বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

তিনি ও চিত্রাঙ্কন

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:৩০

চিত্রাঙ্কনে রবীন্দ্রনাথকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন— ‘আর্জেন্টিনার সাহিত্যিক ভিক্তোরিও ওকাম্পো’। ৬৩ বছর বয়সে তিনি হঠাত্ আঁকাআঁকির প্রেমে পড়েছিলেন! যদিও কবির সাহিত্যচর্চাকে নিয়ে যেমন আলোচনা হয়, তার চেয়ে নেহাত কম চর্চা হয় ওনার এই শিল্পবোধ নিয়ে। প্রকৃতপক্ষে, ১৯২৪ সালে দক্ষিণ আমেরিকায় ভ্রমণকালে রবীন্দ্রনাথ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি আর্জেন্টিনায় ভিক্তোরিও ওকাম্পোর বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেন। পাণ্ডুলিপি সংশোধনের সময় কাটাকুটি করে রবীন্দ্রনাথের আঁকা নানা অবয়ব বা নকশা এবং তার ছবি আঁকার খাতা দেখে ওকাম্পো তাকে ছবি আঁকতে উত্সাহিত করেছিলেন।

শুরু হলো কবির চিত্রকর হওয়ার চেষ্টা। তুলির টানে ফুটিয়েছেন নারীর মুখ, অবয়ব, প্রতিকৃতি, আত্মপ্রতিকৃতি, স্থির বস্তু, নিসর্গ, ফুল-পাতা, বিভিন্ন প্রাণী, বিমূর্ত বিষয়, জ্যামিতিক আকৃতি, রেখাশ্রিত ছবি ইত্যাদি। কলমের কালি ব্যবহার ছাড়াও তিনি ক্রেয়ন, প্যাস্টেল, চারকোল ও তেল রংও ব্যবহার করেছেন। কবি থেকে চিত্রশিল্পী হয়ে ওঠা রবীন্দ্রনাথ স্বীয় অঙ্কন-কৌশল নিয়ে বলেছেন, ‘ছবিতে আমার একটা বেশ মজা আছে। আমি তো ছবিতে একইবারে রং দিই না। আগে পেনসিল দিয়ে ঘষে ঘষে একটা রং তৈরি করি, মানানসই করে, তারপর তার ওপর রং চাপাই। তাতে করে হয় কি—রংটা একটু জোরালো হয়।’

 প্রশ্ন জাগে, কোথা থেকে এসেছে এই শিল্প? প্রাকৃতিক বিষয়বস্তুগুলোকে রংতুলির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার প্রবণতা মানুষের মাঝে এলো কোথা থেকে? সবচেয়ে মজার এবং অবাক করার মতো ব্যাপার হলো মানুষ প্রাচীন প্রস্তর যুগ থেকেই ছবি আঁকে। এটা সেই সময়কার কথা, যখন মানুষ সভ্য ছিল না, তারা তখন গুহায় বসবাস করত এবং ফলমূল ও পশুর মাংস খেয়ে বেঁচে থাকত। সবে তারা পাথরের ব্যবহার শিখেছিল। যখন তাদের থাকার মতো নিরাপদ আশ্রয় ছিল না, পরিধানের বস্ত্র ছিল না, তখনকার দিনে তারা ছবি আঁকত গুহার প্রাচীরে, পরবর্তীকালে যা গুহাচিত্র বা কেইভ আর্ট নামে পরিচিতি পায়। রঙের বদলে বিভিন্ন রকম মাটির সঙ্গে পশুর চর্বি মিশ্রিত করে ব্যবহার করত। এছাড়া পশুর রক্ত দিয়েও তারা ছবি আঁকত। তাদের অঙ্কিত ছবিগুলোতে বিভিন্ন ধরনের পশুর ছবিই প্রাধান্য পেয়েছে। অনুমেয় যে, তারা শিকারে যাওয়ার আগে বিভিন্ন পশু বধ করার ছবি আঁকত। তাদের বিশ্বাস ছিল, শিকারে যাওয়ার আগে পশু বধ করা ছবি অঙ্কন করলে তারা সহজেই শিকারে সফল হবে। যদিও এই আঁকাআঁকি নিয়ে নানান জনের নানা মতামত রয়েছে। কারো মতে, প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষ ধর্মীয় কাজে এ ধরনের চিত্র অঙ্কন করেছে। আবার কেউ বলেন, এটা হলো তাদের একটা যোগাযোগের মাধ্যম মাত্র। প্রাচীন কালের প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে আনুমানিকভাবে ধরা হয় ৩৮ হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দ অঙ্কন করা হয়েছিল। এমন অসংখ্য গুহাচিত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে বর্তমানে, যার বেশির ভাগই প্রাণীর ছবি; যেমন—বল্গা হরিণ, ম্যামথ, ঘোড়া, ষাঁড়, পাখি, সিংহ, প্যান্থার, গন্ডার প্রভৃতি। তাদের এই বিশ্বাস থেকেই ছবি আঁকার যাত্রা শুরু হয়। তাদের অঙ্কিত এই প্রাণীগুলো অস্ত্রবিদ্ধ এবং আহত। তবে অনুসন্ধানকৃত প্রাপ্ত ছবিগুলোর মধ্যে মানুষের হাতের ছাপও উল্লেখ্য। প্রাচীনকালের এসব চিত্রকর্মের মধ্যে বিভিন্ন রকম জ্যামিতিক চিত্র উল্লেখযোগ্য। তাদের এই জ্যামিতিক চিত্রগুলো বিশেষ অর্থ বহন করে বলে পুরাতত্ত্ববিদের ধারণা।

স্পেনের Cueva de las Monedas গুহায় প্রাপ্ত রেইন ডিয়ারের ছবি আঁকা হয়েছিল সর্বশেষ বরফযুগে। ইন্দোনেশিয়ান দ্বীপ Sulawesi-তে প্রাপ্ত গুহাচিত্রটির বয়স প্রায় ৩৫ হাজার বছর। ইন্দোনেশীয় অস্ট্রেলীয় বিজ্ঞানীরা অন্যান্য অনাড়ম্বরপূর্ণ গুহাচিত্রগুলো ৪০ হাজার বছর পুরাতন বলে মনে করেন। বয়স নির্ধারণের পদ্ধতি হিসেবে তারা চিত্রের ওপর নুন চুইয়ে তৈরি হওয়া স্তম্ভগুলোর কার্বনডেটিং পরীক্ষা করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে প্রাপ্ত স্যান প্রস্তরচিত্র দক্ষিণ আফ্রিকার Drakensberg Park-তে প্রাপ্ত চিত্রগুলোর আনুমানিক বয়স ৩ হাজার বছর। এগুলো ছিল স্যান জাতির মানুষদের আঁকা। এই স্যান জাতির মানুষ উক্ত অঞ্চলে ৮ হাজার বছর আগে বসবাস করতেন। নামিবিয়ার অ্যাপোলো ১১ গুহায় প্রাপ্ত গুহাচিত্রগুলো খ্রিষ্টপূর্ব ২৩ হাজার থেকে ২৫ হাজার বছর আগে অঙ্কিত। এসব আবিষ্কৃত গুহাচিত্রের অন্যতম বিস্ময় আলতামিরা গুহাচিত্রটি স্পেনের সানতানদার অঞ্চলের আলতামিরা গুহার ছাদে অঙ্কিত। ফ্রেস্কো ধরনের এই গুহাচিত্রটি আবিষ্কৃত হয় ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে।

‘মারসেলিনো দ্য সাওতুলা’ নামক প্রত্নতাত্ত্বিক তার আট বছরের মেয়েকে নিয়ে স্পেনের সানতানদার অঞ্চলের আলতামিরা গুহার কাছে প্রাচীন মানববসতির সন্ধান খুঁজতে গিয়ে এটি আবিষ্কার করেন। প্রথমে তার মেয়ে চিত্রটি লক্ষ করে ‘ষাঁড় ষাঁড়’ বলে চিত্কার করে ওঠে এবং সঙ্গে সঙ্গেই সাওতুলা আলোর ব্যবস্থা করে দেখেন, এটি একটি বাইসন। তিনি এটি পর্যবেক্ষণ করে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের আঁকা চিত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন। ছবিটি অঙ্কন করতে কয়লা, মেটে হলুদ এবং লাল হেমাটাইট ব্যবহূত।

ছবি আঁকার প্রতি স্বয়ং কবিগুরু থেকে প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী কামরুল হাসানের তামাদির মেয়াদ শেষ হয়েছিল না। তবে কেউ শখের বসে ছবি আঁকে, আবার কারোর জন্য এটা হয়ে ওঠে জীবিকানির্বাহের উপায়। বর্তমানে ছবি আঁকা শেখার কত ধরনের যে মাধ্যম! এই শিল্পকে গুরুত্ব দিয়ে গড়ে উঠেছে হরেক রকম প্রতিষ্ঠান। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়েও রয়েছে চারুকলা অনুষদ, পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা

লেখক: সংস্কৃতিকর্মী

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন