বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৯ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

বিড়ালপ্রেমী মুক্তা ৮০ ‘বিড়ালের মা’ 

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৩, ১৪:৫৬

নারায়ণগঞ্জ শহরের পশ্চিম মাসদাইর এলাকায় এক দোকানিকে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিলেন বিড়ালপ্রেমী জাহানারা খানম মুক্তার বাড়িটি। স্থানীয়ভাবে তিনি বিড়ালপ্রেমী বা বিড়ালের মা হিসাবে পরিচিত। যদিও অনেকে ‘বিড়ালের মা’ বলে ডাকেন এক সময় শিক্ষকতার পেশায় থাকা মুক্তাকে। নগরীর পশ্চিম মাসদাই এলাকায় বহুতল ভবনের সপ্তম তলায় মুখোমুখি দুটো ফ্ল্যাট। ভাড়ার ফ্ল্যাট দুটোর একটিতে তিনি নিজে থাকেন। তিন কক্ষের অপর ফ্ল্যাটটি রেখেছেন তার ‘সন্তানতুল্য’ বিড়ালদের জন্য। ফ্ল্যাটে প্রবেশ করতেই বিড়ালগুলোকে আপন মনে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। শিশু বয়স থেকেই বিড়ালের প্রতি আলাদা মমত্ববোধ তৈরি হয় বলেন জানান এই নারী। 

পরিবারের লোকজনও বাড়িতে বিড়াল পুষতেন জানিয়ে মুক্তা বলেন, 'তবে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির লোকজন তেমন পছন্দ না করায় এবং নিজেরও পেশাগত ব্যস্ততার কারণে বিড়াল পালন থেকে দীর্ঘ বছর বিরত ছিলাম।' ২০১৬ সালে ছোট মেয়ের আবদার ও স্বামীর সম্মতিতে বিড়াল পালন শুরু করেন। এরপর থেকে পথে-ঘাটে দুর্ঘটনায় আহত বিড়াল দেখলেই বাড়িতে এনে সেবা করে সারিয়ে তুলে নিজের কাছে রেখে দিতেন। এভাবেই একে একে বিড়ালের সংখ্যা ৮০-তে দাঁড়ায়। মুক্তার স্বামী আমজাদ তালুকদার ছিলেন ইতালি প্রবাসী। দুই কন্যাকে নিয়ে বাড়িতে সময় কাঁটতো তার। ছোট মেয়ের বিড়াল পোষার বায়না ধরার পর ঝড়ের কবলে পড়ে রাস্তার পাশে একটি বিড়ালকে অসহায় অবস্থায় দেখতে পান মুক্তা। বিড়ালটিকে তিনি বাড়িতে নিয়ে আসেন। 

৫১ বছর বয়সি এই নারী বলেন, আমাদের পুরো পরিবার ছিল অ্যানিমেল লাভার। তাই ছোটবেলা থেকেই কুকুর-বিড়ালের প্রতি আলাদা টান ছিল। বাড়িতে ৮-১০টা বিড়াল ছিল। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির লোকজন না চাওয়ায় বিড়াল পুষিনি। কিন্তু রাস্তায় বিড়াল দেখলেই টান অনুভব করতাম। চোখের সামনে কোনো অসহায় বিড়াল দেখলেই বাড়িতে নিয়ে আসি।' মুক্তার দুই কন্যা থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। বড় কন্যা জান্নাতুল ফেরদৌস মিফতি মাইক্রোসফট কোম্পানিতে চাকরি করেন আর ছোট কন্যা আফিয়া জাহিন মাহিয়া কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ছেন। গত অগাস্টে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান স্বামী আমজাদ তালুকদার। এখন কন্যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মুক্তা। তবে বিদেশে যাওয়ার আগে ‘সন্তানতুল্য’ বিড়ালগুলোর একটা ব্যবস্থা করে যেতে চান। 

‘কী হবে সেই ব্যবস্থা’ জানতে চাইলে মুক্তা বলেন, প্রকৃত বিড়ালপ্রেমীদের কাছে প্রাণীগুলো দত্তক দিতে চান তিনি। গত ১৭ অক্টোবর ফেসবুকে বিড়ালপ্রেমীদের একটি গ্রুপে ‘বিড়াল দত্তক দেওয়ার বিষয়টি’ উল্লেখ করে পোস্ট দেন মুক্তার পরিচিত নাদিয়া নামে এক নারী। নাদিয়ার এই পোস্ট রীতিমতো ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর থেকেই ফোনের পর ফোন আসতে থাকে জাহানারা খানম মুক্তার কাছে। 

মুক্তা বলেন, আমার পরিচিত একজন ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। ওই পোস্টটি ভাইরাল হলে অনেকে আমাকে ফোন দিয়ে বিড়াল অ্যাডপ্ট করতে চাওয়ার কথা জানান। তবে সবাইকে দিচ্ছি না। বিড়ালগুলো যাতে ভালো থাকে, ওদের যত্ন যারা নেবেন, তাদের বাছাই করে আমি বিড়ালগুলো দিচ্ছি। কেননা, আমার অতীত অভিজ্ঞতা ভালো না। একবার একজনকে পাঁচটা বিড়াল দিয়েছিলাম, কিন্তু কয়েকদিন পরই জানান, বিড়ালগুলো তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। এরপর থেকে আর কাউকে দেইনি। ৮০টির মধ্যে এ পর্যন্ত তার ৪০টি বিড়াল বিভিন্ন জন এসে নিয়ে গেছেন বলে জানান মুক্তা। তবে বিড়ালগুলোর বিষয়ে তিনি নিয়মিত খোঁজ-খবর নেবেন বলে জানান। 

তিনি বলেন, আমি তো আর অভাবে দিচ্ছি না। আমার অবর্তমানে কেয়ারটেকাররা যদি ওদের ঠিকভাবে যত্ন না নেন, সে কারণে যারা আসলেই বিড়ালপ্রেমী এবং নিয়মিত সেবা-যত্ন নেবেন, এমন মানুষকেই দিচ্ছি। কেউ যদি সেভাবে যত্ন না নেন তাহলে আমি পুনরায় ফিরিয়ে আনব।

বিড়াল পোষার কারণে মানুষের প্রশংসা যেমন পেয়েছেন তেমনি অনেকের কটু কথাও শুনতে হয়েছে বলে জানান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করা জাহানারা বেগম মুক্তা। এক সময় শিক্ষকতা পেশায় ছিলেন তিনি। স্বামী প্রবাসে থাকায় একা হাতে সংসার সামলাতে গিয়ে পেশা ছাড়েন। বিড়ালপ্রেমী এই নারী বলেন, বিড়াল পালন নিয়ে অনেকের কটু কথাও শুনতে হয়েছে। তবুও দমে যাইনি। বাড়িওয়ালার কাছেও অনেকে অনেক কথা বলেছেন, কিন্তু বাড়িওয়ালাও সেদিকে কান না দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করেছেন। কারণ, আমি ঘরে ওদের জন্য চারিদিকে প্রটেকশনের ব্যবস্থা রেখেছি। ওরা বাইরে গিয়ে কারও কোনো ক্ষতি করবে, সে সুযোগ নেই। বিড়ালের বাচ্চার মিউ মিউ শব্দ আমার কাছে শ্রেষ্ঠ মিউজিক। আমি কখনই ওদের খাবার না দিয়ে নিজে খাই না। ওদের স্বাস্থ্যগত দিকে খেয়াল রাখার জন্য চিকিৎসকেরও নিয়মিত পরামর্শ নেই। 

তিনি যে এলাকায় থাকেন ওই এলাকার অন্তত পাঁচটি স্থানে ভবঘুরে বিড়ালদের জন্য খাবার দিয়ে থাকেন। আশেপাশের অন্তত ৩৫টি বিড়াল নিয়মিত তার হাতের খাবার খেয়ে যায়। 

ফেইসবুকে পোস্ট দেখতে পেয়ে মুক্তার কাছ থেকে দুটো বিড়াল দত্তক নিয়েছেন ঢাকার মাতুয়াইলের গৃহিণী নাজমা বেগম। বিড়াল নিতে আসেন নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মদনপুরের দ্বাদশ শিক্ষার্থী মুশফিকুর রহমান সোয়াদও। এই শিক্ষার্থী বলেন, আমার বাসায় বিড়াল পুষি। ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেখে আমি আন্টির (মুক্তা) কাছ থেকে একটি বিড়াল নেওয়ার জন্য এসেছি। সঙ্গে আমার বন্ধুরাও এসেছে।

ইত্তেফাক/এআই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন