সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২২ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

প্রতিকূলতায় আবৃত বইমেলা নিয়ে লেখকদের প্রত্যাশা

ভাষার মাসে বইমেলার বইয়ের ঘ্রাণ। ভিন্ন এক আনন্দের অনুভূতি। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লেখক-পাঠকের মিলনমেলা। মেলা উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। নানান রঙ আর ঢঙে সাজে স্টলগুলো। তবে করোনা পরবর্তী এবারের বইমেলায় প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে বেশ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কাগজের দাম বৃদ্ধি, কয়েকটি প্রকাশনীর আর্থিক সংকট, সঙ্গে সঙ্গে কাগজের বই পড়ার প্রতি অনেকের অনাগ্রহ। এত বাঁধার পরও লেখক-প্রকাশকদের প্রত্যাশার বড় জায়গাজুড়ে রয়েছে সেই অমর একুশে গ্রন্থমেলা। এবারের বইমেলা নিয়ে তরুণ লেখকদের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন আব্দুল্লাহ জুবায়ের

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৩, ০৪:৫৫

সাদাত হোসাইন:  শঙ্কা তো রয়েছেই গত দুই বছর ধরে বৈশ্বিকভাবেই নানা কারণে একটা অস্থিরতা চলছে। করোনা থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক মন্দা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। সুতরাং সেই অস্থিরতা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশনা শিল্পের উপরও পড়েছে। পাঠক তখনই বই কিনবে যখন তাদের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাবে। মেটানোর পর তো তারা বই পড়ার কথা ভাববে তাই নাহ? মানুষের ক্রয় ক্ষমতার উপর প্রভাব পড়েছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। মানুষ তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কেনার পরে বইয়ের কাছে আসবে। সুতরাং সেটা নিয়ে একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে সেটা আমরা অস্বীকার করবো না এবং সেই শঙ্কার কারণেই সবার মধ্যে একটা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে এবারের বইমেলা নিয়ে। অনিশ্চয়তা বলতে এবারের বইমেলা থেকে তাদের কী প্রাপ্তি ঘটবে। বাংলাদেশের প্রকাশকরা মূলত বইমেলার উপর নির্ভর করে থাকেন সারা বছর। কতটুকু কি করতে পারবেন। আমার কাছে মনে হয় এতগুলো শঙ্কার পরেও দিন শেষে আমরা বিশ্বাস করি যেই পাঠকরা বই ভালোবাসেন তারা সকল বাধা সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে বইয়ের কাছে আসবেই। শত শঙ্কার মধ্যেও বই প্রেমী পাঠকের বইয়ের প্রতি ভালোবাসাই আমাদের আশাবাদী হতে সাহস যোগায়।

এ্যানি আক্তার: প্রতি বছরের মতো এবারো বইমেলা ২০২৩ আমার কাছে ভীষণভাবে প্রতীক্ষিত। আমি অনুভূতিকে কবিতার ছাঁচে ফেলা মানুষ তাই এ বছরও আসছে আমার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ 'আমার শুধু এই তুমিটাই চাই'। বহু কাল ধরে বাংলা সাহিত্যের অবদান আমাদের কাছে অসামান্য হলেও আমরা দেখতে পাই দিনদিন পাঠকের ভেতর বই পড়ার স্পৃহা, চাহিদা কমে আসছে৷ এ বছর বই এর বাজারও বেশ চড়া, কাগজের মূল্যবৃদ্ধি আকাশচুম্বী। যার ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রকাশক, লেখক কারোর জন্যই পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। যার ফলে অনেক লেখকই এবছর বই বের করা থেকে বিরত থাকছেন। যেহেতু কাগজের দাম বেড়েছে তাই স্বাভাবিক ভাবে বই এর মূল্যও এবার তুলনামূলক বেশি হবার সম্ভাবনা রয়েছে। যা লেখক, প্রকাশক এবং পাঠক সকলের উপরই এর প্রভাব পড়বে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ ভাবে। এসব কারণে আশংকা করা হচ্ছে ২০২৩ এর বইমেলা প্রতিবছরের মতো ততটাই ফলপ্রসূ হবে কিনা। তবুও দেশব্যাপী পাঠকরা অধীর অপেক্ষায় আছে তাদের প্রিয় লেখকদের বই সংগ্রহ করার। সকল প্রতিবন্ধকতার পরও আমরা আশা রাখি পুরো ফেব্রুয়ারি জুড়ে একরাশ আনন্দ আর উৎসবের সাথে বইমেলা ২০২৩ উদযাপিত হবে। আর এভাবেই বই এর পৃথিবী গড়ে উঠবে সকল পাঠক হৃদয়ে।

