সম্প্রতি পালিত হয়েছে বিশ্ব সমুদ্র দিবস। এর উদ্দেশ্য ছিল টেকসই সমুদ্রের জন্য উদ্ভাবন। অর্থাত্ উদ্ভাবনী কর্ম উদ্যোগের মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদে সমুদ্র সম্পদ সংরক্ষণ। এজন্য সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য রক্ষার দিকে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে।
২০১৪ সালের ৮ জুলাই এক রায়ে বাংলাদেশ নতুন প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা পেয়েছে, যা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ সরকারের এক অভাবনীয় কূটনৈতিক অর্জন। এর ফলে নিজস্ব সমুদ্রসীমার বাইরে মহিসোপানে এক বিরাট এলাকার ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই এলাকায় মৎস্য আহরণ ও সমুদ্রের তলদেশে প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাংলাদেশের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। এ রায়ের ফলে বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি টেরিটোরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহিসোপানের তলদেশে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।
সমুদ্রসীমা অর্জনের পরের বছরই ২০১৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। সমুদ্র সম্পদ আহরণ এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনায় ২০১৪ সালে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিচার্স ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১৭ সালে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘ব্লু ইকোনমি সেল’ গঠন করা হয়। ২০১৮ সালে নৌবাহিনী সদর দপ্তরের সহায়তায় গবেষণা-প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বদ্বীপ পরিকল্পনা বা ডেলটা প্ল্যানে সমুদ্র অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনার আওতায় ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পাঁচ ধরনের কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল ও গ্যাস রয়েছে। এখানে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে তা দেশের ব্লু ইকোনমির একটি বড় শক্তি হয়ে উঠবে। তেল-গ্যাস ছাড়াও বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশে সালফার, মেটালিক মডিউল, কোবাল্ট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ গ্যাস হাইড্রেট বা মিথেন গ্যাসের জমাট স্তরের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার একান্ত অর্থনৈতিক এলাকায় শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৬৩ শতাংশ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট সম্ভাব্য প্রাকৃতিক গ্যাস হাইড্রেট থাকার বিষয়টি অনুমিত হয়েছে, যা ১৭ থেকে ১০৪ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট প্রাকৃতিক গ্যাসের সমান।
বৈশ্বিক দিক থেকে আটটি দেশ মিলে ‘বে অব বেঙ্গল লার্জ মেরিন ইকো সিস্টেম প্রোজেক্ট’টি খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশও এর সঙ্গে যুক্ত আছে। ইতিমধ্যে একটি কৌশলগত কর্ম-পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে মৎস্য আহরণের সক্ষমতা নিরূপণ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে। উপকূলীয় এলাকায় ভারী বস্তু দূষণ দূর করার প্রযুক্তি আছে। এখন মেরিন রিসোর্চ সার্ভে, সি-ফিশিং ও ইকোট্যুরিজমের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। ওপেন ওয়াটার ম্যানেজমেন্টের ওপর জোর দিতে হবে। অভ্যন্তরীণ স্বাদু পানিতে মাছ চাষ ও উপকূলীয় এলাকায় চিংড়ি ও অ্যাকুয়াকালচারের ওপর নজর দিতে হবে।
বঙ্গোপসাগর বিশাল এক ইকোসিস্টেম। এই সাগরের ওপর অধিকার রাখে এমন আটটি দেশ যত রকমের প্রযুক্তি আছে, সেটি ব্যবহার করে মাছ ধরছে প্রতিনিয়তই। অন্যান্য জলজ প্রাণীও ধরছে তারা। সব কটি দেশই তাদের শিল্প বর্জ্যের মাধ্যমে সাগরকে দূষণ করছে। বিভিন্নভাবে ছোট মাছগুলোকে ধ্বংস করা হচ্ছে। অসংখ্য ট্যাংকার এই সাগরের ওপর দিয়ে চলাচল করছে। এগুলোর বর্জ্য সাগরকে দূষিত করছে। জলবায়ু পরিবর্তন জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলের সমুদ্রের পানির স্তর বাড়ছে। জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা করা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ অন্যত্র স্থানান্তরিত হচ্ছে। ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের মতো যেসব দেশ সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত, সেসব দেশ মৎস্য ও অন্যান্য প্রাণীর ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। এই অঞ্চলের মৎস্য ও প্রাণীর মাইগ্রেশন বেশি হবে। কারণ, এসব দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অন্যান্য দেশ থেকে বেশি। বিশেষ করে সমুদ্রে যে জীববৈচিত্র্য রয়েছে, তার পরিবর্তন হবে। বাংলাদেশও এ ঝুঁকিতে আছে।
মৃত জেলিফিশ, ডলফিন ও কাছিমের পাশাপাশি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রী, কাচের বোতল, ছেঁড়া জাল, স্যান্ডেল, রশি, গাছের গুঁড়ি, প্লাস্টিকের বোতলসহ মানুষের ব্যবহার্য বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী ভেসে এসেছে। সমুদ্রে নিম্নচাপ, বায়ুপ্রবাহ, পানির ঘূর্ণন, সমুদ্রের পানির গতিপ্রবাহসহ সমুদ্র পৃষ্ঠের ধরনের ওপর ভিত্তি করে সমুদ্র উপকূলের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় ভাসমান প্লাস্টিকসহ অন্যান্য বর্জ্য জমা হয়। এসব বর্জ্য কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত বিভিন্ন গুল্ম, লতা ও গাছের সঙ্গে আটকা পড়ে। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি এসব প্লাস্টিককে ভেঙে টেরেসস্ট্রিয়াল মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত করে। অনতিবিলম্বে এসব বর্জ্য অপসারণ করা না হলে সৃষ্ট মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে সমুদ্রের যে জীববৈচিত্র্য তা হুমকির সম্মুখীন হবে। সেই সঙ্গে এটি অদূর ভবিষ্যতে জনমানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বর্জ্য ভেসে আসার কারণ বিশদভাবে জানার জন্য বঙ্গোপসাগরের সিজনাল এডি ফরমেশন বা পানির ঘূর্ণন, বায়ুপ্রবাহের গতি ও দিক এবং কোস্টাল এরিয়ার বটম ট্রপগ্রাফির ওপর ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য কার্যকর ও যুগোপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।
সামুদ্রিক প্রাণী এবং সমুদ্রকে দূষণ থেকে রক্ষায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ আরো বাড়াতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আইন, সামুদ্রিক পরিবহন ও পর্যটন এবং সমুদ্রসম্পদ আইনের কঠোর বাস্তবায়ন করা জরুরি। সামুদ্রিক সম্পদকে রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রও সরকারের পাশাপাশি জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক : শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

