২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ছিল আওয়ামী লীগের সভাপতি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য ভয়ংকর একটি চ্যালেঞ্জের দিন। সেদিন সকাল সোয়া ৭টার দিকে নেত্রীকে তার সুধাসদনের বাসা থেকে গ্রেফতার করে নিচে নামানো হয়েছে। নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জজকোর্টের উদ্দেশে। ৭টা ৩৫ মিনিটে কালো নিশান গাড়িতে (ঢাকা মেট্রো-গ ১৪-৭৬৮) করে ৩ নম্বর সড়ক দিয়ে এলিফ্যান্ট রোড, মত্স্য ভবন হয়ে নেত্রীকে আদালত প্রাঙ্গণে নিয়ে যাওয়া হয়। ব্যাপক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে নেত্রীকে আদালতে ওঠানো হবে। এমন সময় আমরা কজন পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে ঢুকে পড়ি। পুলিশ ক্ষুব্ধ হয়ে লাঠিচার্জ করে। আমরা তখন আদালতের ভেতরে। নেত্রীকে সিএমএম কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট কামরুন্নাহারের আদালতে তোলা হয়েছে। ৮টা ৩৫ মিনিটে শুনানি শুরু হয়। শুনানিতে নেত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখেছি এবং শুনেছি। আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা সে সময় আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের উদ্দেশে বলেন, ‘আমার আরগুমেন্ট এবং আমার আইনজীবীদের আবেদনের ভিত্তিতে আপনি কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন না। আপনার ইচ্ছা থাকলেও বিচারিক মাইন্ড অ্যাপ্লাই করে ন্যায়বিচারের স্বার্থে স্বাধীনভাবে আদেশ দিতে পারবেন না। আপনাকে সরকার যেভাবে আদেশ লিখে দিয়েছে, আপনি সেভাবেই করবেন। আপনার হাত-পা বাঁধা। তার পরও আমার এই আবেদন মামলার মূল নথিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া দরকার। দয়া করে আমার এই কথাগুলো মামলার মূল নথিতে লিখে দেবেন। আমার যতটুকু মনে হচ্ছে, সরকার আমার বিরুদ্ধে এই মামলার রায়ও লিখে রেখেছে। আমার বিরুদ্ধে করা এই মামলার বাদীকে আমি জীবনেও দেখিনি। তার নামও শুনিনি। আমাকে হয়রানির উদ্দেশ্যে দেশের বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্তের অংশ হিসেবে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। আগামী নির্বাচনে আমাকে বাদ দিয়ে যেনতেন নীলনকশার নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্য এটা করা হয়েছে। যৌথ বাহিনীর সদস্যরা আমাকে গ্রেফতার করতে গেলে ওয়ারেন্ট আছে কি না জানতে চাইলে তারা ওয়ারেন্ট দেখাতে পারেনি। আমি বিচারের মুখোমুখি হতে ভয় পাই না। জেল-জুলুম, নির্যাতন এমনকি মৃত্যুকেও ভয় পাই না। এ কারণেই আমি বিচারের মুখোমুখি হয়েছি। আমি মহান আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাই না। জনগণ আমার সঙ্গে আছে। আল্লাহ তাআলা সহায় হলে কোনো চক্রান্ত সফল হবে না। আগেও আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর আমি রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলাম। এটাই ছিল দেশের স্বর্ণযুগ। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছি। জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দিয়েছি। বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে কখনো নিজে নীতি ও আদর্শচ্যুত হওয়ার ব্যাপারে কল্পনাও করতে পারিনি। চাঁদাবাজি তো দূরের কথা, আমার শাসনামলে ১ শতাংশ দুর্নীতিও হয়নি। বিদেশের মাটিতে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছি। যদি চাঁদাবাজ বা অর্থলোভী হতাম, তাহলে বিশ্বের সেরা ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করত না। এই ডক্টরেট ডিগ্রি ছাড়াও বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি, যা দেশের মর্যাদাকে অনেক উঁচুতে উঠিয়েছে। বঙ্গবন্ধু পরিবারের দুই মেয়ে আমরা, রাষ্ট্র থেকে কিছুই নিইনি। বরং ত্যাগের ব্যাপারে উদাহরণ সৃষ্টি করেছি। ফারাক্কা চুক্তি ও শান্তিচুক্তির মাধ্যমে দেশের অনেক দিনের সমস্যা আমিই সমাধান করেছি। অন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার ভিন্ন ধরনের ইমেজ রয়েছে। চাঁদাবাজি করলে এগুলো অর্জন করতে পারতাম না। ১৯৬২ সাল থেকে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করে অভ্যস্ত। মৃত্যুভয়ও আমাকে সংগ্রাম থেকে পিছু হটাতে পারবে না।
এই সরকার দেশটাকে ধ্বংসের কাছে নিয়ে এসেছে। দেশ ও জনগণের প্রতি দরদ ও দায়বোধ নেই। বিদ্যুতের সমস্যা ও দ্রব্যমূল্য নিয়ে মানুষ আজ দিশেহারা। আমি এ ব্যাপারে কথা বলি বলে আমাকে হেনস্তা করতে এই মামলা দেওয়া হয়েছে। আমি দুর্নীতি বা চাঁদাবাজি করেছি—এ কথা দেশের একজন অন্ধ মানুষও বিশ্বাস করবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপ নিয়ে এরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে। ছয় মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত ভোটার তালিকা তৈরির ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। নির্বাচনের জন্য ৮৭ শতাংশ একটি তামাশার রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। সরকার এখন মানুষের ভোটাধিকার লঙ্ঘন করে বন্দুকের নল দিয়ে মানুষের অধিকার হরণ করতে চায়।’
আদালত সেদিন নেত্রীর জামিন নামঞ্জুর করে। আমরা কর্মীরা আবেগে কেঁদে ফেলি। আবেগাপ্লুত নেতাকর্মীরা পুলিশ-র্যাবের ব্যাপক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেও স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করেন। শেখ হাসিনার কিছু হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে; নেত্রীবিহীন নির্বাচন, মানি না মানব না; জেল-জুলুম-হুলিয়া, নিতে হবে তুলিয়া; অবৈধ সরকার মানি না মানব না; ক্ষমতা না জনতা, জনতা জনতা—এসব স্লোগানে প্রকম্পিত হয় আদালত প্রাঙ্গণ। আমরা সেদিন হাসপাতালের বেড ছেড়ে ঢাকা শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানববন্ধন, মিছিল করেছি, করিয়েছি। সেদিন সাবজেলের সামনে ক্ষমতাসীনদের রক্তচক্ষুর ভয় উপেক্ষা করে সাহসী ও ত্যাগী নেতাকর্মীরা অবিরাম অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছি। আন্দোলনের মাধ্যমে নেত্রীকে মুক্ত করে এনেছি আমরা। অবরুদ্ধ গণতন্ত্র মুক্ত হয়েছে।
লেখক: দপ্তর সম্পাদক, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ ও সাবেক সহসভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।
