মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

যমুনার বালু উত্তোলন

বগুড়ায় ছয় মাসে ৫০০ বাড়িঘর ও ৩০০ বিঘা জমি বিলীন

*ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাউবোর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫:১৫

গত দুই বছর থেকে বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা থেকে বালি উত্তোলনের ফলে ৫ শতাধিক ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া একই সময়ে প্রায় ৩০০ বিঘা জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। বালু উত্তোলন করে তা বিক্রি করায় নদীর গতিপথ দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এতে নদীভাঙন রোধে নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনা গ্রোয়েন, হার্ডপয়েন্ট, স্পার, রিভেটমেন্ট, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ যমুনা তীরবর্তী গ্রাম জনপদ হুমকির মুখে পড়েছে।

জেলা প্রশাসন বালুমহাল ঘোষণা করে ইজারা দেওয়ায় বৈধতার সুযোগ নিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র যমুনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে অবৈধভাবে কোটি কোটি ঘনফুট বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছে। নদীভাঙনের শিকার গ্রামবাসী অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে বিভিন্ন সময়ে নদীর পাড়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। এর মধ্যে আবার বালুমহাল ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

নদীভাঙনের শিকার গ্রামবাসী বলছেন, ইজারাদারকে যে শর্ত বেঁধে দেওয়া হয়, একবার ইজারা হাতিয়ে নিতে পারলে তারা তা আর মানেন না। বৈধতার সুযোগ নিয়ে দিনরাত নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে কোটি কোটি ঘনফুট বালু উত্তোলন করে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রশাসন মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করলেও বালু উত্তোলন বন্ধ হয় না।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ১৩ এপ্রিল প্রথম সারিয়াকান্দিতে যমুনার বুকে বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়। সে সময় কর্নিবাড়ী ইউনিয়নের নাড়াপালা মৌজার বালুমহাল থেকে ৪০ লাখ ঘনফুট বালু এবং বোহাইল ইউনিয়নের কালিয়ান মৌজার বালুমহাল থেকে ৭২ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু ইজারাদাররা ইজারার শর্ত ভঙ্গ এবং নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে কোটি কোটি ঘনফুট বালু উত্তোলন করে বলে অভিযোগ।

অভিযোগের ভিত্তিতে সেসময় ঘুঘুমারি, বড়ইকান্দি, দেবডাঙ্গা, ধলিরকান্দি পয়েন্টে রাখা বালু জব্দ করা হয়। পরে ওই বালুই আবার নিলামের মাধ্যমে ইজারাদারকে ফেরত দেওয়া হয়। এরপর কোনো প্রকার হাড্রোগ্রাফিক সার্ভে ছাড়াই ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল নাড়াপালা মৌজায় ৪০ একর বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়। সেখান থেকে ৬২ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু ইজারাদার একইভাবে শর্তভঙ্গ করে যমুনার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বালু উত্তোলন করে বলে অভিযোগ উঠে।

নদীপাড়ের ভুক্তভোগী গ্রামবাসী জানান, প্রতিবছর এভাবে বালুমহাল ইজারা দেওয়ায় আমরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। সম্প্রতি নদী তীরবর্তী ইছামারা, কামালপুর, রৌহাদহ, কুতবপুর, ধলিরকান্দি, বয়ড়াকান্দি গ্রাম ঘুরে মানুষের মুখে একই কথা শোনা গেছে। যমুনার বুকে এভাবে বালুমহাল ইজারা দিয়ে যদি প্রশাসনের তদারকি না থাকে, তাহলে ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিভিন্ন অবকাঠামো ধসে যাবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হক বলেন, বালুমহাল ইজারা দিয়ে যদি সার্বক্ষণিক তদারকি না থাকে, তা হলে ইজারাদাররা নদী তীরবর্তী এলাকা থেকে বালু উঠালে আমাদের স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হবে। তাই আমরা যখন খবর পাই, ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনকে চিঠি দিয়ে থাকি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার তৌহিদুর রহমান বলেন, এবার সার্ভে করে বালুমহাল নদীর পূর্ব দিকে সরিয়ে নেওয়া হবে, যাতে করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবকাঠামো কিংবা গ্রাম জনপদের কোনো ক্ষতি না হয়।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নিলুফা ইয়াছমিন (রাজস্ব) জানান, এবার সব ধরনের সার্ভে করে বালুমহাল ইজারা দেওয়া হবে।

ইত্তেফাক/এবি