আমরা সুস্বাস্থ্যের কথা বলি। এই সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য সঠিক জীবনযাত্রার বিকল্প নেই। সঠিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে নিয়মমাফিক ঘুমাতে হবে, শরীরচর্চাটিও রাখতে হবে ঠিকঠাক। তবে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে খাওয়া-দাওয়ার দিকে। খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে অনিয়ম অনেকভাবে হয়। এসব অনিয়ম আমাদের শরীরে বিরূপ প্রভাব ফেলে। কারণ আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুষ্টিচাহিদার কথা বিবেচনা করি না। সময় অনুপাতে খাবার খাই না বলে খাবারে অনিয়ম হয় অনেক। পুষ্টি-চাহিদার কথাও ভাবনায় থাকে না।
রমজান মাসে সবার খাবারের দিকে এক ধরনের আগ্রহ থাকে। নিয়মটাও অনেকের মানা হয়ে যায়। তবে অনেকে যে পুরোপুরি নিয়ম মানেন সেটিও নয়। কিন্তু পুষ্টিবিদদের অনেকের মতে, রমজানে যেহেতু সময়টা মেনে চলা হয় তাই পুষ্টির দিকটা বাদে সময়টা অনেকাংশেই মানা হয়। রমজান শেষ হয়ে আসতে শুরু করেছে। এবার আসবে ঈদের প্রস্তুতি। ঈদের দিন আনন্দের দিন। তাই সবারই চিন্তা থাকে বাড়তি আনন্দের। এই বাড়তি আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে খাবারে বেশি জোর দিয়ে ফেলেন। খাবারে জোর দিতে গিয়ে এক ধরনের অনিয়ম হয়েই যায়।
ঈদের দিন খাবারে অনিয়মের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় লক্ষ করা যায়। অনেকেই পরিচিতদের বাড়ি ঘুরতে যান। বেশ কয়েকটি বাড়ি গেলে কিছু না কিছু খাবার খেতেই হয়। এই খাবার খাওয়ার ধুমে পড়তে গিয়ে বাড়তি ক্যালরি যুক্ত হয় শরীরে। এতে বিপাকে পড়ার আশঙ্কা থাকে বেশি। পুষ্টি চাহিদার কথা চিন্তা না করেই যখন আমরা খাবার খাই, তা একধরনের অনিয়মের মধ্যে পড়ে। ঈদের খাবারে পুষ্টিমানের কথা বিবেচনা করে খাওয়া উচিত। যদি তা না করা হয় তাহলে পেটে সমস্যা বাদেও অসুস্থতা হতে পারে। রোজার ঈদে এই সতর্কতা আরও বেশি জরুরি।
পুরো একমাস রোজা রাখার পর ঈদের দিন খাবারের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি সতর্ক হওয়া জরুরি। এজন্যই ভেবেচিন্তে তৈরি করে নিতে পারেন খাবারের মেনু। ঈদের দিনের প্রায় পুরো সময়েই থাকে খাবারের আয়োজন। খাবার যেমনই হোক না কেন, কম তেলে রান্না করতে হবে। মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত তেল খাবারের পুষ্টিমান কমাতে পারে। প্রথমেই বুঝতে হবে ঈদের সময় কেমন ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার খাবেন। ঈদের দিনে একজন সুস্থ মানুষ সকালে ২৫০ থেকে ৩০০ ক্যালরি খেতে পারেন। সকাল-দুপুরের মাঝে ১২০ থেকে ১৫০ ক্যালরি। দুপুরে ৪৫০ থেকে ৫০০ ও রাতে ৩৫০ ক্যালরির বেশি নয়।
এসব বিবেচনা করেই চলুন জেনে নেই কেমন হবে ঈদের দিনের খাবার:
সকালে আনন্দ শুরু
