শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ৮ আশ্বিন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

কুকুরগুলো জানত সব

আপডেট : ২৪ জুন ২০২৩, ২১:৩১

লুনা ম্যাডাম ছাত্রছাত্রীদের কাছে খুব প্রিয়। তাঁর ক্লাস মানেই আনন্দঘন পরিবেশ। তিনি পাঠ্যবইয়ের বাইরের পাঠও দেন। লুনা মিস এলেন ক্লাস এইটের ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র ক্লাস নিতে। মধ্য দুপুর। কয়েকদিন ধরে মাঝারি তাপপ্রবাহ চলছে। বড় ক্লাসরুমটায় চারটা বৈদ্যুতিক পাখা থাকলেও তাতে স্বস্তি মেলে না। পাখার বাতাসও উত্তপ্ত। ছেলেমেয়েরা স্বাভাবিকভাবেই একটু ঝিমিয়ে আছে। লুনা মিস অনুধাবন করলেন, এ অবস্থায় সরাসরি ভয়েস চেঞ্জের মতো একটা টপিকে না যাওয়াই ভালো।

লুনা মিস বাইরে তাকালেন। স্কুলের বারান্দা থেকে একটু দূরে ধুলোয় বসে একটা কুকুর লম্বা জিভ বের করে গরমে ধুঁকছে। কুকুরটা হয়তো স্কুলদালানের বারান্দায় উঠে আসতে চায়, কিন্তু সাহস পাচ্ছে না। লুনা মিস বললেন—আমরা তবু ইলেকট্রিক ফ্যানের বাতাসে বসে আছি। আমাদের অনেকের বাড়িতেই এসিও আছে। ঐ কুকুরটার কথা ভাবো। এই গরমে ওদের কত কষ্ট। অনেক গরিব মানুষও এই গরমে অনেক কষ্ট পাচ্ছে। বৈদ্যুতিক পাখা তো দূরের কথা, অনেকের বস্তি ঘরে একটা জানালাও নেই।

এ কথা বলতেই ক্লাসের থার্ডবয় আদিত্য ক্লাস থেকে বের হয়ে গেল। কুকরটাকে গলা ধরে বারান্দায় তুলে দিয়ে ক্লাসে ফিরে এলো।

লুনা মিস বললেন, ‘বাহ! প্রাণীদের প্রতি তোমার এই মমতা—এই ভালোবাসা সত্যিই প্রশংসনীয়।’

আদিত্য বলল, ‘ডগ ইজ মাই মোস্ট লাভিং এনিমেল।’

‘মোস্ট লাভিং! হোয়াই?’

‘আমি যে আজ বেঁচে আছি এর জন্য কয়েকটা কুকুরের কাছে আমি ঋণী। ওরা আমার জীবন বাঁচিয়েছে।’

আদিত্যের এ কথা শুনে লুনা মিস খুব অবাক হলেন। ক্লাসের অন্য সবার ভেতরও কৌতূহল জাগল, কী করে একটি কুকুর আদিত্যকে বাঁচাল! লুনা মিস বললেন, ‘একটু খুলে বলবে?’

‘জি ম্যাডাম। জন্মের পর কোনো এক কারণে আমার জন্মদাত্রী আমাকে রাতের আঁধারে ডাস্টবিনে ফেলে রেখে গিয়েছিল। সকালে কয়েকটা কুকুর সেই ডাস্টবিন ঘিরে ভীষণ চিত্কার করতে থাকে। সেখান দিয়ে অফিসে যাচ্ছিলেন ব্যাংকার মোর্শেদ হাসান। তিনি আমাকে গাড়িতে তুলে নেন, তাঁর বাড়িতে আশ্রয় দেন। এখন আমাকে তাঁর সন্তানের মতো করে বড় করছেন।’

লুনা মিস ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন। অন্যান্য ছেলেমেয়েও স্তব্ধ হয়ে আছে। তারা আদিত্যকে জেনে এসেছে বড় ব্যাংক কর্মকর্তার সন্তান। সে এখন কী বলছে এসব?

আদিত্য কারো বিস্ময়-বিহ্বলতা খেয়াল করল না। সে তার মতো বলতে লাগল, ‘আমি এখনো ছুটির দিনগুলোতে সেই ডাস্টবিনের কাছে যাই। সেখানে যেসব কুকুর পাই তাদেরকে পাউরুটি, বিস্কুট, মাংস ইত্যাদি খাবার দেই। আমি যতদিন পৃথিবীতে বেঁচে থাকব ততদিন সেখানে যাব, ততদিন সেখানকার কুকুরদের খাবার দিব।’

লুনা মিস বললেন, ‘সেই ডাস্টবিনটা কোথায়?’

