বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

‘৭৫-এর রাজনীতি

রক্তস্রোতে ভেসে থাকা নভেম্বর

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৩, ০৬:৫৬

যুদ্ধোত্তীর্ণ দেশ পুনর্গঠনে সবে মনোযোগ দিয়েছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভারতীয় মিত্রবাহিনীর শান্তিপূর্ণ বিদায়ের পর মুক্তি বাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র সমর্পণ করেছেন। শুরু হয়েছে অর্থনীতির দ্বিতীয় বিপ্লব।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ বিনির্মাণে যখন একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন জাতির পিতা, ঠিক তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মারণকামড় বসায় ঘাতকের দল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে তাকে সপরিবারে নিঃশেষ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে নামে মোশতাক গং। এরপরের ইতিহাস কলঙ্কের ইতিহাস।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন খন্দকার মোশতাক। তাকে ক্ষমতায় দেখে বঙ্গবন্ধুর খুনিরাও আঁতকে উঠেছিল (নাসির আহমেদ, ৩ নভেম্বর: ইতিহাসের ভয়ংকর বাঁক বদলের দিন)। ৩ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনরায় সমুন্নত রাখার অভিপ্রায়ে খালেদ মোশাররফ সেনা অভ্যুত্থান করেন। তার অভ্যুত্থান এদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক-বাহকদের মনে আশার সিঞ্চন ঘটালেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। প্রকৃতপক্ষে খালেদ মোশাররফের ভাগ্য সহায় ছিল না। একই দিন তার ভাই রাশেদ মোশাররফ বঙ্গবন্ধু হত্যার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। অবশ্য তখন তার জানা ছিল না যে খালেদ মোশাররফ দুঃসাহসিক অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এর ফলে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার কাছে ইমেজ সংকটে পড়ে যান খালেদ মোশাররফ (বিভুরঞ্জন সরকার, বাংলাদেশের রাজনীতির দুই গভীর ক্ষত: অগাস্ট ও নভেম্বর ট্র্যাজেডি)।

তবে প্রকৃত অর্থে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়নি। মূলত তখনকার রাজনৈতিক অস্থির অবস্থায় খালেদ মোশাররফকে অভ্যুত্থান করতেই যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। ৩ নভেম্বর মধ্যরাতে খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে বচসায় লিপ্ত হন এবং তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। মোশতাককে সিঙ্গাপুরে পাঠিয়ে দেন খালেদ মোশাররফ। সেই সঙ্গে তার অনুরোধে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হন। পরে অবশ্য জিয়াউর রহমান সুবিধামতো সময়ে তাকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতি হয়ে বসেন।

ফাইল ছবি

এর আগে ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের প্রাক্কালে জাতীয় জীবনে আরও ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে যায়। জাতীয় চার নেতা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে জেলখানায় হত্যা করা হয়। যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের চরমতম লঙ্ঘন। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই চারজনই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহচর। এই চারজনের নেতৃত্বে স্বাধীন হয়েছে বঙ্গভূমি, স্বকীয়তা পেয়েছে বাঙালি জাতি। জেলখানায় খুনিরা শুধু জাতীয় চার নেতাকেই হত্যা করেনি। হত্যা করেছে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ছিল এদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রাথমিক ধাপ। জাতীয় চার নেতার এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে চূড়ান্তভাবে দেশের রাজনীতি বদলে দেওয়া হয়।

জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এর মধ্যেই বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় ভিন্ন দিকে ঘুরে যায়। খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানকালে উপ-সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে স্ব গৃহে অন্তরীণ রাখা হয়। ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে তিনি কর্নেল আবু তাহেরকে টেলিফোন করে বন্দিদশা থেকে মুক্তির জন্য আকুতি জানান। আবু তাহের ছিলেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনার গোলার আঘাতে তিনি বাম পা হারিয়েছিলেন। সেই আবু তাহের জাসদের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। জনসমর্থন ও সহানুভূতি লাভের আশায় ৭ নভেম্বর জিয়াকে মুক্ত করে আনেন তাহের।

ফাইল ছবি

ভাগ্যের পরিহাস, যে তাহের জিয়াকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে সিপাহি-জনতার বিপ্লবের তথা পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটালেন, কৃতঘ্ন হয়ে সেই তাহেরকে ফাঁসির দড়িতে ঝোলান জিয়াউর রহমান।

১৯৭৫ সালে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা, খালেদা মোশাররফের অভ্যুত্থান, খন্দকার মোশতাকের পদত্যাগ ও বিচারপতি সায়েমের রাষ্ট্রপতিত্ব লাভ, জিয়াউর রহমানের বন্দিত্ব এবং আবু তাহেরের পাল্টা অভ্যুত্থান- এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এসব ঘটনা এ দেশের ইতিহাসের মোড়কে ব্যাপক আকারে প্রভাবিত করে। পাশাপাশি রাজনৈতিক পালাবদলেও সহায়তা করে।

তথ্যসূত্র:
১. মহিউদ্দিন আহমদ, জাসদের উত্থান-পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি;
২. মহিউদ্দিন আহমদ, ইতিহাসের বাঁকবদল: একাত্তর ও পঁচাত্তর;
৩. মহিউদ্দিন আহমদ, আওয়ামী লীগ-বিএনপি কোন পথে;
৪. মহিউদ্দিন আহমদ, লাল সন্ত্রাস;
৫. আলী রীয়াজ, বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যত গতিপ্রকৃতি (সিজিএস আলোচনাপত্র);
৬. মাহজাবীন খালেদ, ৭ নভেম্বর, ১৯৭৫  ও খালেদ মোশাররফের একটি চিঠি (প্রথম আলো);
৭. বিবিসি;
৮. বিভুরঞ্জন সরকার, বাংলাদেশের রাজনীতির দুই গভীর ক্ষত: অগাস্ট ও নভেম্বর ট্র্যাজেডি (বিডিনিউজ২৪);
৯. সিরাজুল আলম খান, প্রতিনায়ক (নিউক্লিয়াস, মুজিব বাহিনী, জাসদ);
১০. মহিউদ্দিন আহমদ, বিএনপি: সময় অসময়;
১১. মহিউদ্দিন আহমদ, আওয়ামী লীগ: উত্থানপর্ব ১৯৪৮-১৯৭০;
১২. মহিউদ্দিন আহমদ, যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১;
১৩. মহিউদ্দিন আহমদ ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম. সাখাওয়াত হোসেন, বাংলাদেশের রাজনীতির উত্তাল তিন অধ্যায়।

ইত্তেফাক/এইচএ