স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের পদক্ষেপসমূহ

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৩, ০৫:৪২

ডিজিটালাইজেশনের জন্য প্রযুক্তিতে বড় আকারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। এতে করে একদিকে যেমন উত্পাদন বাড়ানো সম্ভব হবে, একই সঙ্গে তা অবারিত করবে দক্ষ শ্রমিকশ্রেণি গড়ে তোলার পথকে। ডিজিটাল ডিভাইস ও রোবট পরিচালনার জন্য আরো দক্ষ শ্রমিক তৈরি করতে পারব আমরা। এতে করে আয়ের বণ্টন সুষম হবে। বাড়বে আয় ও সম্পদ। শ্রমনিবিড় উত্পাদন ও বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই। আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫৯-৬৩ সাল পর্যন্ত লেখাপড়া করেছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্মার্ট বাংলাদেশ ভিশনের ব্যাপারে ভালো বোঝেন এমন অনেকে রয়েছেন, যাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রয়েছে গভীর সম্পর্ক। আমি তাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।

এ কথা সর্বজনবিদিত, জন্মলগ্ন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ দেশে চিন্তার স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহিষ্ণুতার আঁতুরঘর হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। এই বিদ্যাপীঠ দেশে একটি আলোকিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশে অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক মনন ও জাতীয় পরিচিতি বিনির্মাণে সহায়তা করেছে। জনগণকে সাম্য ও ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করেছে, যা পশ্চিম পাকিস্তানিরা অস্বীকার করে চলেছিল। শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনের ফসল হিসেবে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় থেকেই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।

বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার সুনিপুণ-সফল নেতৃতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশব্যাপী অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, বিশেষ করে বিগত এক যুগে বাংলাদেশের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। এই ধারাবাহিকতায় একবিংশ শতাব্দীর আলোর যুগে প্রবেশ করেছে বাংলা জনপদ। বিশ্বব্যাপী বর্তমানে যে ‘স্মার্ট রেভল্যুশন’ চলছে, তার বড় অংশীদার শেখ হাসিনার বাংলাদেশ। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় কাউন্সিলের উদ্বোধনী ভাষণে (২৪ ডিসেম্বর, ২০২২) ‘স্মার্ট বাংলাদেশ-২০৪১ রূপকল্প’ ঘোষণা করেন ‘এক অনন্য বাংলাদেশের জনক’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কণ্ঠে আমরা পুনর্ব্যক্ত হতে দেখেছি তার চলতি মেয়াদের চার বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে (৬ জানুয়ারি, ২০২৩) জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে। অর্থাত্, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্মার্ট বিশ্বের সঙ্গে পা মিলিয়ে চলেছি আমরা। বলা বাহুল্য, শেখ হাসিনার প্রশাসনের চোখ দিয়ে আমরা এমন এক স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, যাতে করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাবে বর্তমান ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’। ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো হাতিয়ার ব্যবহার করে দেশের কর্মক্ষেত্রও প্রসারিত হবে বেশ খানিকটা। এসব করতে, তথা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে যথেষ্ট প্রস্তুতি থাকা চাই—এ কথা মাথায় রেখেই নীতি ও কর্মপন্থা সাজাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বলে রাখা দরকার, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার সেই স্মার্ট বাংলাদেশ ভিশনের কথা বলছেন, যার অভীষ্ট লক্ষ্যই হলো ‘স্মার্ট’! জ্ঞানভিত্তিক সমাজের ওপর ভর করে স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট সোসাইটি, স্মার্ট ইকোনমি ও স্মার্ট সরকার প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে ‘বিস্তৃত ডিজিটাল রূপান্তরের’ দিকেই প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি নিক্ষেপিত।

স্মরণে থাকার কথা, ’২২ সালের ২১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স গঠিত হয়, যেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব, সরকারি সংস্থার প্রধান, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের অধ্যাপক, প্রযুক্তি ও ব্যাবসায়িক সমিতির নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নের জন্য স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নে জোর দেওয়া হয় গঠিত টাস্কফোর্সে। কথা হয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও বিনিয়োগের মতো খাতগুলোতে স্মার্ট প্রযুক্তির অপারেশনাল প্রোগ্রাম প্রবর্তনের ক্ষেত্রে সময়-সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও। ডিজিটাল প্রযুক্তি কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ-নির্দেশিকার মতো বিষয়গুলো নিয়েও বিস্তর আলোচনা চলে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে টাস্কফোর্সের গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার চিন্তা থেকে একই বছরের ১৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের একটি নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা মোতাবেক এই টাস্কফোর্স ও নির্বাহী কমিটি আগামী দিনে বড় সুফল বয়ে আনবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

আজকের বিশ্ব চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের দাভোস সম্মেলনে ক্লাউস শোয়াবের বক্তৃতা এবং ২০১৬ সালে তার ‘দ্য ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন’ শিরোনামের বইয়ে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ধারণা পাওয়া যায়। মূলত এই শতাব্দীর প্রথম দিক থেকেই নতুন আন্তর্জাতিক মুদ্রানীতি তথা অর্থনীতি ও শিল্পায়ন একধরনের বৈপ্লবিক যুগে প্রবেশ করবে বলে শুনে আসছি আমরা। উদাহরণস্বরূপ, শিল্প পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জার্মানির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা ইনস্টিটিউট ‘দ্য ইন্ডাস্ট্রি ৪.০’ প্রকাশ করে ২০০৬ সালে। ২০১০ সালে ‘হাইটেক স্ট্র্যাটেজি অ্যাকশন প্ল্যান ২০২০’ প্রণয়ন করে দেশটি, যেখানে ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের জন্য বিশদ বিনিয়োগনীতির সন্নিবেশ ঘটানো হয়। কোরিয়ার বিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদেরাও বসে থাকেননি। ২০১৫ সাল থেকে ৪ আইআর নিয়ে জোর কাজ চলছে দেশটিতে। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, পূর্ববর্তী শিল্পবিপ্লবগুলোর চেয়ে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের। এটা বিস্তর আলাদা এ কারণে যে, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে উত্পাদনসহ প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কার্যপদ্ধত্বিকে এমনভাবে রূপান্তর করা হবে, যার ফলে মনুষ্য শ্রমিকের পরিবর্তে ব্যবহূত হবে রোবট। অর্থাত্, মানুষকে স্থানচ্যুত করবে যন্ত্র! অনেকেই মনে করতে পারেন, ‘এর ফলে তো বেকারত্ব বেড়ে যাবে ব্যাপকভাবে। এমনকি উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর অভাবে কাজের ব্যাঘাত ঘটবে।’ এসব লোকের উদ্দেশ্যে একটা কথাই বলা যায় আপাতত—যেহেতু ‘স্মার্ট রেভল্যুশন’ ঘটছে বা ঘটতে চলেছে, সুতরাং, সবকিছুতে স্মার্ট ছাপ থাকবে বলেই নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া যায়। অর্থাত্, শ্রমিকের কাজ হারানো কিংবা কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকির মতো বিষয়গুলো কীভাবে এড়ানো যায়, তার জুতসই ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে স্মার্ট প্ল্যানে। এই অর্থে বলা যায়, মানবসভ্যতার জন্য আশু রূপান্তরটি হতে চলেছে অত্যন্ত দ্রুতগতির ও ব্যাপক তাত্পর্যপূর্ণ।

মনে রাখতে হবে, এই শতাব্দীর একেবারে গোড়ার দিক থেকেই ‘স্মার্ট’ শব্দটি ‘কেতাদুরস্ত’ শব্দে পরিণত হয়। বিশেষ করে পেশাগত ক্ষেত্রে স্মার্ট শব্দটি যেন সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে। ২০০০ সাল থেকে ‘স্মার্ট সিটি’ শব্দটি ব্যবহার করে আসছেন নগর পরিকল্পনাবিদেরা, যার অর্থ এমন এক ‘পরিকল্পিত শহর’, যেখানে পরিষেবার বিতরণ, নিয়ন্ত্রিত ও নিরীক্ষণ—প্রতিটি ক্ষেত্রে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের দরকার পড়ে। এদিক থেকে বিচার করলে স্মার্ট বলতে উন্নত প্রযুক্তি, নির্ভুল তাত্ত্বিক নীতি ও কৌশল, নির্ভরযোগ্য অনুমান ও দক্ষতার সঙ্গে পরিকল্পনা ও কর্মসম্পাদনকে বোঝায়। স্মার্ট যুগে প্রবেশে স্মার্ট প্রযুক্তি ও স্মার্ট জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই—ভালোভাবে মাথায় রাখতে হবে এ কথা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্মার্ট বাংলাদেশ রূপকল্পের লক্ষ্য ধরে এগিয়ে যেতে তথা ডিজিটাল রূপান্তরের প্রশ্নে এটি অনেক বেশি জরুরি।

উল্লেখ করা জরুরি, ডিজিটালাইজেশনের জন্য প্রযুক্তিতে বড় আকারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। এতে করে একদিকে যেমন উত্পাদন বাড়ানো সম্ভব হবে, একই সঙ্গে তা অবারিত করবে দক্ষ শ্রমিকশ্রেণি গড়ে তোলার পথকে। ডিজিটাল ডিভাইস ও রোবট পরিচালনার জন্য আরো দক্ষ শ্রমিক তৈরি করতে পারব আমরা। এতে করে আয়ের বণ্টন সুষম হবে। ঘনত্ব বাড়বে আয় ও সম্পদের। শ্রমনিবিড় উত্পাদন ও বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত হবে।

এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কম্পিউটার ও আইসিটি সুবিধার আওতায় এসেছে। ৮৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। ৮৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেট সংযোগের সুবিধা পাচ্ছে এবং ৮০ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার শিক্ষক রয়েছেন, যারা শিক্ষার্থীদের আইসিটি শেখান। কলেজ তথা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে অবস্থা আরো ভালো—৯৮ শতাংশ কম্পিউটার বা আইসিটি সুবিধার আওতায় রয়েছে। উচ্চতর শিক্ষায়ও আমরা বেশ খানিকটা এগিয়ে রয়েছি। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আরো বিস্তৃত পরিসরে কাজ করা দরকার। গ্রামীণ শিক্ষাক্ষেত্রেও আইসিটির চিত্র বেশ সন্তোষজনক। যা হোক, আইসিটি সক্ষমতা আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। এতে করে একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে, একই সঙ্গে বাড়বে নারীর ক্ষমতায়ন।

ভুলে গেলে চলবে না, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের সহযোগিতায় এবং স্থানীয় ফার্মের সঙ্গে একত্রে করোনার ভ্যাকসিন উত্পাদনের জন্য গবেষণা করে প্রশংসা কুড়িয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই উদ্যোগের কথা জেনে খুবই খুশি ও আপ্লুত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তীকালে তিনি বিচক্ষণতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেন, ওষুধ নিয়ন্ত্রণ প্রশাসনের অনুমোদন সাপেক্ষেই কেবল ভ্যাকসিন কিনবে সরকার। যা হোক, আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, আরো বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বা প্রকৌশল বিষয়ে পড়ার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করতে হবে। এতে করে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথ সুগম হবে, উত্পাদনশীলতা ও উন্নতির পথ ত্বরান্বিত হবে। স্মার্ট রেভল্যুশনের হাত ধরে দেশের উন্নয়ন স্পর্শ করবে নবতর মাইলফলক।

লেখক : প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা (গত ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে লেখকের বক্তৃতার চুম্বক অংশ)

ইংরেজি থেকে অনুবাদ : সুমৃৎ খান সুজন

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন