রোববার, ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সাভারের বেদেপল্লিতে দিনবদলের ছোঁয়া

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৫:৩২

‘মোরা এক ঘাটেতে রান্ধি বাড়ি আরেক ঘাটে খাই, মোদের ঘরবাড়ি নাই’— এমন বহু কালজয়ী গান বেদে ও সাপুড়েদের নিয়ে রচিত হলেও এখন আর তেমন চোখে পড়ে না বেদেদের সেই চিরচেনা জীবনাচার। বেদেদের সাপ ধরা, বীণের সুরে সাপের খেলা দেখানো, শিঙা লাগানো, তাবিজ বিক্রি এবং দাঁতের পোকা ফেলানোর দৃশ্য এখন অতীত প্রায়। জীবিকার তাগিদে নদীতে সারি সারি নৌকার পাল নিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভেসে বেড়ানো বেদেদের জীবনে লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। যুগ যুগ ধরে অবহেলিত হলেও বর্তমানে এরা নিজ প্রচেষ্টায় গাইতে শুরু করেছে জীবনের জয়গান। এ চিত্র সাভার বেদেপল্লির। নৌকা ছেড়ে ডাঙায় ঘরবাড়ি বাঁধলেও এদের একটি অংশ আজও তাদের বংশ পরম্পরার প্রাচীন এ পেশায় জীবনযাপন করছে। আর অন্য একটি অংশ খুঁজে নিয়েছে তাদের জীবনধারণের নতুন অবলম্বনকে। 

সাভার পৌর এলাকার পাশে সাভার ইউনিয়নের পুরাবাড়ি (খঞ্জনকাঠি) এলাকায় তিন একর ৫০ শতাংশ জমিতে বেদেদের জন্য গড়ে উঠছে উত্তরণ পল্লী।

বাংলাদেশে বেদেদের আগমন ও বিস্তার নিয়ে রয়েছে নানা মত। গবেষণাও করেছেন অনেকে। বেদেরা নিজেরাও বিষয়টি সম্পর্কে নানা মত দিয়েছেন। নৃবিজ্ঞানীদের মতে—বাংলাদেশে বেদেদের আগমন আরাকান অর্থাৎ আজকের মিয়ানমার থেকে। ১৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন আরাকানরাজ বল্লাল রাজার সঙ্গে শরণার্থী হিসেবে তারা এদেশে এসেছিল। পরবর্তীকালে তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আবার কারো কারো মতে, প্রাচীনকালে তারা সুদূর মিশর থেকে এসেছিল। তারা বেদুইন জনগোষ্ঠীর। বেদুইন থেকে ‘বেদে’ শব্দের উৎপত্তি। বেদে সমাজে জনশ্রুতি রয়েছে, ভারতে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার পান্ডুয়াতে বেদেরা এক সময়ে রাজত্ব গড়ে তুলেছিল। আরেকটি জনশ্রুতি রয়েছে, বেদেরা পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের উত্তরসুরি। বেদেদের আগমন ও ছড়িয়ে পড়া সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের এসব মতামত ও জনশ্রুতির কোনটা সঠিক, তা নিরূপণ করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য এবং বিতর্কের বিষয়। তবে এটি প্রায় সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেন যে, বেদে সম্প্রদায় বাংলাদেশে কয়েক শ বছর ধরে আছে এবং এদেশের সমাজ-সংস্কৃতিতে তারা মিশে গেছে।

সাভার উপজেলার বংশী নদীর তীর ঘেঁষে বক্তারপুর, কাঞ্চনপুর, অমরপুর, পোড়াবাড়ী এ চারটি গ্রাম ‘সাভার বেদেপল্লি’ বা ‘বাইদ্যাপাড়া’ নামে পরিচিত। বংশী নদীর বেদে বহরের নৌকা ছেড়ে অনেক বেদে পরিবার জমি কিনে সাভার বেদেপল্লিতে তাদের স্থায়ী বসত গড়ে তুলেছেন। প্রায় ১৬ হাজার বেদের বসবাস এ পল্লিতে।  অনেকেই বিকল্প পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন স্থানীয় বাজারে দোকান করা, হাঁস-মুরগি ও কবুতর পালন, মাছ চাষ বা কাঁথা সেলাইয়ের মতো কাজ। নিজেদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় দীর্ঘদিনের অবহেলিত এ গোষ্ঠীর জীবনে লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। সাভার বাইদ্যাপাড়ার কিশোরী খাদিজা কিছু দিন আগেও যেখানে বিভিন্ন বিষধর সাপ নিয়ে বেদেপল্লির হাটে খেলা দেখাত সে এখন বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যায়।  ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে পল্লির তরুণরা। বেদে নারীরাও নিজেদের স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য শিঙা লাগানো, তাবিজ বিক্রি বা দাঁতের পোকা ফেলানোর মতো কাজ ছেড়ে হাতে তুলে নিয়েছেন সেলাই মেশিন এবং বিউটি পার্লারের ব্যবসা। বেদে যুবকরা টেইলার্সের দোকান খুলে সৃষ্টি করেছেন আত্মকর্মসংস্থান। আবার অনেকই গার্মেন্টস ও মিলকারখানায় চাকরি করছেন। পল্লির অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, তারা এখনো অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত এবং বিভিন্নভাবে অবহেলিত। পল্লির রাস্তাঘাট, মানসম্মত ড্রেনেজ সুবিধা, গ্যাসসহ অনেক নাগরিক সুবিধা তারা পাচ্ছেন না।  

উত্তরণ ফাউন্ডেশন এর চেয়ারম্যান, পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমানের পরিকল্পনা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে উত্তরন পল্লী

তাদের জীবন বদলে দেওয়ার জন্য বিশেষ অবদান রেখেছেন তৎকালীন ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার ও বর্তমান ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান।  তিনি বেদে জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনসহ পল্লির নারী-পুরুষদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার জন্য তাদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। এরই অংশ হিসেবে পল্লির ১০৫ জন বেদে নারীকে সেলাই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করান এবং তাদের তৈরি পোশাক বিক্রির জন্য ‘উত্তরণ বুটিকস’ নামে একটি শো-রুম করে দিয়েছেন। বেদে যুবকদের স্বাবলম্বী করতে ৩৫ জনকে গাড়ি চালনা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করান এবং কয়েক জনকে পুলিশ বাহিনীতে চাকরির সুযোগ করে দেন। কয়েক জন তরুণী শুরু করেছেন বিউটি পার্লারের ব্যবসা। এছাড়া তার সার্বিক তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত ‘উত্তরণ ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত বেদে সন্তানদের লেখাপড়া ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য সাহায্য-সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

ইত্তেফাক/ইআ