ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তব অবস্থা

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৩:৫২

২০১৫-১৬ অর্থবছরে এনবিআর কর্তৃক মূসক আদায়ের পরিমাণ ছিল ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর এর তৎপরতা ও দেশের উন্নতির স্বার্থে রাজস্ব আদায়ের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় মূসক আইন ১৯৯১ বলবৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত সেটা বেড়ে হয় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। মূসক আদায় বৃদ্ধির হার ওই চার বছরে ছিল ৮৯.১৩%। যা সম্ভব হয়েছিল আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে মূসক আদায়ের পরিকল্পনা ও সেটার বাস্তবায়ন করার ফসল। এই বৃদ্ধির হার জিডিপি বা ব্যাবসায়ের প্রবৃদ্ধি যে কোন হারের বিবেচনায় অকল্পনীয় সফলতা হিসাবে বিবেচনা করা যায়। এটাকে বেইজ মার্ক ধরে পরবর্তী পরিকল্পনা করা যে অবিচকের কাজ হবে সেটা এর পরবর্তী তিন বছর বিশ্লেষণ করলে অনুমান করা যায়।

২০১৯-২০ অর্থ বছর থেকে শুরু হয় নতুন মূসক আইন ২০১২ যা এত বেশি স্বপ্ন দেখিয়ে এসেছিল যে রাতারাতি মূসক আদায় পূর্বের ন্যায় চার বছরের জায়গায় প্রতি দুই বছরে দ্বিগুণ মূসক আদায় করা যাবে বলে প্রচার করা হয়। বাস্তবতা হলো ২০১৯-২০ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত মূসক আদায় হয় ১.০৩ লাখ কোটি টাকা। পূর্বের আইনের তুলনায় নতুন আইনের তিন বছরে অধিক আদায় করা হয় মাত্র ১৬ হাজার কোটি টাকা। যা শতকরা হিসাবে ১৮.৩৯ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পায়। কল্পনার হাতি ফানুস হয়ে ধরা পড়ে অতি শৌখিন জলচর মাছের ন্যায়। অর্থাৎ সেই সৌখিন মাছটির মৃত্যু হয়। যেমন, মৃত্যু হয় কল্পনার নতুন মূসক আইনের ভ্যাট আদায় করার স্বপ্নের।

ফলাও করে প্রচার করার আর একটা পজেটিভ দিক হলো ২০১৫-১৬ অর্থ বছর থেকে ২০২১-২২ অর্থ বছর পর্যন্ত মূসক আদায়ের এত সফলতা যা বিবেচনায় নিলে এর সাথে জড়িত সবাই একটা করে জমিসহ বাড়ি সরকারের নিকট চাইতেই পারে। গত সাত বছরে মূসক আদায়ের বৃদ্ধির হার হলো ১২৩.৯১% অর্থাৎ প্রায় ১২৪ শতাংশ। এই বৃদ্ধির হার অনুসরণ করে আগামী সাত বছর পর অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছরে মূসক আদায় এর পরিমাণ হবে ২৩০.৫৭ লাখ কোটি টাকা। আর যদি গত তিন বছরের বৃদ্ধির হার বিবেচনায় নেওয়া হয় তাহলে সেই একই সময়ে মূসক আদায়ের পরিমাণ হবে ১২১.৫৭ লাখ কোটি টাকা। এই হারের আদায় যা ২০২৮-২৯ সালে আদায় বলে বিবেচিত হলেও ২০১৯-২০ অর্থ বছরে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১.২৫ লাখ কোটি টাকা। সেই লক্ষ্যমাত্রা গত তিন বছর ঘুরে ফিরে আসছে কিন্তু আদায়ের লাখের ঘর বিগত অর্থ বছর অর্থাৎ ২০২১-২২ এ পার করে সম্মান রক্ষা করা গেল। সেটাও কিন্ত নাম মাত্র পার করার মধ্যে।

একটা ছেলে একটা বিশাল মাঠ হেঁটে পার হচ্ছিল। প্রশ্ন করা হল ছেলেটি সেই মাঠেরে প্রথম অর্ধেক পার হতে যদি একঘন্টা সময় লাগে তাহলে সে কত সময়ে মাঠের দ্বিতীয় অর্ধেকে যাবে? একজন উত্তর দিল একঘন্টা এক মিনিট। উত্তর শুনে সবাই অবাক হয়ে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটি বলল, আপনারা আমার কথা বিশ্বাস করতে পারছেন না তো?

তাহলে খুলে বলি, লোকটা মাঠের অর্ধেক পার হয়ে যখন সামনের দিকে এক পা রাখবে, তখনই সে কিন্তু মাঠের দ্বিতীয় অর্ধেকে চলে আসবে। সেটা করতে তার এক মিনিটের কম সময় লাগার কথা থাকলেও সেটা আমি পূর্ন সংখ্যায় বলেছি। প্রশ্নে কিন্তু বলা হয়নি, বাকি অর্ধেক পার হওয়ার কথা। বলা আছে অর্ধেকে আসার কথা। সবাই মেনে নিতে বাধ্য হলো। আমাদের মূসক আদায়ের লাখের ঘর পার হওয়ার বিষয়টা অনেকটা এই গল্পের ন্যায়। এবছর রাজস্ব সম্মেলনে ঘোষণা করা হল ২০৩১ সালে মূসক আদায় করার পরিকল্পনা ৪.৫০ লাখ কোটি টাকা। যা বর্তমানের চেয়ে প্রায় তিন শত গুন বেশি। উচ্চাশা থাকা ভালো তবে সেটার পরিমাণ ধরা ছোঁয়ার বাইরে গিয়ে পরে থাকা কল্পনাকে অবহেলায় ছেড়ে যাবে যে নতুন পরিকল্পনা করার সাহস পাবে না।

আমাদের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার সময় তো বলা হয় না সেটা আদায় করতে না পারলে সকল সুবিধা বন্ধ করা হবে প্রথম বছরে। দ্বিতীয় বছরে না পারলে বেতন বদ্ধ হয়ে যাবে আর তৃতীয় বছর চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হবে। যদি এমন বলা থাকতো তবে চলতি অর্থবছরে এনবিআর এ কোন লোক খুঁজে পাওয়া যেত না। তাহলে তখন কি হতো? সকল ব্যাবসায়ী সমস্ত টাকা মেরে বিদেশে চলে যেত। দেশ অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গু হয়ে যেত। ভাগ্যিস সেটা করা হয় নাই। তবে প্রশ্ন হল যদি লক্ষমাত্রা অর্জনে কোন দায় তৈরি না হয় তাহলে সেটার প্রয়োজনীয়তা কি? আছে, সেটা হল বাজেট প্রণয়ন করতে একটা এস্টিমেট আয়ের দরকার হয়।

সরকার বাজেট তৈরি করতে যে আয়ের লক্ষমাত্রা ধরে প্রক্কলিত ব্যয় করা হয় কিন্তু প্রতি বছর শেষ দুই কোয়াটার এ সকল আয়ের লক্ষমাত্রা পুনায় বিগত দুই কোয়াটার এর প্রকৃত আয়ের চেয়ে সামান্য কিছু বেশি রেখে সেটা ঠিক করা হয়। আমাদের মতে যেহেতু এই ধরনের টার্গেট ধরে ভ্যাট আদায় করা কোন দায় বা বাজেটের উপর কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারে না তাহলে সেটা গুরুত্বহীন। যেহেতু এই এই টার্গেট ব্যাবস্থা কোন ফল বা প্রভাব নাই তাহলে সেটা বাদ দিয়ে যদি ডেভলপমেন্ট বেইজ ভ্যাট আদায় পদ্ধতি চালু করা যায় তাহলে অনেক দিক থেকে মূসক আদায় কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী উভয়ের জন্য ভাল কিছু বয়ে আনতে পারে।

ডেভলপমেন্ট বেইজ ভ্যাট আদায় হল প্রতি মাসে নিচ থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় সারির প্রতিটি কর্মকর্তাকে যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান ভ্যাট প্রযোজ্য বা প্রযোজ্য বলে বিবেচিত সে ধরনের তিন থেকে পাঁচটা ব্যাবসায় প্রতিষ্ঠান দেওয়া হবে। উনারা সেই প্রতিষ্ঠানের সকল লেনদেন বিচার বিশ্লেষন করে। মূসক প্রদানের সাথে সম্পর্ক যুক্ত সকল দলিলাদি আইন অনুযায়ী সংরক্ষণের উদ্যোগ নিবেন ও ঐ প্রতিষ্ঠানের মালিককে সে বিষয়ে সকল কিছু শিক্ষা দিবেন এবং সেখান থেকে সরকারের ন্যায্য মূসক আদায়ের ব্যাবস্থা নিবেন। এই সকল কিছু বিভাগীয় কর্মকর্তার সুপার ভীষণ থাকবে, যাতে করে কোন অযৌক্তিক কিছু না হয়। এতে প্রথম সুবিধা হল বর্তমানে কোন কর্মকর্তার যে কোন প্রকারের প্রতিষ্ঠানের লেনদেন সম্পর্কে ধারণা না থাকায় অহেতুক ঝামেলা তৈরি করে, সেটা আর থাকবে না তেমনি প্রতিষ্ঠানটি কোন ঝামেলা বা সন্দেহ ছাড়া একজন ভ্যাট আদায় করা কর্মকর্তার দ্বারা সিস্টেম উন্নয়ন করার ফলে পরবর্তী যে কোন ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার প্রশ্নই তৈরি হবে না।

আরো কিছু সুবিধা হল এখন বাস্তব জ্ঞান না থাকার শুধু বিদ্যুৎ বিলের ইউনিট বিবেচনায় পণ্য উৎপাদ করে মূসক ফাঁকির দাবি করা হয় যা দেখলে মনে হবে দেশ কত এগিয়ে গেছে, মূসক কর্মকর্তারা সব বিজ্ঞানী হয়ে কাচামাল ছাড়া পণ্য উৎপাদন করে বিক্রি করে সেটার উপর মূসক আদায় এর ব্যাবস্থা করছে। দেশে বেশির ভাগ কাচামাল বিদেশ থেকে না আমদানি করায় প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে না।

ডেভলপমেন্ট বেস মূসক আদায় করতে গেলে তখন মনে হবে আছিলাম বোকা, আর এখন হলাম চালক। এতে করে ব্যবসায়ীর সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন হবে, যা বর্তমানে চোর মনে করা হলেও তখন মনে হবে আসলে কত পরিশ্রম করে একজন মানুষ ব্যাবসায় প্রতিষ্ঠান দাড় করায়, সে কথা মনে করে পূর্বের সকল খারাপ আচরণ ও অন্যায্য সুবিধা ফেরত দিতে মরিয়া হয়ে উঠবেন। তখন উপলব্ধি করবেন যার দেওয়া করের টাকায় তার বেতন হয় তিনিই তো আসল স্যার, এতদিন মিথ্যা অহমিকা করেছেন।

একটু বেশি বললাম কারণ মুষক আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না করায় কোন শাস্তি নাই তেমনি আমার এই কল্পনার কোন জরিমানা বা অপরিশোধিত মূসক দাবি করার সুযোগ নেই তাই লিখলাম আর কি তবে ডেভলপমেন্ট বেস ভ্যাট আদায় করার বিষয় একদিন এ দেশে হবে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই তবে আমরা হয়তো দেখে যেতে পারব না। বেশিদিন আগের কথা নয়, এই ধরুন দশ বছর আগে একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে একজন ব্যাংক কর্মকর্তা যে আচরণ করতেন সেটা মনে থাকলে সহজেই সহজে বর্তমান সময়ের সাথে তুলনা করে পরিবর্তন বের করতে পারলে ডেভলপমেন্ট বেস ভ্যাট আদায় যে শুধু কল্পনা না সেটা বুঝতে অপেক্ষা করতে হবে না।

 লেখক: লিড কনসালটেন্ট, টি আর সি

ইত্তেফাক/এসসি