বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

শ্রমিকের হাট: হরতাল-অবরোধ আটকাতে পারেনি হুসেন আলীদের

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৩, ২২:৩০

থেমে থেমে চলছে বিএনপির হরতাল-অবরোধ। এতে বিপাকে পড়েছেন হুসেন আলীদের মতো খেটে খাওয়া মানুষ। হরতাল-অবরোধে সড়কে পরিবহন চলাচল থেমে থাকলেও হুসেন আলীদের পেটের ক্ষুধা থেমে থাকেনা। পেটের টানে সব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে শ্রম বিক্রির জন্য বেরিয়ে পড়েন তারা।

গুরুদাসপুরের নয়াবাজারে প্রতি ভোরে বসছে শ্রমিকের হাট। শ্রম বিক্রির জন্য এই হাটে এসে কৃষকের কাছে নিজেকে বিক্রি করেছেন হুসেন আলী, আফরোজা বেওয়ারা। শরীরটা চাদরে মোড়ানো। হাতে কাস্তে-কোদাল। কাঁদে ধান বাহনের বাক। এসব সরঞ্জামাদি নিয়ে অন্যদের মতো ষাটোর্ধ দিনমজুর মহররম আলীও নিজেকে হাটে তুলেছেন শ্রম বিক্রির জন্য। 

দিনমুজুর হুসেন আলী, মহররম আলী আফরোজা বেওয়াদের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার দবিরগঞ্জ এলাকায়। সময় তখন ভোর পাঁচটা। ঘন কুয়াশা, হিমেল হওয়ার সাথে হরতাল অবরোধের মতো প্রাণঘাতি প্রতিকূলতা ছাপিয়ে ঝুঁকি নিয়ে কীভাবে তারা শ্রমিকের হাটে এসেছেন তা জানালেন।

হুসেন আলীর (৫৫) মতে, আগে ঢাকা থেকে ফেরা পণ্যবাহী ট্রাক, পিকআপে চড়ে সীমিত ভাড়ায় শ্রমিকের হাটে আসতেন তারা। এখনো সেসব পরিবহনেই আসেন। তবে হরতাল-অবরোধের কারণে পরিবহন কম চলাচল করায় পাঁচ টাকার ভাড়া ২০টাকা দিতে হয়। সবচেয়ে বড় সমস্য হলো পেট্রলবোমার ভয়। ভয় ট্রাকে আগুন লাগারও।   

জানাগেছে, গত প্রায় একযুগ ধরে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবারিষা ইউনিয়নের নয়াবাজারে ‘বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক’ ঘেঁষে শ্রমিকের হাট বসে। এই হাটে শুধু যে হুসেন আলীরা এসেছেন তা নয়। জীবিকার তাগিদে আশপাশের কয়েকটি জেলা থেকে কয়েক হাজার শ্রমিক এসেছেন শ্রম বিক্রি করতে। শ্রমিকের এই কাতারে রয়েছেন নারী-শিশুসহ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির নারী-পুরুষরাও।
 
তাড়াশের মাঝগাঁ থেকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির শত শত ওরাঁও সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষও এখানে এসেছেন। এদের দলনেতা শ্যামা ওরাও ইত্তেফাককে জানান, রসুন রোপন, ধানকাটাসহ সব কাজই তারা করে থাকেন। নিজের খেয়ে জনপ্রতি মজুরি পান ৩৫০ টাকা। কিন্তু হরতাল-অবরোধ চলায় শ্রমিকের হাটে আসতে তাদের বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছেছ। তবুও পেটের তাগিদে ঝুঁকি নিয়েই তারা এই হাটে আসেন শ্রম বিক্রি করতে।

কৃষি অধিদপ্তর ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথাবলে জানা গেছে, দক্ষিণ চলনবিলের গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, সিংড়া, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও পাবনার চাটমোহর উপজেলায় একযোগে রবি শষ্যের আবাদ শুরু হয়। চলনবিলের পানি নামার সাথে সাথেই জেগে উঠে আবাদী জমি। ধান কাটার পর রসুন, সরিষাসহ রবিশষ্য আবাদে ব্যস্ত হয়ে পড়ে কৃষক। এসব কাজে স্থানীয় শ্রমিকের তুলনায় কম মজুরীতে শ্রমিকের হাটে পাওয়া যায় বহিরাগত শ্রমিক।

সোমবার ভোড়ে নয়াবাজারের শ্রমিকের হাটে গিয়ে দেখা গেল, গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম ছাড়াও তাড়াশ, সলঙ্গা ও উল্লাহপাড়া বগুড়া শেরপুর উপজেলা এলাকার শ্রমিকরা দল বেঁধে এখানে জমায়েত হয়েছেন। এসব শ্রমিকদের সবাই এসেছেন ট্রাক, নছিমন কিংবা অটোভ্যানে। সকলের গায়েই রয়েছে শীতের পোষাক, হাতে কাস্তে, কোদাল ও ধান বহনের জন্য বাক। কৃষক তাদের চাহিদামত শ্রমিক দরদাম মিটিয়ে সরাসরি নিয়ে যাচ্ছেন মাঠে।

হাফিজুল ইসলামসহ পাঁচজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিনাহালে রসুন রোপন, সেখানে লারা (ধানের খড়) বিছানো ও ধানকাটাসহ জমি তৈরির কাজ করানো হয় বহিরাগত এসব শ্রমিক দিয়েই। স্থানীয় শ্রমিকের মুজুরি ৬০০ টাকা। অথচ একই কাজ করে বহিরাগত শ্রমিকদের দিতে হয় ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। তুলনামূলক কম মজুরিতে কাজ করায় এসব শ্রমিকের চাহিদা বেশি।

ধারাবারিষা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন ইত্তেফাককে জানান, শুধু নয়াবাজার নয়, বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক ঘেঁষে মশিন্দা ইউনিয়নের হাঁসমারী ও বড়াইগ্রামের মানিকপুর পয়েন্টে এরকম শ্রমিকের হাট বসছে প্রায় একযুগ ধরে। 

গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হারুনর রশীদ ইত্তেফাককে বলেন, হাটে শ্রমিক পাওয়ায় সময়মতো আবাদ করতে পারছেন এ অঞ্চলের কৃষক।

ইত্তেফাক/পিও