আদিত্য ডাস্টবিনটার অবস্থান বলল। তা শুনে লুনা মিসের মনে হলো, তিনি যেন মাথা ঘুরে পড়ে যাবেন। কোনোমতে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রেখে বললেন, তুমি কি জানো সেই দিন-তারিখটা?

‘জি, আমার বাবা-মা বলেছেন।’

আদিত্য দিন-তারিখ-মাস-বছর সব বলল। লুনা মিস আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। তিনি টেবিলে হাতের ভর দিয়ে কোনোমতে গিয়ে চেয়ারে বসলেন। কিছুক্ষণ টেবিলে মাথা নামিয়ে রাখলেন। আদিত্যের শৈশবের ঘটনা শুনে ক্লাসের সবাই খুবই বিস্মিত, হতভম্ব। কিন্তু লুনা মিসকে এমন বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে কেন—তা কেউ বুঝতে পারছে না।

কিছুক্ষণ পর লুনা মিস মাথা তুলে বললেন, ‘তোমার মায়ের নাম কি সাহনাজ পারভিন?’

‘জি, ম্যাডাম।’

লুনা মিস কাঁদতে লাগলেন। তার চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রুধারা নেমে আসছে। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বললেন, ‘আদিত্য, বাবা তুমি আমার কাছে একটু আসবে? আমি তোমাকে একটু বুকে চেপে ধরে রাখব।’

আদিত্য উঠে লুনা মিসের কাছে গেল। লুনা মিস ওকে ধরতে গিয়ে কেমন থরথর করে কাঁপতে লাগলেন এবং শেষ পর্যন্ত বুকে জড়িয়ে ধরতে পারলেন না, স্পর্শও করতে পারলেন না। চেয়ার থেকে গড়িয়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন।

ছাত্রছাত্রীরা ছুটে গিয়ে টিচার্সরুমে খবর দিল। অন্যান্য শিক্ষক এবং কর্মচারীরা ছুটে এলেন। দ্রুত তাঁকে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গেলেন।

সেদিন আর বিশেষ কোনো ক্লাস হলো না। স্কুল ছুটি হয়ে গেল।

বাসায় ফিরে আদিত্য খুবই চুপচাপ। শুধু ভাবছে, লুনা মিস এভাবে অজ্ঞান হলেন কেন?

বিকালে আদিত্য মাঠে গেল না। আজ তার খেলতে ইচ্ছা করছে না।

বাবা বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন। আদিত্য গেল বাবার কাছে। বাবার পাশে বসল। বাবা বললেন, ‘মাঠে খেলতে যাবে না?’

‘না বাবা। আজ খেলতে ইচ্ছা করছে না।’

‘সামনে পরীক্ষা আছে নাকি? ক্লাস টেস্ট বা অন্যকিছু...?’

‘না বাবা।’

‘তাহলে? তোমাকে অমন মনমরা লাগছে কেন? কিছু হয়েছে?’

‘বাবা...।’

‘কিছু বলবে?’

তারপরই আদিত্য দুম করে ক্লাসের ঘটনাটা বসে ফেলল। শেষে প্রশ্ন জুড়ে দিল, ‘আচ্ছা বাবা, লুনা মিস এভাবে অজ্ঞান হয়ে গেলেন কেন?’

বাবা বললেন, ‘সব কেনর উত্তর হয় না। লুনা মিস তোমার শিক্ষক—তোমার পরম শ্রদ্ধেয় মানুষ। আর শোনো, কাল তোমাকে স্কুলে যেতে হবে না। আমি কাল তোমার স্কুলে গিয়ে তোমার টিসি নিয়ে আসব। আমি তোমাকে অন্য স্কুলে ভর্তি করব।’

আদিত্য খুব অবাক হলো। বাবার কথাগুলো তার খুবই এলোমেলো-খাপছাড়া লাগছে। সে বলল, ‘বাবা, এ স্কুলের শিক্ষক, বন্ধু সবাই আমার খুব প্রিয়। আমি এই স্কুল থেকে কেন চলে যাব বাবা?’

বাবা বললেন, ‘বললাম তো সব কেনর উত্তর হয় না। যাও, মাঠে গিয়ে খেলা করো। যাও...।’

 

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন