বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নাটোরের চলনবিলে হারিয়ে যাচ্ছে দেশি মাছ

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৭:৩৪

‘মাছেভাতে বাঙালি’ এই চিরায়ত কথাটি এখন শুধুই কল্পকথা। মুখে আর বইয়ে এই কথাটির চর্চা থাকলেও বাস্তবে তার মিল পাওয়া কষ্টসাধ্য। নাটোরের সিংড়া-গুরুদাসপুর-নলডাঙ্গা এলাকার চলনবিল অংশের দেশীয় প্রজাতির মাছের দুর্দিন চলছে। চলনবিলের দেশীয় প্রজাতির অনেক বিলুপ্ত প্রায় মাছ চাষ হচ্ছে পুকুরে।

‘চলনবিল’ দেশের সবচেয়ে বড় বিল। একসময় এ বিলকে দেশের সর্ববৃহৎ মাছের ভান্ডার বলা হতো। কিন্তু বর্তমানে চলনবিল ও এর মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা নদীগুলোতে দেশীয় মাছ উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত পানি নেই। সে কারণে নাটোরের সিংড়াসহ পাবনা-সিরাজগঞ্জের বিস্তীর্ণ চলনবিল অঞ্চলের নদীনালা, হাওরবাওড়, খালবিল বর্তমানে প্রায় মাছশূন্য হয়ে পড়ছে। 

নাটোর জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে দেশে স্বাদু পানিতে মাছের প্রজাতির সংখ্যা ২৬০। তারমধ্যে নাটোরের সিংড়া-গুরুদাসপুর-নলডাঙ্গা অধ্যুষিত চলনবিল অংশে অতীতে পাওয়া যেত প্রায় ১৩০ প্রজাতির মাছ। বর্তমানে মাছের প্রজাতি কমে দাঁড়িয়েছে ৭৯ তে। তথ্য মতে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া মাছের প্রজাতির মধ্যে ধোঁদা, গুড়পুঁই, বাছা, ব্যাইটকা, গজার, শিলং, দুই প্রজাতির ট্যাংড়া, ভেদা, শংকর, ফাঁদা, টিপপুঁটি, পানি রুইয়ের মতো ১১ প্রজাতির মাছ উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও এ অঞ্চলে বিলুপ্তপ্রায় হয়ে পড়েছে প্রায় ৫০ প্রজাতির দেশীয় মাছ। বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মাছের মধ্যে মেনি, গুতুম বা পুঁইয়া, চিতল, ফোলি, চিংড়ি, ভেদা, বেলে, পাবদা, কাঁচকি, এক প্রজাতির চাঁদা, মলা-ঢেলা, দাঁড়কিনা, বৌমা, ঘাড়ুয়া, ভাঙ্গন, কালিবাউশ, বাঁশপাতা, পাঙাস প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য ।

স্থানীয় মত্স্যজীবী কসলেম উদ্দীন, সাবানসহ অনেকেই হতাশার সাথে বলেন, আগে দেশীয় প্রজাতিসহ বিভিন্ন প্রকারের মিঠাপানির মাছ চলনবিল অঞ্চল থেকে তারা সংগ্রহ করতেন। বোয়াল থেকে শুরু করে রুই কাতলা, টেংরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ প্রচুর পরিমানে পাওয়া যেতো। নদীগুলো শুকিয়ে বালির চর পড়ায় বর্তমানে মাছের দুষপ্রাপ্যতা দেখা দিয়েছে। এতে এ অঞ্চলের হাজার হাজার জেলে পরিবারে বর্তমানে দুর্দিন চলছে। 

নাটোর জেলা মৎস্য অফিসের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, চলনবিলের নদ-নদীতে পলি ও বালি জমে পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বাধাগ্রস্থ হওয়া, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মান, অপরিকল্পিত পুকুর খনন, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, বিল ভরাট করে দখল, বিষ প্রয়োগে মাছ আহরণ, বিলের গভীর অংশ সেচে মাছ ধরা, কৃষিজমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, দেশীয় মাছ চাষে অনীহা, অসময়ে অতিরিক্ত মাছ ধরা, মৎস্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া, হঠাৎ বন্যাসহ নানা কারণে চলনবিল অঞ্চল থেকে দেশীয় প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। 

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘চলনবিল অঞ্চলে মাছের অভয়াশ্রম গড়ে তুলে বিলুপ্ত হওয়া মাছকে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এতে আগের মতো মাছ হয়তো চলনবিলে পাওয়া যাবে না। তবুও নলডাঙ্গায় অভয়াশ্রম করার ফলে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া মেনি মাছ পাওয়া যাচ্ছে। যা ৩-৪ বছর আগেও পাওয়া যেত না। দেশীয় প্রজাতির মাছের সংরক্ষণের জন্য ৭টি বিল নার্সারি করা হয়েছে বলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান।

ইত্তেফাক/ইআ