সবসময় চোখকান খোলা রাখেন, আর সেকরার দোকানে থাকে নজরদারি। কখন কোথায় বিক্রি হচ্ছে পুরাতন মুদ্রা কিংবা স্বর্ণকারের কাছে এসে গলিয়ে ফেলা হচ্ছে মূল্যবান কোন পুরা বস্তু সেদিকে তার দৃষ্টি সজাগ। সুযোগ বুঝে খাতির জমিয়ে নেন সেসব বিক্রেতাদের সঙ্গে। আর সেই অজুহাতে কিনে ফেলেন মূল্যবান ধাতব মুদ্রা ও ঐতিহাসিক সামগ্রী। রাখেন নিজের সংগ্রহে। এ বিষয়ে তার আগ্রহ দেখেও অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী উপহার হিসেবে পাঠান দেশি-বিদেশি নানা পুরাতন নিদর্শন ও প্রাচীন কয়েন। এভাবেই ব্যক্তিগতভাবে সংগ্রহ করা মুদ্রার জাদুঘর তৈরি করেছেন কুমিল্লার ছেলে নাঈম আল তাহসীন ফাহাদ।
নেশাটা জন্মে ছোট বেলা থেকেই। ফাহাদের বাবা পুলিশে চাকরি করেন। বাবার সহকর্মীরা ফাহাদকে মাঝেমধ্যে খেলার জন্য স্টিকার হিসাবে ডাকটিকিট উপহার দিতেন। তবে ফাহাদ খেলতেন না; জমিয়ে রাখতেন। একসাথে অনেক জমা হয়ে গেলে তা দেখে আনন্দ পেতেন। একসময় বাবা বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান। বাসা বদলের সময় সেগুলো হারিয়ে ফেলে ফাহাদ। পরে তার আর কোন হদিস মেলেনি। এরপর বেশ কিছু কাল চলে যায়। ২০০৭ সালের দিকে ফাহাদের এক ফুফাতো ভাই একদিন তাকে ভারতীয় একটি রুপি উপহার দেয়। এর কিছুদিন পর বন্ধুদের সাথে পুকুরে গোসল করতে গিয়ে ফাহাদ কাদামাটির নিচে ৫টি পাকিস্তান আমলের মুদ্রা খুঁজে পান। ব্যাস—এতেই আবার জেগে উঠে পুরাতন সেই নেশাটি।
এরপর বিভিন্ন সময়ে নানা দেশের দুর্লভসব মুদ্রা সংগ্রহ করা শুরু করেন ফাহাদ। এই কাজ করতে গিয়ে বিদেশি কিছু সংগ্রাহকের সঙ্গে পরিচয় ঘটে তার। তারাও বিভিন্ন সময়ে মূল্যবান মুদ্রা ও তথ্য দিয়ে নানা ভাবে সহযোগিতা করে ফাহাদের। এরকম প্রায় ৬০ জন বিদেশি সংগ্রাহকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হয়। ইত্তেফাক প্রজন্মকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফাহাদ জানান, 'বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংগ্রাহক বন্ধুরা আমাকে দারুণভাবে সাহায্য করে। তার মধ্যে জার্মানির ইউই, আমেরিকার উল্ফ, ক্যানাডার বেন, ইংল্যান্ডের মিক, পর্তুগালের জর্জ উল্লেখযোগ্য। আর দেশের বন্ধুদের কথা তো বলে শেষ করার নয়।'
ফাহাদের সংগ্রহে থাকা সবচেয়ে পুরাতন মুদ্রাটি হলো ১৩৮ থেকে ১৬১ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট অ্যান্টোনিয়াস পায়ামের কয়েন। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ‘আসহাবে কাহাফ’ ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত রোমান সম্রাট ডিসিয়াসের (২০১-২৫১ খ্রি.) সময়কালের একটি মুদ্রাও আছে তার সংগ্রহে। এছাড়াও আছে প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার প্রচলিত মুদ্রা, সুলতানি আমলের ধাতব মুদ্রা, ব্রিটিশ–ভারত-পাকিস্তান আমলের বিলুপ্ত মুদ্রা; বায়াফ্রা, ফিউম, ইউনিয়ন আইল্যান্ডসহ বিশ্বের তিন শতাধিক দেশের প্রচলিত ও অপ্রচলিত দেড় হাজারের অধিক কাগুজে ও ধাতব মুদ্রা।
কয়েন সংগ্রহ করতে গিয়ে বিচিত্র নানা অভিজ্ঞতা জুটেছে ফাহাদের। কেবল মুদ্রা সংগ্রহ-ই নয়, তার লক্ষ্য থাকে মুদ্রার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনা, গল্প ও ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত হওয়া। তাই তিনি চর্চা করেন নানা ইতিহাসগ্রন্থ। ইন্টারনেট থেকে জোগাড় করেন মুদ্রার পেছনের গল্প। ফাহাদ বলেন, ‘প্রাচীন কালের মুদ্রাগুলো আমাকে প্রবলভাবে টানে। তারই ধারাবাহিকতায় আমি 'Story Based Coin Collecting (SBCC)' নামের একটা থিম ডেভেলপ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এর মাধ্যমে অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিখ্যাত সব শাসকের শাসন আমলের মুদ্রাগুলো সংগ্রহ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। সফল হতে পারলে ইতিহাসের আবার পুনর্জন্ম হবে। বই-পুস্তকে পড়ে আসা হাজার বছরের ইতিহাসের চাক্ষুষ প্রমাণ থাকবে হাতের মুঠোয়।’
ফাহাদের জন্ম কুমিল্লায়। বাবার চাকরিসূত্রে ছেলেবেলা কেটেছে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও খাগড়াছড়িতে। চট্টগ্রাম থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের পাট চুকিয়ে ভর্তি হন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। বর্তমানে তিনি একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন।
