এই মুহূর্তে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ভারতীয় পণ্য বর্জনের একটি আওয়াজ শুনা যাইতেছে। এই বর্জন লইয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের দায়িত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য সম্প্রতি প্রকাশ্যে পণ্য বর্জনের সমর্থনে তাহার গায়ের চাদর খুলিয়া পুড়াইয়া দিয়াছেন। যদিও বিবিসি বাংলার রিপোর্ট অনুযায়ী, এই রাজনৈতিক দলটি দলীয়ভাবে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে নাই; কিন্তু সার্বিকভাবে এই ধরনের পণ্য বয়কটের আহ্বান কি একধরনের রসিকতা নহে?
ব্যক্তিগতভাবে যে-কেহ কোনো কিছু না-ই কিনিতে পারে। যে কিনিতে চাহে, সে কিনিবে; যে কিনিতে চাহে না, সে কিনিবে না। ইহা ভোক্তা বা ক্রয়কারীর স্বাধীনতা। কারণ, মানুষ তাহার নিজ নিজ পছন্দ ও রুচিতে চলে। তাহা ছাড়া, আমরা বসবাস করি একটি মুক্তবাজার অর্থনীতির দেশে। যাহারা অর্থনীতি বুঝেন তাহারা জানেন, দুইটি দেশের বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি ও ভোক্তাদের অধিকার লইয়া এই ধরনের ডাক হাস্যকর। দেশ স্বাধীন হইয়াছে ৫৩ বত্সর পার হইল। আজ বাংলাদেশ একটি পরিণত বয়সের দেশ। অতীতে এই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলটিও তো তিন দফায় রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন ছিল। সুতরাং একটি প্রতিবেশী দেশের পণ্য ঘোষণা দিয়া বয়কট করিবার কথা বলাটা কোন ধরনের রাজনৈতিক শিষ্টাচার? ভুলিলে চলিবে না, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বিশেষ নীতি মতবাদ রহিয়াছে—সকলের সহিত বন্ধুত্ব, কাহারো সহিত বৈরিতা নহে। আমাদের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে এই নীতির সারবস্তু প্রতিফলিত হইয়াছে। এই অনুচ্ছেদের মূল বক্তব্য হইল—আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান, অন্যান্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, জাতিসংঘ সনদ বাস্তবায়ন এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক আইন মানিয়া চলা প্রভৃতি। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক সমীকরণ এবং প্রতিবেশীদের সহিত সম্পর্ক বিবেচনায় এই নীতিটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলিয়া ধরিবার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং যাহারা দেশের বিবিধ গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার দিকে দৃষ্টি না দিয়া এই ধরনের বয়কট লইয়া মাতামাতি করেন, তাহাতে মনে হয় দেশের জন্মের যেন ৫৩ বত্সর পার হয় নাই। আমরা যেন এখনো শিশুকাল পার করিতেছি। অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, এই দলটি এই মুহূর্তে এত হতাশা, এত ব্যর্থতার সমুদ্রে ভাসিতেছে যে, তাহারা দেখিতে পাইতেছে, তাহাদের কথা কেহ শুনে না, অন্য কেহ কিছু করিয়া দিবে—সেই আশায় তাহারা বসিয়া আছে।
দেশের মানুষ এখন কোন কোন সমস্যায় সবচাইতে অধিক উদ্বেলিত ও জর্জরিত, তাহা লইয়া আমরা কতখানি সচেতন? আমরা এমন সকল বিষয় লইয়া হইচই করিতেছি, যাহা বাস্তবে মূল বড় সমস্যাগুলিকে আড়াল করিয়া দিতেছে। আমাদের এত এত সমস্যা, এত ইস্যু—অথচ সেইগুলি কেহ অ্যাড্রেস করিতেছে না। এই সকল সমস্যার আড়ালে মাঝখান হইতে রাজাকাররা উঠিয়া আসিয়াছে। উঠিতে উঠিতে তাহারা কোথায় গিয়া পৌঁছাইয়াছে—তাহা মহান সৃষ্টিকর্তা আর শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ ছাড়া আর কেহ বোধহয় জানেন না। তাহারা সংঘবদ্ধ হইতেছে—এই কথা আমরা বারংবার শুনিতেছি। দেশের ও দশের স্বার্থে মহান সৃষ্টিকর্তা যাহাদের ক্ষমতায় আসীন করিয়াছেন, তাহাদের উপর অর্পিত রহিয়াছে ১৭ কোটি মানুষের জীবন উন্নয়নের মহান দায়িত্ব; কিন্তু সাময়িক সুবিধার্থে তাহারা যাহা করিতেছে তাহাতে ইহার পরিণতি কী হইতে পারে? আমরা দেখিতেছি, দেশের বিরুদ্ধে যাহারা যৌবনকালে স্বাধীনতাকামীদের খুন-হত্যা-অত্যাচার করিয়াছে, তাহারাই আজ ক্ষমতাসীনদের তোষামোদি করিয়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ও চেয়ারে বসিয়া গিয়াছে। এখন যদি এমন পরিস্থিতি সৃষ্ট হয়, এই স্বাধীনতাবিরোধীরাই ভিতর কিংবা বাহির হইতে স্যাবোট্যাজ করিয়া বসে!
‘দুর্দিনের যাত্রী’ প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলাম লিখিয়াছেন—“বনানী-কুন্তলা ষোড়শী বনের বুক চিরে বেরিয়ে এসে পথ-হারা পথিককে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ?’ সেদিন দিশাহারা পথিকের মুখে উত্তর জোগায়নি। সুন্দরের আঘাতে পথিকের মুখে কথা ফোটেনি। পথিক সেদিন সত্যই পথ হারাইয়াছিল।” বঙ্কিমের কপালকুণ্ডলার কাহিনি হইতে কাজী নজরুল যেই প্রশ্ন তুলিয়াছেন, বিদ্রোহী কবির মতো আমাদের মনেও প্রশ্ন জাগিতেছে—‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?’
