বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

৩৬তম জাতীয় কবিতা উৎসবে সভাপতির ভাষণ

যুদ্ধ গণহত্যা সহে না কবিতা

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬:০৩

৩৬তম জাতীয় কবিতা উৎসবের উদ্বোধনী দিনে সভাপতির ভাষণ প্রদান করেন জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি মুহাম্মদ সামাদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি চত্বরে অনুষ্ঠিত এ উৎসবে প্রদত্ত ভাষণটি ইত্তেফাক পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো:

শ্রদ্ধেয় উদ্বোধক প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ, উপস্থিত কবি ও কবিতা অনুরাগী সুধীমণ্ডলী

প্রথমেই মাঘের এই হিমেল সকালে ছত্রিশতম জাতীয় কবিতা উৎসবে অংশগ্রহণের জন্যে আপনাদেরকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন, প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাই। উৎসবকে সফল করতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যে-সকল কবিবন্ধু অনেক কষ্ট করে উৎসবে যোগ দিতে এসেছেন, বিদেশ থেকে যে-সকল অতিথি কবিবন্ধু আমাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে উৎসবকে মহিমান্বিত করেছেন-তাদের সকলের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

সামাজিক বিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে প্রাত্যহিক জীবনের যৎকিঞ্চিৎ পাঠ এবং অভিজ্ঞতা থেকে আমার উপলব্ধি হয়েছে যে, ঘটনা বা Phenomenon হিসেবে মাটির পৃথিবীতে রাজনীতিই সকল কিছুর নিয়ামক। রাজনীতি অস্বচ্ছ হলে তার পরিণতি কখনও শুভ হয় না। অস্বচ্ছ রাজনীতির মধ্যে শক্তি, সম্পদ ও প্রতিপত্তির দাপট নিহিত। সেই অশুভ দাপটে প্রাণের পৃথিবী হয়ে পড়ে যুদ্ধ, সংঘাত ও ধ্বংসযজ্ঞের চারণভূমি-যা কোনো মতেই মেনে নেওয়া যায় না।

কালের প্রবাহে তা জীবনের ভালোর চেয়ে মন্দের কিংবা শুভের চেয়ে অশুভের পথে অধিক গতি পেয়েছে-যা আমাদের কারোরই কাম্য নয়। আজকের দিনে উচ্চমাত্রায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারের কারণে সব কিছুরই ব্যাপ্তি ঘটেছে বিরাটে ও বিশালে। ফলে, সকল ঘটনা সংখ্যা বা আকারে এক থেকে বেড়ে শত-সহস্র-লক্ষ-কোটিতে পৌঁছেছে। এসব উদ্যোগ একদিকে মানবসভ্যতার অগ্রগতির বার্তা দেয়; অন্যদিকে যুদ্ধে মারণাস্ত্রের নিষ্ঠুর আঘাতে কোনো জাতি-গোষ্ঠীকে সমূলে উপড়ে ফেলার বর্বর গণহত্যায় মেতে ওঠে।

এই মুহূর্তে ইসরাইল কর্তৃক গাজার প্রায় ২২ লক্ষ শিশু-নারী-প্রবীণসহ প্যালেস্টাইন জাতিকে নিশ্চিহ্ন করতে নতুন করে বর্বর গণহত্যা ও তাদের বসতির ওপর সন্ত্রাসী ধ্বংসযজ্ঞ এক জ্বলন্ত প্রমাণ। ইসরাইলের নির্বিচার হামলায় গাজা উপত্যকায় প্রায় ৩০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। প্রকাশ্য সমর্থন ও প্ররোচনাদাতা পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সসহ পৃথিবীর দেশে দেশে নাগরিক সমাজ এই বর্বরতার প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন। ইসরাইলি সেনাবাহিনী প্যালেস্টাইনে যে জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে জাতিসংঘসহ সারা পৃথিবীর বিবেকবান মানুষ স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে-‘যে কাউকে হত্যা করলো সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষকেই হত্যা করলো। আর যে কারো প্রাণ রক্ষা করলো সে যেন সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করলো।’ তাই, যুদ্ধ ও গণহত্যার বিশ্ব ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে যৌক্তিক বিবেচনায় ‘৩৬তম জাতীয় কবিতা উৎসব ২০২৪’-এর কণ্ঠে আমরা শ্লোগান তুলে দিয়েছি-যুদ্ধ গণহত্যা সহে না কবিতা। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, এবার কবিতা উৎসবের প্রতিপাদ্য মূলত হত্যা ও গণহত্যা। 

৩৬তম জাতীয় কবিতা উৎসবের মঞ্চে সংগঠনটির সভাপতি মুহাম্মদ সামাদসহ অতিথিরা | ছবি: ইত্তেফাক

প্রিয় সুধীমণ্ডলী,

সেই সূত্রে, এই স্বল্প পরিসরে অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে আমি ধারাবাহিকভাবে অতীত থেকে অদ্যাবধি সংঘটিত কিছু হত্যা-গণহত্যার কথা উল্লেখ করা সংগত বিবেচনা করি। যেমন, নেটিভ আমেরিকান গণহত্যা (১৪৯২-১৯০০) এবং কঙ্গো গণহত্যা (১৮৮৫ - ১৯০৮)। এসব হত্যা-গণহত্যা দীর্ঘকাল ধরে সংঘটিত হয়েছে মূলত স্থানীয়দের নিঃস্ব করে বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ইউরোপীয়দের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উগ্র লোভের কারণে। অন্যদিকে, তুর্কিদের আক্রমণে আর্মেনীয় গণহত্যা (১৯১৫-১৯১৬)-যেখানে আর্মেনিয়ার জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ ১৫ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়।

স্মরণকালের সবচেয়ে নৃশংস গণহত্যা হচ্ছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হিটলার কর্তৃক হলোকাস্টে ৬০ লক্ষ ইহুদি নিধন। এছাড়া ব্যাপকতার বিবেচনায় ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত কম্বোডিয়ার গণহত্যা, মিয়ামারের রোহিঙ্গা গণহত্যা (১৯৭৮-২০১৭), ১৯৯২ সালের বসনীয় গণহত্যা, ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডার গণহত্যা এবং ২০০৪ সালে সংঘটিত সুদানের দারফুর গণহত্যা ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা হিসেবে বিবেচিত হয়। কোনো কবিই এমন নির্দয় যুদ্ধ ও গণহত্যা কখনও সহ্য করতে পারে না।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা আমার,

আজ আমাদের বিশেষভাবে স্মরণ করা কর্তব্য যে, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এই দেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদর-আলশামস’রা আমাদের স্বাধীনতাপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সাংবাদিক-লেখক-কবি-বুদ্ধিজীবী, শিশু-নারীসহ ৩০ লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে নির্বিচারে ও নৃশংসভাবে হত্যা করে। সম্ভ্রমহানি ঘটানো হয় দুই লক্ষের অধিক মা-বোনের। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে যারা বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাদের মধ্যে এমন কোনো পরিবার ছিল না যে-পরিবার থেকে কেউ-না-কেউ এই নির্মম গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ-নির্যাতন থেকে রেহাই পেয়েছেন। তবু সান্ত¡নার কথা এই যে, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার এই গণহত্যাকারী ও নির্যাতনকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুদ্ধাপরাধীর শাস্তি কার্যকর করেছে এবং এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, আজও এই গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলেনি। এই উৎসব মঞ্চ থেকে আমরা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত নৃশংস গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবি জানাই।

উল্লেখ্য, আজও আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি ও তাদের দোসররা যেভাবে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, বোমা হামলা ও অবরোধের নামে নারী, শিশু ও সাধারণ নাগরিকদের হত্যা করে প্রতিনিয়ত দেশকে অস্থিতিশীল করার ঘৃণ্য সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে আমরা তার তীব্র নিন্দা জানাই এবং উপযুক্ত বিচার দাবি করি। 

৩৬তম জাতীয় কবিতা উৎসবের মঞ্চে সংগঠনটির সভাপতি মুহাম্মদ সামাদসহ অতিথিরা | ছবি: ইত্তেফাক

কবিতা অনুরাগী বন্ধুগণ,

প্রসঙ্গত, হত্যার বিরুদ্ধে কবিতা, গান বা সাহিত্যের ভূমিকা নিয়ে দু-কথা বলি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাল্মীকিপ্রতিভা নাটকে দেখিয়েছেন-দস্যু রত্নকর সঙ্গীদের ডেকে বলেন-‘শোন্ধসঢ়; তোরা তবে শোন্ধসঢ়;।/অমানিশা আজিকে, পূজা দেব কালীকে... বলি নিয়ে আয়!’ দস্যুরা এক বালিকাকে ‘বলি’ হিসেবে ধরে নিয়ে এলে বাল্মীকি ঘটনা পরম্পরায় তাকে মুক্ত করে দেন। এক পর্যায়ে দেবী সরস্বতী আবির্ভূত হয়ে তাকে আর্শীবাদ করলেন-‘আমিবীণাপাণি, তোরে এসেছি শিখাতে গান,/ তোর গানে গলে যাবে সহস্র পাষাণ-প্রাণ/ যে রাগিণী শুনে তোর গলেছে কঠোর মন/ সে রাগিণী তোরই কণ্ঠে বাজিবে রে অনুক্ষণ।’ দেবী সরস্বতীর শেখানো গানে দস্যু রত্নকরের পাষাণ প্রাণ গলে যায় রত্নাকর হয়ে যান কবি বাল্মীকি। ভারতবর্ষের বিশ্বাস মতে, এই বাল্মীকিই পৃথিবীর আদি কবি!

এই আদি কবি একদিন তমসা নদীর তীরে ভ্রমণ করতে গিয়ে দেখেন একজোড়া ক্রৌঞ্চ বা কোঁচবক আনন্দে ওড়াওড়ি করছে। হঠাৎ সেই সময় এক ব্যাধের তীরের আঘাতে একটি পাখি মাটিতে পড়ে মরে যায়। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে বাল্মীকি ব্যাধকে অভিশাপ দেন:

মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ।
যৎক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামহোহিতম্ধসঢ়;
[হে ব্যাধ তুমি অনন্তকাল শান্তি পাবে না।
তুমি হত্যা করেছো প্রেমে মগ্ন ক্রৌঞ্চকে!]

এই আদি কবির কণ্ঠে উচ্চারিত পৃথিবীর প্রথম শ্লোক বা কবিতা ছিল হত্যার বিরুদ্ধেই।

এখন সারা বিশ্বে শত-সহস্র-লক্ষ-কোটি মানবের প্রাণ-সংহারে বাল্মীকির মতো মর্মাহত হয়ে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য, শামসুর রাহমান, নাজিম হিকমত, পাবলো নেরুদা, মাহমুদ দারবিশ, জ্যাক হার্শম্যান থেকে আজকের নবীন কবিরাও তাঁদের কবিতা দিয়ে দেশ-কাল-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে অন্যায় যুদ্ধ ও গণহত্যার বিরুদ্ধে যুগ
যুগ ধরে প্রতিবাদ করে চলেছেন। বহু কবি জেল-জুলুম-নির্যাতন ও দুঃসহ আত্মগোপনতা সহ্য করেছেন, এমন কি জীবন উৎসর্গ করেছেন। 

উল্লেখ্য, ১৯১৯ সালে ভারতের অমৃতসরে ভয়াবহ জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যার প্রতিবাদে বাংলাভাষার সর্বপ্রধান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘নাইট’ উপাধি প্রত্যাখ্যান করে গণহত্যার প্রতিবাদে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছিলেন।

জাতীয় কবিতা উৎসবে কবিতাপ্রেমীদের একাংশ | ছবি: ইত্তেফাক

প্রিয় বন্ধুগণ,

যুদ্ধের প্রয়োজনে সাম্রাজ্যবাদী অস্ত্র-ব্যবসায়ীদের সীমাহীন দৌরাত্ম্য, সমরতন্ত্রের ক্ষমতালিপ্সা এবং মানবাধিকারের প্রহসন আমরা এখন আর মানতে পারছি না। পৃথিবী জুড়ে প্রতিদিন অসম যুদ্ধে শিশুহত্যা, নারীহত্যাসহ অগণিত মানুষের প্রাণ-সংহার, বসতি উচ্ছেদ ও লুণ্ঠনের ভয়াবহতা আমরা আর সইতে পারছি না। তাই, প্রাচীনকাল থেকে যে সুন্দর ও বাসযোগ্য মানবিক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে এসেছি, আমরা প্রতিমুহূর্তে সেই প্রেমময়, প্রীতিময়, ভালোবাসাময় ও সম্প্রীতিময় দেশ এবং সমাজ চাই।

আজকের পৃথিবীতে বিষময় যুদ্ধ, হত্যা-গণহত্যায় আমাদের যে সকল পিতা, মাতা, ভাই, বোন ও সন্তানেরা মৃত্যুভয় এবং অসহ্য যন্ত্রণায় পীড়িত ও কাতর হয়ে পড়ছেন; তাঁদের হৃদয়ে ও বাহুতে শক্তি সঞ্চারের লক্ষ্যে এই ৩৬তম জাতীয় কবিতা উৎসব-সমাবেশ থেকে আসুন, দৃঢ়চিত্তে বলি তোমরা একা নও-আমরা তোমাদের পাশে আছি। আসুন, সমস্বরে উচ্চারণ করি-যুদ্ধ গণহত্যা সহে না কবিতা।

কবিতার জয় হোক। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

মুহাম্মদ সামাদ
সভাপতি, জাতীয় কবিতা পরিষদ
১লা ফেব্রুয়ারি ২০২৪, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি চত্বর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এএএম