাথে ঘুরতে বের হই। আমার অন্যতম একটি শখের বিষয়- ট্রাভেল অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড। 


ইত্তেফাক: কোরআনের ১১৪টি সূরার মধ্যে আপনার সবচেয়ে পছন্দের সূরা কোনটি?

মারইয়াম: কুরআনের অনেকগুলো সূরাই আমার খুব পছন্দ; তারমানে সূরা ইউসূফ, সূরা মারইয়াম আর সূরা ওয়াকিয়াহ আমার খুব পছন্দ।  


ইত্তেফাক: বিশ্বজুড়ে পিতৃ-মাতৃহীন শিশুদের নিয়ে আপনি কাজ করেছেন, আমরা সেসব সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই।
 
মারইয়াম: আলহামদুলিল্লাহ আমাকে আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তা’য়ালা অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। অনেক বিশিষ্ট মানবিক প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন। সিরিয়া এবং ইয়ামেন অরপেন (পিতৃ-মাতৃহীন) বাচ্চাদের জন্য ইসলামীক রিলিফ ইউএস-এ আমি কাজ করেছি। আর এখন আমি মুসলিম এইড ইউএস এর সাথে কাজ করছি। প্রতি বছর রমজানে পিতৃ-মাতৃহীন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আমি একটা বড়ো এমাউন্টের টাকা ফান্ড রাইজ করে দিই। প্রতি বছর চেষ্টা করি ত্রিশ-চল্লিশ লক্ষ টাকা তাদের জন্য সংগ্রহ করে দিতে। এছাড়াও আমি ইউকে বেইজড ওয়ার্ল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের সাথেও কাজ করছি। সম্প্রতি আমি এ ফাউন্ডেশনের সাথে টার্কিতে গিয়েছি; সেখানে পিতৃ-মাতৃহীন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিজের হাতে হেল্ফ (সাহায্য) করে এসেছি। ইনশাআল্লাহ আমি মানবসেবায় শিশুদের জন্য আমি নিয়মিত কাজ করে যাব।

মারইয়াম মাসুদ
ইত্তেফাক: বাংলাদেশে আপনার অসংখ্য অনুসারী রয়েছে। অনেক বাবা-মা আপনার ভিডিয়ো দেখে তাদের সন্তানকে আপনার মতো (হাফেজা) বানাতে চায়। তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

মারইয়াম: আলহামদুলিল্লাহ, প্রতিদিন আমি অনেক অনেক মেসেজ পাই সারাবিশ্ব থেকে, কিভাবে তারা আমার আর ফাতিমার (ছোট বোন) ভিডিয়ো দেখে তারা ইনিস্পায়ারড হয়েছেন এবং তাদের সন্তানদের কুরআন শেখানোর চেষ্টা করছেন। ইভেন অসংখ্য নওমুসলিমদের কাছ থেকেও মেসেজ পাই তারা কিভাবে আমাদের ভিডিয়ো দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। আমি দোয়া করি আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তা’য়ালা যেন আমাদের কাজগুলো আমাদের আব্বু-আম্মুর জন্য সদকায়ে জারিয়াহ করে দেন।


ইত্তেফাক: বাংলাদেশ নিয়ে আপনার অনুভূতি জানতে চাই। পরিবারের সাথে কখনো আসার পরিকল্পনা আছে?

মারইয়াম: আমি এবং আমার পরিবার বাংলাদেশকে অনেক ভালোবাসি। সবসময় বাংলাদেশে আসতে মন চায় কিন্তু আমার আব্বুর চাকরি এবং আমাদের পড়াশোনার কারণে বাংলাদেশে আসার আর সুযোগ হয়ে ওঠেনা। কিন্তু আশাকরি ইনশাআল্লাহ খুব তাড়াতাড়ি বাংলাদেশে ঘুরতে আসব।  


ইত্তেফাক: বড় হয়ে কী হতে চান?

মারইয়াম: ইনশাআল্লাহ বড়ো হয়ে আমার আব্বু এবং বড়ো বোন মায়িশার মতো সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই। পাশাপাশি ইসলামিক আরো জ্ঞানার্জন করে মানুষকে ইসলামের পথে দাওয়াহ দিতে চাই। এক্ষেত্রে আমি মোটিভেশন পেয়েছি আমার আব্বু-আম্মু’র কাছ থেকে। এছাড়া আমার আরেক অনুপ্রেরণা আমার গ্র্যান্ডমাদার রোমেনা আফাজ। তার কাছ থেকে শিখেছি কিভাবে মানুষের প্রতি দয়ালু হাতে হয়। তিনি দস্যু বনহুরের লেখিক। বাংলাদেশের জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক ছিলেন। যার রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনি ছিল এক সময়ে বাঙালির কাছে সবচেয়ে প্রিয় আকর্ষণ। ২০১০ সালে তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছিলেন। আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তা’য়ালার কাছে দোয়া করি আল্লাহ তাকে যেন, জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন। 


ইত্তেফাক: ইত্তেফাকের পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলুন...

মারইয়াম: আমি আমার আব্বুর কাছে শুনেছি দৈনিক ইত্তেফাক বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী এবং পাঠকপ্রিয় একটা পত্রিকা। আমার আব্বু যখন বুয়েট-এ (বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) পড়তেন, তখন তিনি ইত্তেফাকের নিয়মিত পাঠক ছিলেন। আর সবাইকে বলব, তোমরা পিতৃ-মাতৃহীন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সাহায্য এগিয়ে এসো। সাধ্যানুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়াও। আর আমরা যা-ই করি না কেন, তা যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে হয়। 


ইত্তেফাক: ধন্যবাদ আপনাকে।

মারইয়াম: আপনাদের ধন্যবাদ। আমি এবং আমার পরিবারের জন্য দোয়া করবেন।

ইত্তেফাক/এসটিএম