ইসমত আরা প্রিয়া: বাঙালির প্রাণের মেলা অমর একুশে গ্রন্থমেলা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিগত দুই বছর ধরে বইমেলার ওপর এক অশুভ শক্তি ভর করেছিল। এ বছর মহামারির সেই প্রকোপ না থাকলেও কাগজের মূল্য বৃদ্ধি যেন লেখক-প্রকাশকের জন্য ভয়ংকর রূপ নিয়েছে, একই সাথে পাঠকের জন্যেও। মহামারি ঠিক যেমন আমাদের হতাশায় ডুবিয়ে দিয়েছিল, একই সাথে কাগজের মূল্য বৃদ্ধি একই রূপ নিয়েছে। এছাড়াও আমার নতুন উপন্যাস "বসন্ত ফিরে আসে" নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলাম। চাকরি, সংসার, সব ব্যস্ততায় লিখতে পারছিলাম না।  একসময় সিদ্ধান্ত নিলাম লেখালেখি থেকে ছুটি নেব কিন্তু এমন সিদ্ধান্ত নেবার পর মনে হলো একজন লেখক কখনো চাইলেও লিখা বন্ধ করতে পারে না। অবশেষে এই ব্যস্ততার মাঝেও লিখে ফেললাম 'বসন্ত ফিরে আসে'। একইসাথে, আমাদের বাঙালির প্রাণের এই মেলা অমর একুশে গ্রন্থমেলা। আমাদের আবেগি মনের অনুভূতি আদান-প্রদানের মেলা। এ যেন লেখক-পাঠকের উৎসব। আমার কাছে মেলা আসার ঠিক আগমুহূর্তে কেমন যেন এক অদ্ভুত আনন্দ কাজ করে। মহামারি কোভিডের জন্য গত দুটি মেলার পুরোটা ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে পাইনি। এ বইমেলাই লেখক-পাঠকদের একত্রিত করে। বহুদিন পর প্রিয় লেখক-পাঠক সবার সাথে দেখা হয়।

রাব্বি হোসেন: ডিজিটাল যুগে ছাপা বইয়ের চাহিদা যে এখনো ফুরায়নি তা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে বইমেলা এলে। পাঠ্য বইয়ের বাহিরে গল্প উপন্যাসের বই যেহেতু শখের বিষয় সেক্ষেত্রে বই কেনা বা না কেনা নির্ভর করে পাঠকের মনের উপর। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবছর কাগজের দাম বাড়ার কারণে সাধারণভাবেই বইয়ের দামও বাড়ছে। বাড়তি এ দাম পাঠকরা কতটা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবে তা নিয়ে লেখক, প্রকাশকসহ সবাই দুশ্চিন্তায় রয়েছে। অনেক প্রকাশনী নতুন লেখকদের তেমন একটা সুযোগ দিতে চাইবে না। বাড়তি দাম পাঠক গ্রহণ না করলে প্রকাশনিগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে তারা তাদের নিয়েই কাজ করবে যাদের পাঠক মহলে গ্রহণযোগ্যতা আগে থেকে তৈরি আছে। কাগজের দাম সাধ্যের মধ্যে রাখলে লেখক, পাঠক ও প্রকাশক সবার জন্যই স্বস্তির হবে। সব কিছু ছাপিয়ে একজন লেখক হিসেব আমি আশাবাদী যে, পূর্বের মতোই পাঠকরা ছাপা বইয়ের প্রতি মনোযোগী হবেন এবং বইপড়ার প্রতি আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিবেন।

লামিয়া হান্নান স্নেহা: লেখালিখি শুরু করেছিলাম সাহস করে, বই প্রকাশ করেছিলাম দুঃসাহসী হয়ে। কিন্তু এখন সামান্য কিছু কারণে থেমে যাব, এটি বড়ই বেমানান। প্রতিবন্ধকতাকে পেরিয়ে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়াই হচ্ছে একজন মানুষের কর্তব্য। আমিও ঠিক তাই করছি। শত প্রতিকূলতার মাঝেও লিখে ফেলেছি আমার দ্বিতীয় বই 'অশরীরী' এবং আস্থা রাখছি পাঠকদের উপর। বইপড়ুয়া মানুষ বই কিনবে এবং পড়বে। হয়তো এবারের তালিকায় বইয়ের সংখ্যা একটু কমবে। তবে পাঠকদের প্রতি বিশ্বাস রেখেই বলছে এবছরও বই প্রেমীরা আমাদের মতো নবীন লেখকদের অনুপ্রেরণা আর প্রবীণদের ভালোবাসা জানাতে, নিজের বই পড়ার অভ্যাসটা বজায় রাখতে হলেও বই কিনবেন ইনশাআল্লাহ।

ইত্তেফাক/এআই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন