মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

নগরবাসীর স্বাস্থ্য নিরাপত্তা

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২৪, ০৬:৩০

সময় যত যাচ্ছে, শহরমুখী জনস্রোত তত বাড়ছে। পরিবারের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রান্তিক পর্যায়ের বেশির ভাগ মানুষই এখন শহরমুখী। আর শহরকেন্দ্রিক অর্থনীতির ধারা চলমান থাকায় এ জনস্রোত বাড়ছেই। পরিসংখ্যান বলছে, এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ মানুষ শহরের বাসিন্দা হবে।

একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে যে, আলো ঝলমলে এসব শহরেই তারা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকছেন এবং তাদের অনেকেই অপুষ্টির শিকার। তাছাড়া এ শহরমুখী জনসংখ্যার বেশির ভাগই তাদের শিক্ষাজীবন অসম্পূর্ণ রেখেই শহরে পাড়ি জমিয়েছেন। তাদের সবচেয়ে বড় পুঁজি তাদের শারীরিক সামর্থ্য। কিন্তু অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং অসচেতনতার অভাবে তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। কাজেই, অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে শহরবাসীর মধ্যে যারা অসচ্ছল, শ্রমজীবী নারী-পুরুষ এবং তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্য যেমন শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা জরুরি। প্রশ্ন থাকে, এই জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যনিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে?

ব্যয়বহুল বেসরকারি ক্লিনিক এবং চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারের ভিড়ে দরিদ্র্রদের জন্য চিকিৎসা সেবা এখন বিলাসিতা, যার কারণে পাড়া-মহল্লার ওষুধের দোকানই তাদের ভরসা। সাময়িক সময়ের জন্য সুস্থ হওয়া গেলেও অপুষ্টি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকার দরুন কিছুদিন পর পুনরায় রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে থাকতে হয়। এভাবে শরীরের রোগনিরাময় ক্ষমতা কমে যেতে থাকে এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দেয়। পরে রোগের ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিত্সাব্যয়ও বৃদ্ধি পেতে থাকে।

১৯৭৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আলমা আতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার যে ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সর্বজনীন স্বীকৃত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বলতে আমরা বুঝি সহজলভ্য শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টির মান উন্নয়ন, পরিবার পরিকল্পনা, বয়ঃসন্ধিকালে স্বাস্থ্য পরিচর্যার উপকরণ, প্রতিষেধক টিকা, স্বল্প আঘাত ও সাধারণ অসুস্থতার চিকিত্সা, সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ এবং মহামারি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ যে কয়টি ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছে, তার মধ্যে গ্রামীণ পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা অন্যতম। তবে শহরাঞ্চলে স্বল্প আয়ের মানুষদের স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি দীর্ঘদিন ছিল অবহেলিত।

বর্তমান সরকার, তার আগের শাসনামলে ১৯৯৮ সালে বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে আরবান প্রাইমারি হেল্থ কেয়ার প্রজেক্ট শুরু করে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় স্থানীয় সরকার বিভাগের সরাসরি তত্ত্বাবধানে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০১২ সালে এর দ্বিতীয় পর্যায় শেষ করে কোনো বিরতি না রেখেই আরবান প্রাইমারি হেল্থ কেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রজেক্ট (ইউপিএইচসিএসডিপি) নামে বিস্তৃতি লাভ করে। বর্তমানে ইউপিএইচসিএসডিপি-এর দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটির অধীনে ১১টি সিটি করপোরেশন এবং ১৮টি পৌরসভা এলাকায় ৪৫টি মাতৃসদন, ১৬৭টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৩৩৪টি স্যাটেলাইট ক্লিনিকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শহরবাসী, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, মা ও শিশুদের স্বল্পমূল্যে উন্নত প্রাথমিক চিকিত্সা এবং রোগ প্রতিরোধী সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অতি দরিদ্রদের মধ্যে ২ লাখের বেশি (মার্চ, ২০২২ পর্যন্ত) লাল কার্ড বিতরণ করে তাদের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। সমীক্ষা অনুযায়ী দেশের শহরাঞ্চলের প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষ বর্তমানে এ প্রকল্পে সেবার আওতাভুক্ত।

ব্যয়বহুল চিকিত্সাকেন্দ্রের ভিড়ে শহরে বসবাসকারী দরিদ্র জনগোষ্ঠী কোথায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারেন, এমন প্রশ্নের জবাবে জানাতে চাই, ‘সেবার আলো সবার কাছে’ স্লোগানে উদ্দীপ্ত ইউপিএইচসিএসডিপিভুক্ত রংধনু চিহ্নিত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রয়েছে। এখন প্রকল্পের কার্যকারিতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে প্রয়োজন জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। এখানে উল্লেখ্য যে, ক্লিনিকে সাধারণ রোগীদের জন্য ডাক্তারের কনসাল্টেশন ফি ৫০ টাকা। নরমাল ডেলিভারি চার্জ ১ হাজার ২০০ টাকা এবং সিজারিয়ান ডেলিভারি চার্জ ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। পরিবার পরিকল্পনা সেবা ও শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ ফ্রি। এছাড়াও লাল কার্ডধারীদের চিকিত্সাসেবা বিনা পয়সায় প্রদান করা হয়।

প্রকল্পটি যে ঋণের টাকায় পরিচালিত হচ্ছে, জনগণের কর থেকেই তা পরিশোধিত হবে। সুতরাং, প্রকল্পের যে লক্ষ্য, শহরবাসী দরিদ্র জনগোষ্ঠী, মহিলা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবার কলেবর বৃদ্ধি এবং দক্ষ, মানসম্মত ও টেকসই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন, তা পূরণকল্পে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর প্রতি সুবিধাভোগী জনগণের মালিকানাবোধ থাকতে হবে।  মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর সামাজিক চাহিদা তৈরি হলে এর মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় রসদের সংস্থান হবে সামাজিকভাবেই। এক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা খুবই জরুরি। উল্লেখ্য, প্রকল্প এলাকায় জনপ্রতিনিধিদের নেতৃত্বে ওয়ার্ড আরবান হেল্থ কো-অর্ডিনেশন কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার কাজ হবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে দীর্ঘস্থায়ীকরণে নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং সেবাগ্রহণ ও প্রদানের চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে তার সমাধান করা। জনপ্রতিনিধি এবং সচেতন ব্যক্তিমাত্রই অবগত আছেন যে, স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে সমাজে জনভিত্তি মজবুত করা সম্ভব। তাদেরকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।

স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে একটি সুস্থ জাতি গঠন সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। কারণ, একটি সুস্থ জাতিই নিজেদের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়ন টেকসই রাখতে পারে।

লেখক : অতিরিক্ত সচিব ও প্রকল্প পরিচালক

আরবান প্রাইমারি হেলথ্ কেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রজেক্ট—২য় পর্যায়

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন