আমরা জন্ম হইতেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখিয়া আসিতেছি। এই দুর্যোগ মূলত সমুদ্রজাত ঘূর্ণিঝড়। কিন্তু, বলা নাই কওয়া নাই, হঠাত্ই আকাশে রাক্ষসের শুঁড়ের ন্যায় ঘূর্ণায়মান চক্র আসিয়া সকল কিছু লন্ডভন্ড করিয়া দিয়া গেল—এই ধরনের দুর্যোগ আমাদের দেশে সাধারণত কম ঘটে। কয়েক বৎসর পূর্বে হাকালুকি হাওরের চাতলার পাড় অংশের মানুষ এই ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হইয়াছিল বটে। ইহার নাম টর্নেডো। অতীতের কথা স্মরণ করিলে ১৯৮৯ সালে মানিকগঞ্জ জেলায় সৃষ্ট টর্নেডোর কথা বলিতে হয়। সেই সময় ভয়াবহ টর্নেডোর সৃষ্টি বিপর্যয়ে প্রাণ হারাইয়াছিলেন প্রায় ১ হাজার ৩০০ মানুষ। ইহারও পূর্বে ১৯৬৯ সালে ঢাকায় সৃষ্ট এক টর্নেডোর কারণে প্রাণ হারাইয়াছিল সহস্রাধিক মানুষ। ১৯৬৪ সালে মাগুরা ও নড়াইলের টর্নেডোতেও নিহত হইয়াছিল কয়েক শত মানুষ। সম্প্রতি, গত সপ্তাহ জুড়িয়া অর্ধশতাধিক শক্তিশালী টর্নেডো আছড়াইয়া পড়িয়াছে আমেরিকার বিভিন্ন শহরে। ইতিমধ্যে মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়া ৩২ জন হইয়াছে। সেইখানকার স্থানীয় আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গিয়াছে, টর্নেডোর প্রভাবে ঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৭০ হইতে ১৮০ কিলোমিটার। প্রথমে শুক্রবার, তাহার পর শনিবারও তাণ্ডব চালাইয়াছে টর্নেডো। আমেরিকার আর্কানসাস, মিসিসিপি, আলবামাসহ বহু প্রদেশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। ভাঙিয়া পড়িয়াছে বহু বাড়িঘর, অনেক মানুষ নিখোঁজ রহিয়াছেন। এই বিপর্যয়ের ফলে বিচ্ছিন্ন হইয়া গিয়াছে ইলেকট্রিসিটি। ৬ লক্ষাধিক বাড়িতে শনিবার হইতে বিদ্যুৎ নাই। স্বাভাবিকভাবেই সেই সকল অঞ্চলে জারি করা হইয়াছে জরুরি অবস্থা। বিষয়টি এইখানেই থামিয়া নাই, আমেরিকার বেশ কিছু জায়গায় জাতীয় আবহাওয়া অফিস আগামী কয়েক সপ্তাহের জন্য টর্নেডো লইয়া সতর্কতা জারি করিয়াছে।
বিশ্বের সবচাইতে অধিক টর্নেডো-প্রবণ দেশ হইল যুক্তরাষ্ট্র। ২০২১ সালের ডিসেম্বর সেইখানে এত ভয়াবহ টনের্ডোর আঘাত আসিয়াছিল যে, শতাধিক মানুষ নিহত হইয়াছিল। সেই সময় টর্নেডোটি ২২৭ মাইল দীর্ঘ পথে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাইয়াছে হাজার হাজার বাড়িঘর ধ্বংস সাধনের মাধ্যমে। কিন্তু কেন এত ঘনঘন টর্নেডো হয় যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলে? টর্নেডো আসলে কী জিনিস? ‘টর্নেডো’ শব্দটি আসিয়াছে স্পেনীয় অপভ্রংশ ‘ত্রোনাদা’ হইতে। এই শব্দটি আসিয়াছে ল্যাটিন শব্দ ‘তোনারে’ (যাহার অর্থ ‘বজ্রপাত’) হইতে। টর্নেডোকে ঘিরিয়া অনেক অতিপ্রাকৃত ঘটনা বা কল্পকাহিনিও প্রচলিত রহিয়াছে। এই জন্য অনেকে মনে করেন, কোনো লোককাহিনি হইতেও টর্নেডো শব্দের ব্যুৎপত্তি হইতে পারে। শব্দের ব্যুৎপত্তি যেইভাবেই হউক না কেন, টর্নেডো সৃষ্টি হয় মেঘ হইতে। ইহা মেঘ এবং পৃথিবীপৃষ্ঠের সহিত সংযুক্ত বায়ুস্তম্ভের আকারে সৃষ্ট প্রচণ্ড বেগে ঘূর্ণায়মান ঝড়। টর্নেডোর আকৃতি বিভিন্ন ধরনের হইলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ইহাকে ঘনীভূত ফানেলের আকারে দেখা যায়। এই ফানেলের একটি অংশ থাকে ভূপৃষ্ঠের দিকে অন্য অংশটি আকাশের দিকে। ইহা প্রায়শই বজ্রমেঘ দ্বারা ঘিরিয়া থাকে এবং ফানেলের ভিতরকার তীব্র বাতাসের টানে সকল কিছুকে উপরের দিকে টানিয়া লয় বিধায় টর্নেডোর বিধ্বংসী ক্ষমতা ভয়াবহ। আবহাওয়া বিশারদরা বলিয়া থাকেন, টর্নেডো দেখিতে কেমন হইবে—তাহা মূলত নির্ভর করে সূর্যের অবস্থানের উপর। টর্নেডো সংঘটিত হইবার সময় যদি সূর্য ইহার পিছনে থাকে, তবে টর্নেডো কালো দেখায়। অপর দিকে, সূর্য যদি দর্শকের পিছনে থাকে, একই টর্নেডো ধূসর বা উজ্জ্বল সাদা দেখায়। সূর্যাস্তের সময় যেই সকল টর্নেডো হয়, সেইগুলি আলোর কারণে হলুদ, কমলা, গোলাপিসহ বিভিন্ন রঙের হইতে পারে। অধিকাংশ টর্নেডোতে বাতাসের গতিবেগ থাকে ঘণ্টায় ১৭৭ কিলোমিটারের কাছাকাছি। ইহার ব্যাপ্তি প্রায় ৭৫ মিটার এবং দ্রুত নিঃশেষিত হইবার পূর্বে ইহা কয়েক মাইল পথ পাড়ি দিতে পারে।
আমেরিকায় গত সপ্তাহে যেই পরিমাণ টর্নেডোর আঘাত করিয়াছে এবং পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েক সপ্তাহেও আরো কিছু টর্নেডো আঘাত করিতে পারে—ইহাতে প্রধানত ক্ষতির শিকার হইতেছে তুলনামূলক কম বিত্তশালী মানুষেরা। ইতিমধ্যে যেই পরিমাণ ক্ষতিসাধন ও প্রাণক্ষয় হইয়াছে, তাহার জন্য আমরা শোকাভিভূত। নিহতদের আত্মার সদগতি কামনা করিতেছি।
