বরাবরই অর্থমন্ত্রীর বাজেট নিয়ে এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিশেষ করে কোভিডকাল থেকে শুরু করে যেখানে অর্থনীতি নানামুখী সংকটে—একটা ভালো করলে তো দেখা যায় অন্যটার বেহাল হাল। সবকিণং সমন্বয় করে অর্থনীতিতে ছন্দ রাখাই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। এমনিতেই লাগামহীন মূল্যস্ফীতির চাপে দেশের জনজীবন অতিষ্ঠ। এর মধ্যে আবার বাজেট! আর বাজেট মানেই কোনো না কোনো পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, যা জনমনে ভীতি সঞ্চার করে। যেসব পণ্যের ওপর শুল্ক-কর ও ভ্যাট বাড়ানো হয়, তা বাজেট পাশ হওয়ার আগেই মূল্য বেড়ে যায়। আর যেসব পণ্যে কমানো হয়, তা নানা অজুহাতে মূল্যহ্রাসে কালক্ষেপণ হয়। এই বাস্তবতা আমাদের দেশে রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে বাজেট মানেই এখন দুশ্চিন্তা বা বাড়তি চাপ। জনগণের এখানে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। আবার বাজেটের অনেক কিছুই সাধারণের বোধগম্য নয়। তাই সব চাপ সওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। তবে জনগণের যে প্রতিনিধি, যারা মাসব্যাপী জনকল্যাণে বাজেট আলোচনায় অংশগ্রহণ করে, সেখানেই বা কতটুকু জনমনের কথা ফুটে ওঠে? বাজেটের গুণগত দিক বা স্বচ্ছতা ও জনসম্পৃক্ততার নিরীক্ষে কোন অবস্থানে আছে বাংলাদেশ, সেই আলোচনায় পরে আসি। গতানুগতিকভাবে এবারও অর্থমন্ত্রী বড় বাজেট ঘোষণা করেন, যার পরিমাণ ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। বিশালতায় কমতি নেই। তাই বাজেট ঘাটতি কমানোরও কোনো অবকাশ নেই। ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, সরকারের আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পাল্লাই ভারী। তাই তো শেষ পর্যন্ত ঋণ করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর থাকে না। এবারের বাজেটেও সরকারকে ঋণের সুদাসল পরিশোধ করতে হবে ১ লাখ ১৯ হাজার ১০০ কোটি টাকার ওপর। অন্যদিকে জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আদায়ে এক লজ্জাজনক অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। এটি জিডিপির মাত্র ৯ শতাংশের মতো। অথচ আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ড অনুযায়ী, আমাদের মতো দেশে অবশ্যই কর-জিডিপির হার ১২ থেকে ১৫ শতাংশ হওয়া উচিত। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বলছে, কর ফাঁকি ও অস্বচ্ছ ব্যবস্থার কারণে সরকার বছরে ৫৫ হাজার ৮০০ কোটি থেকে ২ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। গবেষণায় ১৫ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কর ফাঁকি দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ৬৮ শতাংশ মানুষ করযোগ্য আয় করার পরও আয়কর দেয় না। অন্যদিকে জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে ২ লাখ ১৩ হাজার কোম্পানি রেজিস্টার্ড হলেও রিটার্ন দাখিল করে মাত্র ৪৫ হাজার কোম্পানি। কারণ হিসেবে অনেকে মনে করেন করের উচ্চ হার। ধরে নেওয়া হয়, রাজস্ব ঘাটতি মোট জিডিপির ৫ শতাংশের নিচে থাকা ঝুঁকিমুক্ত। তাই বাজেটের আকার, ঘাটতি ও ঋণ আপতদৃষ্টিতে অনেকের কাছে তেমন শঙ্কা তৈরি করছে না। তবে আমরা যদি অন্যভাবে বাজেট ঘাটতি ও মোট রাজস্ব আয়ের অনুপাত দেখি, তাহলে প্রতিভাত হবে, আয় ছাড়াই সরকারি ব্যয় কী পরিমাণ গেড়েছে। ১৯৯৪ থেকে ২০১৪—এই ২০ বছরে রাজস্ব ঘাটতি গড় মোট রাজস্ব আয়ের ৩৪ শতাংশের আশপাশে ছিল। কিন্তু ২০১৫ সালে প্রথম বারের মতো এটিকে আর ঐ অঙ্কে আটকে রাখা যায়নি—ঘাটতির পরিমাণ পৌঁছায় রাজস্ব আয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশে, যা ক্রমান্বয়ে আরো বেড়ে আগামী বাজেটে ৫২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই যে আয়ের ঘাটতি, তা কোথা থেকে অর্থায়ন করা হয়? নিশ্চয়ই ঋণের মাধ্যমে। সার্বিক বাস্তবতায় বিনিয়োগের পরিবেশ বজায় রেখে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন, পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনাই বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ। যদি মূল্যস্ফীতি কোনোক্রমে আরো বেড়ে যায়, তাহলে দেশে এক ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির উত্তাপে সবচেয়ে ভুক্তভোগী নিম্নশ্রেণির মানুষ। তাদের সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়িয়ে দুঃখ-কষ্ট কিছুটা লাঘব করা যায় কি না, সেই পরামর্শই দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা। আগামী অর্থবছরের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। বরাদ্দ বেড়েছে ১১ দশমিক ১৭ শতাংশ। প্রতি বছরই সামাজিক খাতে বরাদ্দ বাড়তে দেখা যায়। তবে কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগীদের বাছাই প্রক্রিয়ায় থাকে গলদ। বাস্তবায়ন পর্যায়েও দেখা যায় অনিয়ম, দুর্নীতি। সর্বোপরি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
সিপিডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যোগ্য অথচ ভাতা পান না এমন বয়স্ক লোকের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ, বিধবা ১৭ লাখ এবং শিক্ষাবৃত্তি পাচ্ছে না এমন শিশু ১ কোটি ৪০ লাখ। অথচ জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৩০ শতাংশ বয়স্ক ও ৩৩ শতাংশ বিধবা এই ভাতা পাওয়ার যোগ্য নন বলে নিজেরাই জানিয়েছেন। আগামী অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৮ হাজার ৫২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে ছিল ৩৬ হাজার ৮৬৩ কোটি। টেকসই উন্নয়নের প্রথম শর্ত হচ্ছে মানবসম্পদ উন্নয়ন। আর মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ অপরিহার্য। প্রস্তাবিত বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮৮ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। তা চলতি অর্থবছরের চেয়ে মাত্র সোয়া ৮ শতাংশ বেশি। বরাবরই স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে একটি গতানুগতিক বরাদ্দ দেখা যায়, যা জিডিপির যথাক্রমে প্রায় ১ ও ২ শতাংশ। কিন্তু শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ইউনেস্কো এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে সরকারি ব্যয় যথাক্রমে ৬ ও ৫ শতাংশ হওয়া উচিত। আমাদের দেশে কৃষিতে অনেক উন্নয়ন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কৃষকের জীবনমানের কি কোনো পরিবর্তন ঘটেছে? ডিজেল, বিদ্যুৎ, কেরোসিন, বীজসহ কৃষি উপকরণের ঊর্ধ্বমুখী দরের কারণে ফসল উৎপাদনে কৃষক যখন খাবি খাচ্ছে, তখন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সারের দর, যা তাদের কৃষিকাজে নিরুত্সাহিত করবে, আর ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে। ফলে খাদ্যপণ্যের মূল্য আরো স্ফীতি হবে। আগামী বাজেটে কৃষিতে বরাদ্দ টাকার অঙ্কে কিছুটা বাড়লেও মোট বাজেটের হিস্যায় কমেছে। বলা হয়ে থাকে, আন্তর্জাতিক বাজারে মাত্রাতিরিক্ত সারের দরবৃদ্ধির কারণে সরকারের পক্ষে এত বেশি পরিমাণ ভর্তুকি বহন করা সম্ভব নয়। কারণ, ঐ যে রাজস্ব আয় কম! ঋণ করে আর কত দূর? অথচ অনেক সরকারি দপ্তরের আয় ও তহবিলের টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে (টিএসএস) জমা হচ্ছে না। আইএমএফের এক হিসাবমতে, ২০২১ সালের শেষে টিএসএসের বাইরে দপ্তরগুলোর বিভিন্ন ব্যাংকে জমা রয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। দপ্তরগুলো এই টাকা নিজেরা ধরে রেখে—ব্যাংকের সঙ্গে আঁতাঁত করে আমানত রাখার মাধ্যমে লাভবান হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারকে অনেক খরচই মেটাতে হচ্ছে উচ্চ সুদে নেওয়া ঋণের টাকায়। আর এই সুদের টাকাই জোগাড় করতে জনগণকে বাধ্য হয়ে চাপে রাখতে হচ্ছে। মূলত এমনটি হচ্ছে অর্থ ব্যবস্থাপনায় পদ্ধতিগত দুর্বলতার কারণে। এটি কাটিয়ে উঠতে পারলে সরকার যে বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নেয়, তা কমে আসবে। এবার আসা যাক সেই বাজেটে জনসম্পৃক্ততার কথায়—আমাদের দেশে বাজেট প্রক্রিয়া জনসম্পৃক্ততার দিক থেকে অনেকটা পিছিয়ে। ওপেন বাজেট ইনডেক্স অনুসারে, জনসম্পৃক্ততার দিক থেকে বাংলাদেশের বাজেট ১০০ নম্বরের মধ্যে পেয়েছে মাত্র ১৩। বাজেটে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয় নির্বাচিত সাংসদদের মাধ্যমে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা বাজেট পর্যবেক্ষণ করেন এবং সংসদে জনগণের পক্ষে বক্তব্য দেন। আমাদের সংসদীয় ব্যবস্থায় বাজেট অধিবেশন ছাড়া সংসদে বাজেট নিয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই। ৫৩ বছর ধরে দেখা গেছে, বাজেট অনুমোদনের সর্বশেষ তারিখের ১৬ দশমিক ২২ দিন আগে বাজেট পেশ করা হয়। এ সময় খুবই সীমিত। মন্ত্রী বা জ্যেষ্ঠ নেতাদের কথা বাদ দিলে সাধারণ সাংসদরা বাজেট সম্পর্কে আলোচনার জন্য ৫ থেকে ৭ মিনিট সময় পান। এর অর্ধেক সময় যায় কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনে। বাদবাকি সময়ে বাজেট সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য কোনো বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ থাকে না। আবার এ কথাও অস্বীকার করা যায় না, অনেক সদস্যই বাজেট পড়ে বক্তৃতা তৈরি করার ঝামেলা নিতে চান না। তাই অনেক ক্ষেত্রে তাদের কোনো বক্তব্যও থাকে না।
তাই বাজেটের আকার, খাতভিত্তিক বরাদ্দ বা বাস্তবায়ন কতটা হলো বা না হলো, শুধু তা-ই বিবেচ্য নয়; যোগ্য করদাতার আওতা বাড়াতে হবে। অপচয় বা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস করে, রাজস্ব আয় বাড়িয়ে, ঘাটতি কমাতে হবে। ঋণ করায় সতর্ক থাকতে হবে। অর্থ ব্যবস্থাপনায় সংস্কার করতে হবে।
লেখক : পুঁজিবাজার বিশ্লেষক
