অনেক কিছুই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে 

আপডেট : ২৭ জুন ২০২৩, ০০:২০

আকাশ মেঘশূন্য, পরিষ্কার। ছাতা না নিয়ে বাসা থেকে বের হওয়ার মতো ভুল সচরাচর ঘটে না। আজ ঘটেছে। আজকাল অনেক কিছুই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এর কারণ কী? ছাতা না থাকলেও সঙ্গে বাজারের ব্যাগ আছে। সূর্যের তাপ থেকে বাঁচার জন্য ব্যাগটা চার ভাঁজ করে মাথার ওপরে রাখলাম। এরপর রাস্তায় পড়ে থাকা একটা ইটের টুকরা কুড়িয়ে ব্যাগটার ওপর রেখে দিলাম, যাতে বাতাসে উড়ে না যায়। ব্যাগ ফর্মুলায় কাজ হচ্ছে না। প্লাস্টিকের ব্যাগ তপ্ত হয়ে মাথার খুলি উত্তপ্ত করে দিচ্ছে। রোদ থেকে সুরক্ষার একটা উপায় হতে পারে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষছায়ায় আশ্রয় নেওয়া; কিন্তু সে উপায় নেই। লাইন থেকে সরলেই জায়গা বেদখল হয়ে যাবে। হঠাৎ সামনে থেকে কলরব ভেসে এলো। এক কান দুই কান করে বিষয়টা আমার কানেও পৌঁছল—এক লোক এক দফা পণ্যসামগ্রী কেনার পর পোশাক পালটে পুনরায় ট্রাকের কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করছিলেন। একজনের চোখে বিষয়টা ধরা পড়ায় তিনি হইচই শুরু করেছেন। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত জাপানিরা যেসব কারণে দ্রুত উন্নতির শিখরে পৌঁছেছিল, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল তাদের সততা। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার চলাকালীন একবার তরল দুধের সংকট দেখা দিলে দেশটির সরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু করল। সে সময় জাপানে অবস্থানকারী এক বাঙালি ভদ্রলোক তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, ‘...একদিন দুধ কেনার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে লক্ষ করলাম, মাথাপিছু দুই লিটার বরাদ্দ থাকার পরও আমার আগের জন এক লিটার দুধ কিনলেন। এ বিষয়ে কৌতূহল প্রকাশ করলে জাপানি ভদ্রলোক লাজুক ভঙ্গিতে জানালেন—আমি দুই লিটার নিয়ে নিলে লাইনে দাঁড়ানো সবাই দুধ না-ও পেতে পারে। এজন্যই এক লিটার নিলাম।’ এর বিপরীতে আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কী? আমরা যত পাই, তত চাই। নিজের ঘর ভরে গেলে শ্বশুরবাড়ি পাঠাই। শ্বশুরবাড়ি উপচে পড়লে ভায়রার বাড়ি পাঠাই। 

পকেটে রাখা স্মার্টফোন থেকে ‘কম্পন’ সংকেত পাচ্ছি। কেবল একজন মানুষ আমার ‘নম্বরে’ ফোন করলে তবেই স্মার্টফোন এমন সংকেত বাজায়। তিনি হচ্ছেন লবণ বেগম। এর বাইরে অন্য সবার জন্য সাধারণ ব্যবস্থা—রিংটোন। লবণ বেগমকে অলওয়েজ ‘ভাইব্রেশন মুডে’ রাখি, কারণ—শব্দ অনেক সময় আমাদের মনোযোগ আকর্ষণে ব্যর্থ হতে পারে। এ সূত্রে রিংটোন আমার কানকে ফাঁকি দিতেই পারে। এমনটি ঘটলে ফোনকল ‘রিসিভ’ না করার অপরাধে অপরাধী হয়ে লবণ বেগমের আদালতে আসামিরূপে ‘কাঠগড়ায়’ দাঁড়াতে হবে, এটা নিশ্চিত। এজন্যই কম্পনব্যবস্থা। অবশ্য আরো একটা যুক্তি থেকে লবণ বেগমকে ‘কম্পন-বলয়ে’ রেখেছি। আমরা গৃহীমাত্রই জানি, সংসারে স্ত্রীজাতি হচ্ছেন ভূমিকম্পস্বরূপ। সময়বিশেষে আমরা সমুদ্রের গর্জন উপেক্ষা করতে পারি; কিন্তু ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিকে কোনোমতেই অবহেলা করতে পারি না। 

ফোনকল রিসিভ করে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে লবণ বেগমের জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—

: এই মুহূর্ত তুমি কোথায়?

এই মুহূর্তে আমি অবস্থান করছি রামকিশোর রায় সড়কে। তবে এ তথ্য লবণ বেগমের কাছে সরবরাহ করা যাবে না। কী বলা যায়, কী বলব— ভাবছি, লবণ বেগম অসহিষ্ণু গলায় জানতে চাইল—

: কী হইল, কথা বলতেছ না কেন? 

: কথা কওয়ার কী আছে? বাজারের ব্যাগ লইয়া বাসা থেইকা বাইর হইছি। বাজারের ব্যাগ লইয়া মানুষ কোথায় যায়?

: বাজারে যায়; কিন্তু তুমি তো বাজারে যাও নাই। 

: মানে? 

: আমার কাছে মানে-মানে করবা না। তোমার পাল্লায় পইড়া জীবনের শখ-আহ্লাদ সব গেছে। এখন মানসম্মান লইয়া বাঁইচা থাকাটাও দায় হইয়া উঠছে। 

ফোনের ওপাশে জোরে শ্বাস টানার শব্দ পাচ্ছি। যে কোনো প্রকারেই হোক, খবরটা ‘লিক’ হয়েছে। এখন করণীয় একটাই—পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। লবণ বেগমকে ভুলিয়েভালিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হবে। কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লবণ বেগমের উদ্দেশে বললাম—

: কেন তুমি আমার ওপর এতটা রুষ্ট হইতেছ, বুঝতেছি না! আমি তো কেনাকাটার প্রক্রিয়ার মধ্যেই আছি। 

: তুমি থাকো তোমার প্রক্রিয়া লইয়া। আজ বাসায় কোনো রান্না হবে না; বাজারও আনতে হবে না। 

: চুলা-বন্ধ কর্মসূচি? ঠিক আছে, কোনো সমস্যা নাই। আজ তাইলে চুলা-বন্ধ কর্মসূচি বহাল থাকুক; আমরা বরং মিছিল সহকারে হোটেল-ভোজনে যাব। ছেলেদের স্নেহময়ী জননী আর তাদের আব্বার প্রিয়তমা স্ত্রী হিসেবে তুমি সেই মিছিলের অগ্রভাগে থাকবা। কথা পাক্কা। এই যে আমি এই মুহূর্তে বর্তমান ঠিকানা ত্যাগ কইরা আগামীকালের জন্য বাজার যা করার, দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে স্বদেশি বাজারে রওনা হইয়া গেলাম। ঠিক আছে? 

: হু।

: এইবার বলো তো, আমার কোন মহাশত্রু তোমার কাছে তথ্যটা পৌঁছাইছে?

: সে তোমার শত্রু নয়, মিত্র। 

: কও কী! মিত্র হইয়া বুকে শেল মারল! নাম কী তার?

: চিনি বেগম। 
চিনি বেগমের ‘নম্বর’ ফোনবুকে সংরক্ষিত ছিল। তাকে ফোন করলাম। মোলায়েম গলায় জানতে চাইলাম—

: কেমন আছেন?

: ভালো আছি ভাইজান। 

চিনি বেগমের সম্বোধন শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেলাম। ভদ্রমহিলা এর আগে কখনো আমাকে ভাইজান বলে সম্বোধন করেছেন কি না, মনে পড়ছে না। আজ হঠাত্ ভাইজান-ভাইজান করছেন কেন? জানতে চাইলাম—

: আপনে কি বাসায়?

: হু।

: আপনের সামনে কে? স্বামী, না শ্বশুরপক্ষের কেউ?

: শ্বশুরপক্ষ। 

: কে?

: শাশুড়ি।

: ফোনটা তারে দেন তো।

: কেন!

: পরিচিত হই। 

: দুঃখিত। এখন ফোন দেওয়া যাবে না।

: সমস্যা কী?

: ওনার মুখভর্তি পান-সুপারি। মুখে যতক্ষণ পান-সুপারি থাকে, ততক্ষণ দুনিয়া উইল্টা গেলেও তিনি কোনো কথা বলেন না। 

: আপনে কি কোনোদিনও ভালো হবেন না?

: অবশ্যই হব। 

: কবে?

: মরহুমাকালে আজাবের ফেরেশতারা ছেঁচা পর্ব শেষ করার পর। 

: আপনেরে একটা কথা বলার জন্য ফোন করছি। 

: বলেন। 

: আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নাই। ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ কিছুই নাই। যদি থাকত এবং আমি যদি দাঁত-কেলানো একটা ‘সেলফি’ তুলে এইসব মাধ্যমে সেই ছবি আপলোড করার পর নিচে লিখতাম—...খাঁড়াইয়া রইছি, তাইলে একটা কথা ছিল। কিন্তু আমি তো এইসবের ধারেকাছেও নাই। এ অবস্থায় মমিসিং শহরে আমি ঘোড়ার লেদা পরিষ্কার করতেছি, না রাস্তা ঝাড়ু দিতেছি—ঢাকায় বইসা থাইকা তা কি আপনের পক্ষে জানা সম্ভব?

: আমি তো ভাইজান বর্তমানে মমিসিং আছি।

: মানে!

: গত মাসে আমার সাহেব মমিসিং বদলি হইয়া আসছেন। 

: তাইলে আর কী! কিন্তু আমারে আবিষ্কার করলেন কেমন কইরা?

: এই কথা? নতুন বাজারে গেছিলাম আম কিনতে। ফেরার পথে দেখি—খরখইরা রোদের মধ্যে আপনে ‘মাথলা’ মাথায় দিয়া টিসিবির ট্রাকের পেছনে দাঁড়াইয়া রইছেন। 

: ট্রাকসেলের লাইনে দাঁড়াইছি কি শখ কইরা? বাজারে জিনিসপত্রের দাম সম্পর্কে আপনের কোনো ধারণা আছে?

: থাকবে না কেন? অবশ্যই আছে। 

: শুইনা খুশি হইলাম। কিন্তু এই কাজটা করতে গেছেন কীজন্য?

: কোন কাজ? 

: আপনে সরাসরি আমারে ফোন করতে পারতেন। তা না কইরা হেডকোয়ার্টারে গুঁতাগুঁতি করতে গেছেন কোন কামে? 

: আপারে ফোন দিছি বিশেষ একটা কারণে। 

: বুঝলাম না। 

চিনি বেগম কিছুক্ষণের জন্য নীরব হলেন। তারপর জোরে একটা দম ছেড়ে বললেন— 

: আপনেরে যদি বলতাম—রোগা হইয়া গেছেন, ঠিকমতন খাওয়াদাওয়া করেন, শরীরের যত্ন নেন; তাইলে কি আপনে আমার কথায় গুরুত্ব দিতেন? দিতেন না। সেই জন্য যার কাছে বললে বিষয়টা গুরুত্ব পাবে, তারে ফোন দিয়া জানাইয়া দিছি। 
লেখক : সাংবাদিক

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন