আফসোস এই সকল দেশের জন্য!

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৪, ০৮:৪৫

আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে নেতিবাচক যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিদ্যমান, তাহার পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যাইতেছে না।  বিশেষ করিয়া আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী দেশের একটি অঙ্গরাজ্যের কথা বলাই বাহুল্য। ২০১১ সালের নির্বাচনে তত্কালীন প্রধান বিরোধীশক্তি তৃণমূল কংগ্রেসের নিকট পরাজিত হইয়া অবসান ঘটে ৩৪ বত্সরের বাম রাজত্ব; কিন্তু বামপন্থিদের দুঃশাসনের অবসান হওয়ার পর যাহারা এখানকার রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের আশা করিয়াছিলেন, তাহাদের সেই আশার গুড়ে বালি পড়িয়াছে নিঃসন্দেহে। দেখা যাইতেছে পূর্বের মতো মাস্তানতন্ত্র সেখানে আজও বিরাজমান। সম্প্রতি সন্দেশখালীতে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় একজন নেতার গ্রেফতার, তাহার অত্যাচার-নির্যাতন, জমি দখল, নিজস্ব পেটোয়া বাহিনী গঠন ইত্যাদি কাহিনি পড়িয়া বিস্মিত গণতন্ত্রকামী মানুষ। ইহা ছাড়া সেইখানে যে কোনো নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া মারামারি, হানাহানি, মামলা-হামলার খবর নূতন নহে। আগামী এপ্রিল-মে মাসে দেশটির লোকসভা নির্বাচনের পূর্বভাগেই সেইখানকার রাজনীতি উত্তপ্ত হইতে শুরু করিয়াছে।

উল্লেখ্য, পৃথিবীর অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের চিত্র ও চরিত্রও অনুরূপ। ক্ষমতাসীনরা বিরোধিতা সহ্যই করিতে পারেন না। কেহ বিরোধিতা করিবার চেষ্টা করিলেই হামলা ও মামলার খড়্গ নামিয়া আসে। কোথাও কম বা অধিক—এই যাহা পার্থক্য। সরকারের বিরুদ্ধে কেহ মাথা তুলিয়া দাঁড়াইতে গেলেই তাহাকে কতভাবে যে নাজেহাল ও হেনস্তা করা হয় তাহার ইয়ত্তা নাই। নিষ্ঠুরভাবে দমনের ফন্দিফিকির সর্বদা চলিতেই থাকে। তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে রাজনৈতিক অস্থিরতার বড় কারণ হইল বিরোধী মতাদর্শের লোকদের প্রতি এই দমন ও পীড়নের নিষ্ঠুর প্রবণতা। তাহাদের কোথাও দাঁড়াইতে না দেওয়ার এই সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য বিপজ্জনক। এখানে প্রসঙ্গক্রমে সেই রূপকথার কাহিনিটি আমাদের মনে পড়িয়া যায়। মাছের দল দেবতার নিকট নিজেদের জন্য একজন রাজা চাহিলে তাহাদের জন্য পাঠানো হইল কচ্ছপকে; কিন্তু কচ্ছপ অলস প্রকৃতির, সে কেবল ঘুমায়। অগত্যা তাহাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এইবার পাঠানো হইল মাছরাঙাকে; কিন্তু ইহার পর মাছেরা পড়িল আরো বিপাকে। মাথা চাড়া দিতেই মাছরাঙা তাহাদের ধরিয়া খাইয়া ফেলে। উন্নয়নশীল দেশের অবস্থাও হইয়াছে তদ্রূপ। কেহ ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে কিছু বলিতে গেলেই অনিবার্য হইয়া দাঁড়ায় জেল-জুলুম । এই সকল দেশে প্রশাসন আর প্রশাসন নাই বলিলেই চলে। প্রশাসনিক ক্যাডাররা পরিণত হয় রাজনৈতিক ক্যাডারে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রভৃতি সংস্থা আর রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন। রাজনৈতিক দল ও সরকারি আমলারা মিলিয়া-মিশিয়া যেন একেকার হইয়া যায়। আমলাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা যে মহান উদ্দেশ্য-লক্ষ্যকে সম্মুখে রাখিয়া তাহা হইতে বহুলাংশে বিচ্যুতিতে রাষ্ট্র পড়িয়া যায় হুমকির মধ্যে। অনেক দেশে স্থানীয় সরকার হইতে শুরু করিয়া জাতীয় নির্বাচন আসিলেই সেখানে বিপক্ষের নেতাকর্মীদের দমনে তাহারা উঠিয়া-পড়িয়া লাগে। নির্বাচনের বহু পূর্ব হইতেই শুরু হয় ধরপাকড়। নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পুরাতন মামলা পুনর্জীবিত করা হয়। নূতন করিয়া দেওয়া হয় মিথ্যা ও সাজানো মামলা। একের পর এক মামলা দিয়া পর্যুদস্ত করা হয় যাহাতে তাহারা নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় অংশগ্রহণ করিতে না পারেন। বরং কোর্ট-কাচারি দৌড়ঝাঁপ করিতে গিয়াই মূল্যবান সময় চলিয়া যায়। ফলে ঐ সকল দেশে বিরোধী মতের যেমন গুরুত্বপূর্ণ নেতা থাকেন না, তেমিন রাজনৈতিক মাঠে-ময়দানে নিবেদিত প্রাণ ও সাহসী কর্মীর দেখা মেলাও ভার হইয়া পড়ে। এইভাবে ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার চলে হীন প্রচেষ্টা।

ভারতীয় উপমহাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশের এই সকল চিত্র সত্যিই হতাশাজনক। তবে আজ হউক আর কাল হউক—ইহার একটি সুরাহা অবশ্যই হইবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া এই কুস্তির লড়াইয়ের অবসান একান্ত কাম্য। সরকারি প্রশাসন যদি প্রশাসনের মতো আচরণ করে, তাহা হইলে এমনটি হইবার কথা নহে; কিন্তু দেখা যায়, উন্নয়নশীল দেশসমূহে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগ যে দিকে কাত হয় বা ঝুঁকিয়া পড়ে, নির্বাচনে তাহারাই বিজয়ী হন। তাহারা কেন কাত হন বা কে বা কাহারা তাহাদের কাত করান তাহা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেহ জানেন না। পরিহাসের বিষয় হইল, আজ যাহারা এইভাবে অত্যাচারিত ও নির্যাতিন হন, ক্ষমতার পট পরিবর্তনে তাহারা ক্ষমতায় গিয়া আবার একই পন্থা অবলম্বন করেন। ফলে তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা চলিতেই থাকে। আফসোস এই সকল দেশের জন্য!

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন