বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা এখন স্বাবলম্বী

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩, ১২:০২

বছর আটেক বয়সের আমেনা। জন্ম থেকে বাক ও মানসিক প্রতিবন্ধী। কথা বলতে পারে না ঠিকমতো। চলতে ফিরতেও কষ্ট হয়। গ্রামের এমন একটা মেয়ের অন্য সময় হলে হয়তো পড়ালেখাও করা হতো না। কিন্তু দিন বদলে গেছে। 

প্রতিবন্ধী মানুষদের এখন সমাজ সম্পদ হিসেবে দেখতে শিখেছে। আমেনা তাই শত লড়াই পার করে স্কুলে পড়াশোনা করে। আর তার এই লড়াইয়ের পাশে আছে নগদ। সরকার প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের যে ভাতা দিচ্ছে, তা আমেনার অভিভাবকের মোবাইলে পৌঁছে দিচ্ছে মোবাইল আর্থিক সেবা নগদ। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, দেশব্যাপী প্রতিবন্ধীর সংখ্যা প্রায় ৪৮ লাখ। শহরের চেয়ে গ্রামে যে সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। এদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ প্রতিবন্ধীই প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত যেতে পারে না। এ ছাড়া ৭৫ শতাংশই উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরুতে পারে না। ফলে মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাতারে।

দেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় এসব পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর অধিকার নিশ্চিতে সরকারের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে নগদ। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে দেশের মোট ২৯ লাখ প্রতিবন্ধীদের দেওয়া হচ্ছে ভাতা। মাসিক ৮৫০ টাকা করে এই খাতে সরকারের বরাদ্দ ২ হাজার ৯৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা।

ডিজিটাল বাংলাদেশের এই ২৯ লাখ প্রতিবন্ধীর সিংহভাগই ভাতার টাকা পান নগদের মাধ্যমে। যার ফলে কোনোরূপ ভোগান্তি ছাড়াই ভাতার টাকা পৌঁছে যাচ্ছে তাদের কাছে। এ ছাড়াও ব্যাংকে গিয়ে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার মতো প্রতিবন্ধকতাও দূর হয়েছে সহজেই। আমেনা বুঝিয়ে কথা বলতে পারে না। তারপরও ভাঙা ভাঙা শব্দে বলে, ‘আমি পড়াশোনা করি। নগদে টাকা পাই। নগদ ভালো।’

আমেনার সাথে থাকা তার মা বলছিলেন, এই সমাজসেবার ভাতা নগদের মাধ্যমে পাওয়াতে তার সংসারের চিত্রটাই বদলে গেছে। তিনি বলেন, ‘এই টাকাটা ওর নিজের টাকা। এটা দিয়ে ও নিজের মনমতো একটা ব্যাগ কেনে, কিছু শখের জিনিস কেনে। এটা পাওয়ার ফলে ওর পড়াশোনার আগ্রহ বেড়েছে। ওকে নিয়ে এখন আমরা স্বপ্ন দেখতে পারি।’

শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ভাতার টাকা নিজের আয়, এমন একটা ধারণা ছড়িয়ে দিতে পেরেছে নগদ। সম্প্রতি বরিশাল ও ঢাকার কিছু সরকারি স্কুল ঘুরে এই অভিজ্ঞতাই পাওয়া গেল। বরিশালের প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষার্থী রিয়াজের মা শারমিন সুলতানা যেমন বলছিলেন, ‘সরকার এইডা বিরাট একটা কাজ করছে। বাচ্চাগো স্কুলে পড়াইতে এহন আর কোনো খরচ নাই। বই তো ফ্রিই দেয়। এহন স্কুলে ড্রেস, ব্যাগ, খাতা সব কেনার টাকা পাইতাছি। বাচ্চারে স্কুলে দিতে আর সমস্যা নাই।’

একই চিত্র মুন্সীগঞ্জে। মুন্সীগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দারা বেশ সচ্ছল হলেও এখানে আছে বড় একটা দরিদ্র জনগোষ্ঠী। শিল্প কারখানাগুলোতে এবং আলুর চাষে শ্রমিক ও কৃষক হিসেবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই জেলায় এসে বসত গড়েছেন লাখো মানুষ। একটা সময় এই পরিবারগুলোর বাচ্চারা বিদ্যালয়ে যেত না। কারণ তাদের পরিবার স্কুলে পাঠানোর চেয়ে ছেলে বা মেয়েটিকে কাজে দেওয়াই লাভের মনে করতো। 

এই জায়গাটায় বিপুল পরিবর্তন এনেছে উপবৃত্তি। যেমনটা বলছিলেন মুন্সীগঞ্জ সদরের উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোসাম্মাৎ নাসিমা খানম, ‘এটা মূলত একটা শিল্প এলাকা। এখানে এ ছাড়া প্রচুর আলু চাষ হয়। ফলে বাইরে থেকে অনেক মানুষ আসে এখানে শ্রমিক ও কৃষক হিসেবে। এদের পরিবারগুলো থেকে আগে শিশুরা বিদ্যালয়ে আসতে কম আগ্রহ পেত, এখন আমরা জরিপ করে দেখতে পাই, এসব পরিবারের সব শিশু বিদ্যালয়ে আসছে। এর কারণ অবশ্যই উপবৃত্তি।’

বরিশালের ইসলামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাতোয়ারা বেগম বলছিলেন, ‘আমি প্রথমেই বঙ্গবন্ধু কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই এই কোমলমতি ছাত্র ছাত্রীদের উপবৃত্তি দিয়ে বিদ্যালয়ে ফেরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। উপবৃত্তি পাওয়ার ফলে আমাদের স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার অনেক বেড়েছে। কমেছে ঝরে পড়ার হার। এটা সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মানকে অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকারের এই উদ্যোগ দেশের জন্য অসাধারণ একটা ব্যাপার।’

ইত্তেফাক/এআই