বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বালাইনাশকের বাজার সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮:০২

ফসলের ক্ষতিকর জীবাণু এবং কীটপতঙ্গ দমনের জন্য বালাই-নাশকের (পেস্টিসাইড) ব্যবহার বেড়েছে। গত এক বছরে এর ব্যবহার বেড়েছে ৫ শতাংশেরও বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোগ-জীবাণু বাড়ছে, তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই চাহিদা আরো বাড়বে। 

বাংলাদেশ ক্রপ প্রটেকশন অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, দেশে পেস্টিসাইডের বাজার ৫ হাজার কোটি টাকার। দানাদার পেস্টিসাইড বাদে তরল ও পাউডার পেস্টিসাইডের প্রায় পুরোটাই আমদানি করা হয়। ফসলের ক্ষতিকর জীবাণু-কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের জন্য গত বছর ৩৯ হাজার ৫৪২ জন টন পেস্টিসাইড ব্যবহার হয়। ২০২০ সালে ছিল ৩৭ হাজার ৫৬২ টন। গত বছর ১ হাজার ৪২ ধরনের পেস্টিসাইড ব্যবহার হয়।

কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, ফসল উৎপাদনে পেস্টিসাইড ব্যবহার প্রয়োজন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, কীটপতঙ্গের আক্রমণের কারণে শাকসবজিতে ৫৪ শতাংশ, ফলে ৭৮ শতাংশ এবং খাদ্যশস্যে গড় ক্ষতি ৩২ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এ কারণে পেস্টিসাইড ব্যবহার করে কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তথ্য অনুযায়ী, শুধু পোকামাকড়ের কারণে বার্ষিক ফলনের ক্ষতি হচ্ছে ধানের ক্ষেত্রে ১৬ শতাংশ, গমের ক্ষেত্রে ১১ শতাংশ, আখে ২০ শতাংশ, সবজিতে ২৫ শতাংশ, পাটে ১৫ শতাংশ এবং ডাল ফসলে ২৫ শতাংশ।  আর বাংলাদেশে আগাছা নিয়ন্ত্রণ করা না হলে ফসলের ৩৭ শতাংশ ক্ষতি হয়। ধান উৎপাদনে ইঁদুর একটি বড় সমস্যা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ইঁদুর গড়ে এক বছরে ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকার ফসল নষ্ট করছে।

বাংলাদেশে চাষাবাদকৃত ১০০টি ফসলের মোট ৮৩২টি ক্ষতিকর পোকামাকড়, ৮৩৩টি রোগ সৃষ্টিকারী রোগ-জীবাণু এবং ১৭০টি আগাছা শনাক্ত করা হয়েছে।  কোনো কোনো বিজ্ঞানী বলছেন, বালাইয়ের আক্রমণে ফসল ৩০ থেকে ১০০ ভাগ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।  রাজধানীর শেরেবংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নোমান ফারুক জানান, সর্বশেষ ২০১৫ সালে ১ হাজার ৫৮৫টি রোগ বিভিন্ন ফসলে রেকর্ড করা হয়েছে। আর প্রতি বছর ১০ থেকে ১৫ ভাগ ফসল রোগের কারণেই নষ্ট হয়। তবে কৃষিবিজ্ঞানীরা বলছেন, পেস্টিসাইডের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে কৃষকদের প্রশিক্ষণ না দিলে পেস্টিসাইড ব্যবহারের ফল উলটো হতে পারে। 

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে,  ২০০৮ সাল থেকে দানাদার কীটনাশকের ব্যবহার কমলেও তরল কীটনাশকের ব্যবহার দেড় গুণ ও পাউডার কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে তিন গুণের বেশি। সালফার ছত্রাকনাশকের ব্যবহার আগের মতো থাকলেও সাধারণ ছত্রাকনাশকের ব্যবহার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।  আগাছানাশকের ব্যবহারও প্রায় দ্বিগুণের মতো বেড়েছে। ইঁদুর নাশকের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর :দেশের ৫ হাজার কোটি টাকার পেস্টিসাইটের বাজারের মধ্যে দানাদার কীটনাশক ছাড়া প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। দেশীয়ভাবে উৎপাদন করা গেলে এই পেস্টিসাইডের দাম বর্তমানের চেয়ে অনেক সস্তা ও সহজলভ্য হবে, তাতে কৃষকরা লাভবান হবেন এমনটাই জানিয়েছেন ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ার ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ এগ্রোকেমিকেল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএএম) সভাপতি কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি জানান, আমরা দেশীয়ভাবে উৎপাদন করতে চাই। সরকারি অনুমোদনও পেয়েছি। কিন্তু একটি কমিটির অসহযোগিতার কারণে সম্ভব হচ্ছে না। এই ব্যবসার ৫৫ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করছে কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি। আর কোণঠাসা হয়ে পড়ছে দেশীয় প্রায় সাড়ে ৬০০ প্রতিষ্ঠান।

তিনি অভিযোগ করেন, কীটনাশক উৎপাদনে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কঠিন প্রতিবন্ধকতার মুখে। এ জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ২০১০ সালের পুরোনো একটি প্রজ্ঞাপন এবং পেস্টিসাইড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি কমিটির (পিটাক) অসঙ্গতিপূর্ণ শর্ত। ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদে কীটনাশক-সংক্রান্ত সর্বশেষ যে আইন প্রণীত হয়, সেখানে দেশীয় কোম্পানিগুলোর জন্য বিদেশ থেকে কাঁচামাল ও অন্য সহায়ক উপাদান আমদানির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা নেই। দেশীয় কৃষিশিল্পের বিকাশের স্বার্থে কাঁচামাল ও অন্য সহায়ক উপাদান আমদানির জন্য উৎস উন্মুক্ত করার নির্দেশনা দিয়েছে  কৃষি মন্ত্রণালয়ও। কিন্তু পিটাক বিষয়টি নিয়ে খামখেয়ালি করছে।

বিএএম সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত তাদের প্ল্যান্ট থেকে কাঁচামাল ও অন্য সহায়ক উপাদান যাতে প্রতিযোগিতামূলক দামে সংগ্রহ করতে পারে, সে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে মূল্য যাচাই-বাছাই করে একাধিক সোর্সের কাছ থেকে কাঁচামাল আমদানি করতে পারছে। কিন্তু দেশীয় কোম্পানির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করে বলা হয়েছে, তারা শুধু একটি নির্দিষ্ট বিদেশি সোর্সের (কোম্পানি) কাছ থেকে কাঁচামাল ও অন্য সহায়ক উপাদান আমদানি করতে পারবে। এভাবে দেশীয় কোম্পানিগুলো হয়রানির শিকার হচ্ছে। তবে পিটাকের ভাইস চেয়ারম্যান ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বেনজির আলম বলেন, দেশে পেস্টিসাইড উৎপাদন হোক আমিও চাই। এ ক্ষেত্রে যাতে কোনো বাধা সৃষ্টি না হয়, বিষয়টি পরবর্তী পিটাক সভায় আমি জোরালোভাবে উত্থাপন করব।

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন