৩৩ বছর বয়সি আমেরিকায় ছাত্রভিসায় যাওয়া বাংলাদেশি সদ্য বিবাহিত একজন পুরুষ অনলাইন সেশনে জানালেন যে, তিনি মন স্থির করতে পারেন না, সারাক্ষণ পেটের মধ্যে জ্বালাপড়া করে, কোনো কোনো দিন ডায়ারিয়া হয় আবার কোনো কোনো দিন কোষ্ঠকাঠিন্য হয়, কোনো খাবার খেলেই পেট ব্যথা করে, পেটে সারাক্ষণ অত্যধিক গ্যাস হয়, বুক জ্বালাপোড়া করে, কোনো খাবারই ঠিকমতো হজম করতে পারেন না, তবে পেটব্যথা হলে পাতলা পায়খানা না হলে ভালো লাগে না। এসব কারণে মনটাও সারাক্ষণ দুর্বল থাকে, তার মনে হয় তিনি কোনো কাজ করতে পারবেন না।
বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় দেশে এবং ভারতে কয়েক বার চিকিৎসা করিয়েও তেমন কোনো ফল পাননি। আমেরিকায় ডাক্তার দেখালে তার এই সমস্যাকে আইবিএস হিসেবে ডায়ালসিস করেন এবং সাইকোলজিক্যাল থেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দেন। আমেরিকান সাইকোলজিস্টের সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে খুব অসুবিধায় পড়েন। আমার পরিচিত এক জনের রেফারেন্সে তিনি আমার সঙ্গে এসে অনলাইন সাইকোথেরাপি নেন। বর্তমানে বেশ ভালো আছেন। আইবিএস বা ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম হলো পেটের একটি পরিচিত ও বিরক্তিকর সমস্যা। সাধারণত সিনড্রোম বলতে একটি রোগের বিভিন্ন উপসর্গ বা লক্ষণের সমষ্টিকে বোঝায়। তাই আইবিএসকে পেটের কয়েকটি উপসর্গ বা লক্ষণের সমন্বয়ে একটি সমস্যা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। আমাদের আশপাশে অনেকেই এই সমস্যায় ভুগে থাকেন। এই সমস্যার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত দীর্ঘদিন কষ্ট পান। কোনো সুফল না পেয়েও এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় একজনের পর একজন চিকিত্সক পরিবর্তন করতে থাকেন। এই রোগে পেট অধিকতর স্পর্শকাতর হয় বলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ক্রিয়াশীল হয়ে থাকে।
এই ধরনের রোগীদের সাধারণত কতগুলো লক্ষণ পাওয়া যায়, এগুলো হলো :পেটব্যথা, পেটফাঁপা, পায়খানার সঙ্গে আম যাওয়া, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া ও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমন্বয় ইত্যাদি। কোনো রোগীকে আইবিএস হিসেবে শনাক্ত করতে হলে এ লক্ষণগুলোতে অন্তত দুটি লক্ষণ তিন মাস পর্যন্ত উপস্থিত থাকতে হবে।
আইবিএস সরাসরি মানসিক কোনো সমস্যা না হলেও ব্লানচ্যাট (১৯৯০) একটা গবেষণায় দেখান যে, ৬০ শতাংশেরও বেশি আইবিএস রোগী উদ্বেগজনিত মানসিক রোগে আক্রান্ত থাকেন। অন্য ২০ শতাংশ বিষণ্নতা এবং বাকিদের তীব্র মানসিক চাপসহ অন্যান্য মানসিক ব্যাধি রয়েছে। সাধারণত উদ্বেগযুক্ত ব্যক্তিরা স্বাস্থ্য, অর্থ বা ক্যারিয়ারের মতো সমস্যাগুলি নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন থাকেন। তাদের এই উদ্বেগের ফলে পেট খারাপ করে, কাঁপুনি হয়, পেশিতে ব্যথা হয়, অনিদ্রা, মাথা ঘোরা এবং বিরক্তিসহ অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ব্রেইন, বিহেভিয়ার এবং ইমিউনিটি জার্নালে প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দেখা হয় যে, কীভাবে মানসিক চাপ আইবিএস লক্ষণগুলির সঙ্গে সম্পর্কিত, এবং গবেষকরা দেখেছেন যে আইবিএস আক্রান্ত ব্যক্তিদের মানসিক চাপের প্রতি পরিবর্তিত শারীরিক প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, যা তাদের ইমিউন সিস্টেম সক্রিয় করে, পেটের ভেতর প্রদাহ এবং আইবিএস লক্ষণগুলিকে ট্রিগার করে। আইবিএস আক্রান্ত ব্যক্তিদের একটি অতি সংবেদনশীল অন্ত্র থাকে, তাই মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ একজন ব্যক্তির পেটে যা ঘটছে তা আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, উদ্বেগ মস্তিষ্ককে অন্ত্র থেকে ব্যথাসংকেতকে ভুল ব্যাখ্যা করতে পারে, যার ফলে পেটে আরো গুরুতর ব্যথা হতে পারে। স্ট্রেস, উদ্বেগ এবং হতাশার মতো শক্তিশালী আবেগগুলি মস্তিষ্কে রাসায়নিকগুলিকে ট্রিগার করে, যা আপনার অন্ত্রে ব্যথাসংকেত চালু করে কোলনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
চিকিৎসা: একজন রেজিস্টার চিকিত্সকের সঙ্গে কথা বলে বেসিক টেস্ট করে নিশ্চিত করতে হবে, পেটের অন্য কোনো রোগ আছে কি না। যদি অন্য কোনো কারণে এই সমস্যা হয়, তাহলে সেই রোগের চিকিৎসা করতে হবে। আর অন্য কোনো রোগ না থাকলে এক্ষেত্রে আইবিএস সমস্যার অন্যতম কারণ যেহেতু মানসিক চাপ ও উদ্বেগ তাই মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসাই এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময়ের মোক্ষম উপায় হতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণায় আইবিএসয়ের চিকিৎসায় সাইকোলজিক্যাল চিকিৎসা বেশি কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) বিশ্ব আইবিএস দিবস ২০২৩ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সেমিনারে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মনস্তাত্ত্বিক থেরাপি আইবিএস রোগীর জন্যে অত্যন্ত ফলপ্রসূ। এই সেমিনারে চিকিত্সকগণ আইবিএস আক্রান্ত রোগীর মানসিক চাপ কমাতে মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল গবেষক টেড আইবিএস রোগীদের নিয়ে একটি গবেষণা চালান। যেখানে ওষুধ হিসেবে রোগীদের খাওয়ানো হয় সাধারণ কিছু সুগার-পিল; আইবিএস সারানোর ক্ষেত্রে যার আসলে কোনো ভূমিকাই নেই। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই এসব রোগী তাদের রোগ-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পান, কারণ তাদেরকে জানানো হয়েছিল যে, আইবিএসের সঠিক ও কার্যকরী ওষুধটিই তারা সেবন করছেন। এ-গবেষণা থেকে বোঝা যায়, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি ও মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা হতে পারে আইবিএস নিরাময়ের বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধান।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে দেখা যায় যে, আপনার যদি আইবিএস সমস্যা থাকে, তাহলে যথাথথ চিকিৎসা নিলে আপনি ভালো থাকতে পারবেন। তাই এ সমস্যা হলে প্রফেশনাল সহায়তা নিন। বর্তমানে অনলাইনেও সহায়তা নিতে পারবেন।
লেখক: ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট
