বাহারি রংয়ের মোড়কজাত পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ সব সময় বেশি থাকে। ফলে পণ্যের বাজারজাতকরণ ও বিক্রি বাড়াতে কোম্পানিগুলোও ফুড প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে বাড়তি মনোযোগ দেন। নানা রংয়ের মাধ্যমে প্যাকেটকে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়। তবে এসব প্যাকেট তৈরিতে ব্যবহার করা কালিতে থাকে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর উপাদান। যার মধ্যে টলুইন অন্যতম। এটি এক ধরনের বিষাক্ত উপাদান। ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে বিশ্বব্যাপী এটি বেশ পরিচিত। খাদ্যপণ্য এ ধরনের কালির সংস্পর্শে আসলে সেটি মানবদেহের ক্ষতি করে, পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি কালির এ উপাদানটি খুব দ্রুত বাষ্পীয় আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে যারা এ উপাদানযুক্ত কালির সংস্পর্শে কর্মরত থাকেন, তাদের জন্যও এটি ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য বিশ্বের অনেক দেশই খাদ্য-প্যাকেটজাতকরণে টলুইনযুক্ত কালি ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। যদিও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এ ধরনের সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। তবে জার্মানির একটি কোম্পানি বাংলাদেশে টলুইনমুক্ত কালি উৎপাদন করছে। নারায়ণগঞ্জে মেঘনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রতিষ্ঠানটির অত্যাধুনিক ব্লেন্ডিং সেন্টারের মাধ্যমে এ কালি উৎপাদন করে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিষাক্ত উপাদান হওয়ায় টলুইনকে সিএমআর-২ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এটি অনাগত শিশুর ক্ষতি করে। মাথা ঘোরা, হ্যালুসিনেশনসহ শরীরের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ক্ষতি করে এ উপাদান। সস্তা হওয়ায় এটিকে মাদক হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। ফুড প্যাকেজিংয়ের কালিতে টলুইনের উপস্থিতি থাকলে সেটি খাবারের মানের ওপর প্রভাব ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। টলুইনের এমন ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্যের কারণে গ্লোবাল ব্র্যান্ডগুলো তাদের খাদ্য পণ্যের প্যাকেজিং করার ক্ষেত্রে সতর্ক হয়েছে। প্যাকেজিং উপাদানের জন্য কালি ফর্মুলেশনে টলুইনের ব্যবহার নিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করেছে এসব প্রতিষ্ঠান। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধও করেছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপিয়ান প্রিন্টিং ইনক অ্যাসোসিয়েশন ফুড-প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে টলুইনমুক্ত কালি ব্যবহার করে আসছে। প্যাকেজিং কালিতে টলুইনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে চীন। শ্রীলংকা এ ধরনের কালি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড অথরিটি অব ইন্ডিয়া বা এফএসএসএআই প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা এ ধরনের কালিকে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে অ্যাখ্যা দেয়। এ জন্য এ ধরনের একটি আইনও করেছে তারা। টলুইন নিষিদ্ধ করার প্রতি পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে দেশটির উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোও।
টলুইন নিয়ে এমন বিধিনিষেধের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী নিরাপদ ফুড প্যাকেজিং কালি উৎপাদন করে যাচ্ছে জার্মানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সেগওয়ার্ক। প্যাকেজিং অ্যাপ্লিকেশন ও লেবেলের জন্য প্রিন্টিং কালি ও কোটিং সরবরাহকারী হিসেবে সুনাম রয়েছে তাদের। বাংলাদেশেও প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নারায়ণগঞ্জে মেঘনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ সালের জানুয়ারিতে অত্যাধুনিক ব্লেন্ডিং সেন্টার চালু করে প্রতিষ্ঠানটি। এ কারখানায় প্যাকেজিং, লেবেল ও কোটিংয়ের জন্য টলুইনমুক্ত প্রিন্টিং ইঙ্ক ও কোটিং উৎপাদন করছে সেগওয়ার্ক। প্রতিষ্ঠানটি দেশের শীর্ষস্থানীয় ৩৫টি ব্র্যান্ডের প্যাকেজিংয়ের কালি উৎপাদন করছে। সেগওয়ার্কের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাসে ৮৫০ টন প্যাকেজিং কালি ব্যবহার হয়। যার অর্ধেকের বেশি টলুইনযুক্ত। দেশীয় এ চাহিদার একটি বড় অংশ সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি। যার পুরোটাই টলুইনমুক্ত।
সম্প্রতি সরেজমিনে মেঘনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের এ কারখানা ঘুরে দেখা যায়, ৬৫০০০ বর্গফুটজুড়ে বিস্তৃত কেন্দ্রটি বাংলাদেশের বাজারের জন্য কাস্টমাইজড সলিউশনগুলো পরিচালনা করে। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে রাসায়নিক বিশ্নেষণাত্মক পরীক্ষার মাধ্যমে কালির গুণগতমান নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক রং নিশ্চিত করে মডিউল তৈরি করা হয়। এর পর হাতের স্পর্শ ছাড়াই অত্যাধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে উৎপাদন করে তা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব পরিবহনের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে।
সেগওয়ার্ক বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড অংশুমান মুখার্জি জানান, নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে সেগওয়ার্ক বাংলাদেশের প্রিন্টারগুলোতে কালি সরবরাহ করে আসছে। এ কালিতে টলুইন অথবা টলুইন রয়েছে এমন কোনো কাঁচামাল উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয় না। বিশ্বব্যাপী নিয়ন্ত্রক ও ব্র্যান্ড মালিকদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে টলুইনমুক্ত নিরাপদ প্যাকেজিং কালি উৎপাদন ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে কাজ করছে সেগওয়ার্ক।
টলুইনমুক্ত কালি উৎপাদনে খরচ তেমন বাড়ে না উল্লেখ করে অংশুমান মুখার্জি বলেন, সচেতনতা ও আইনি বিধান না থাকায় অনেক কোম্পানি টলুইনযুক্ত কালি ব্যবহার করছে। তবে আমরা কাস্টমার, ব্র্যান্ড ও নীতি নির্ধারকদের কাছে গিয়ে টলুইনের ক্ষতিকর দিকগুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি। এতে আস্তে-ধীরে হলেও সচেতনতা বাড়ছে বলে মনে করেন তিনি।
নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে তিনি আরও জানান, সেগওয়ার্কের ব্লেন্ডিং সেন্টার মেশিনারিজ ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি শুধু টলুইনমুক্ত কালি উৎপাদনের জন্য নিবেদিত। সেগওয়ার্ক প্লান্টে টলুইন উৎপাদন ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেগওয়ার্ক এক বছর আগে বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। স্থানীয়ভাবে কার্যক্রম শুরু করার আগে কোম্পানির বাংলাদেশের গ্রাহকরা ভারত থেকে সেগওয়ার্কের কালি আমদানি করতেন। ভারত থেকে আমদানি করে আনা পণ্যগুলো সীমান্ত পেরিয়ে আসতে বেশ সময় লাগত। তাই গত বছর থেকে এ দেশেই ব্লেন্ডিং সেন্টার স্থাপন করা হয়। বর্তমানে এর বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩৬০০ টন।
সেগওয়ার্ক একটি ষষ্ঠ প্রজন্মের পারিবারিক মালিকানাধীন কোম্পানি। কোলনের নিকটবর্তী সেগবুর্গে এর প্রধান কার্যালয়। প্যাকেজিং, লেবেল ও কোটিংয়ের জন্য প্রিন্টিং ইঙ্ক ও কোটিং উৎপাদনের ক্ষেত্রে এটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান। ১৯০ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি সারাবিশ্বে কালি সরবরাহ করে আসছে। পৃথিবীজুড়ে সেগওয়ার্কের ৩০টির বেশি দেশে প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী কর্মরত আছেন।

আবাসন সংকটে স্টল ও প্যাভিলিয়নের মালিক-কর্মচারীরা
ভোজ্যতেলের ভ্যাট–সুবিধা মেয়াদ বাড়লো ৪ মাস