ঈদের দিন সকালে নামাজে যাওয়া মানেই হালকা ব্যায়াম। রাস্তায় অনেকের সঙ্গে দেখা হবে। কোলাকুলিতে কিছুটা অ্যাক্টিভিটি রয়েছে। হেঁটেই যাওয়াই ভালো। সকালে উঠে গোসল করে সেমাই খেয়ে নিন। তারপর বের হোন। আগের দিন পর্যন্ত রোজা রেখেছিলেন। তাই ঈদের সকালে একসঙ্গে অনেক খাবার খাওয়া ঠিক হবে না। সকালে ভারী নাস্তা এড়িয়ে চলাই ভালো। মুরগির তরকারি বা ডিম ভুনা রাখা যায়। সবচেয়ে ভালো হয় যদি সবজি রাখা যায়। খিচুড়ি বা ভুনা জাতীয় খাবারের পাশাপাশি মিষ্টি খাবারে থাকতে পারে সেমাই, পায়েস, ফিরনি বা পুডিং। একদম খালি পেটে দুধে তৈরি খাবার খাবেন না। তাতে অ্যাসিডিটি হতে পারে। পাশাপাশি দুটো খাবার না খেয়ে একটি খাবার খান। খেজুর বা ফলও খাওয়া যেতে পারে। সেটি বরং ভালো হবে বেশি।
দুপুরের মধ্যবর্তী সময়
ঈদের দিনে অনেক সকাল ও দুপুরের মাঝের সময়টাতে হালকা কিছু খেতে পছন্দ করেন। এখন বেশ গরম, তাই এ সময়ের সব থেকে পুষ্টিকর খাবার হলো তাজা ফল বা ফলের সালাদ। সারাদিনে বাইরে থাকা হয় বিধায় হাইড্রেটেড থাকা জরুরি। ফলের জুস, বেলের শরবত, ডাবের পানি খাওয়া যেতে পারে। শরীরে পানিস্বল্পতা তৈরি হবে না। এই সময়ে পানিস্বল্পতা এড়ানোর বিষয়ে বেশি মনোযোগী হওয়া জরুরি। কোক, স্প্রাইট বা অন্যান্য কোমল পানীয় একেবারেই এড়িয়ে যাওয়া উচিত। কারণ এসব কোমল পানীয় শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি করে। পানিশূন্যতা গরমে অনেক ধরনের শারীরিক সমস্যা তৈরি করে। দুপুরে মাংসের তরকারি খেলেও পোলাও বা বিরিয়ানি জাতীয় খাবার এড়ানোই ভালো। কারণ শরীরে ডিহাইড্রেশন হয় এমন খাবার এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয়।
দুপুরে ডিপ ফ্রাই খাবার খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। তবে বেক করা কাবাব বা গ্রিল করা মুরগি ভালো খাবার হবে। ঈদের দিনের একটি পরিচিত খাবার হলো রোস্ট। কিন্তু আমরা হয়তো জানি না এক মাস রোজা রাখার পর রোস্টজাতীয় খাবার গ্যাস্ট্রিকের মতো সমস্যা বাড়িয়ে তোলে। তাই রোস্টের বদলে কম তেলে রান্না মুরগির কোরমা রাখা যায়। কম মসলার চায়নিজ সবজি খুবই স্বাস্থ্যকর পদ। রান্না করা যেতে পারে সবজির কোরমা। কোমল পানীয়ের বদলে বোরহানি বা মাঠা শ্রেয়। থাকতে পারে টক দই। দুপুরের খাবার অন্তত স্বাস্থ্যকর রাখার ব্যাপারে বাড়তি মনোযোগ থাকা জরুরি।
বিকেলের খাবার
ঈদের দিন বিকেলটা আড্ডা বা ঘুরতে বেড়িয়েই কেটে যায়। এক্ষেত্রে সবসময় খেয়াল রাখা উচিত পেটে গোলমাল হবে না এমন খাবারে। সচরাচর ফুচকা, চটপটি বা ফাস্টফুডও খাওয়া যেতে পারে। তবে প্রচণ্ড ক্যালরি আছে এমন খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো। এসব খাবার খেলে রাতের খাবার খাওয়ার ব্যাপারে অনীহা জাগতে পারে।
রাতের হালকা খাবার
ঈদে দুপুরে ভারি খাবারটাই খাওয়া হবে বেশি। রাতে এমন খাবার তাই রাখতে হবে যা সহজেহজম হবে। ভাতের সঙ্গে অন্য খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে মাছ হতে পারে আদর্শ খাবার। মাছের ফিলে সয়া সস, লেবুর রস ও গোলমরিচ দিয়ে মেরিনেট করে রান্না করলে গতানুগতিক মশলাদার রান্না থেকে ভিন্ন হবে। মাছে প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিডও পাওয়া যাবে। রাতে ভুনা বা কষানো মাংস না খেয়ে স্টু করতে পারলে ভালো হয়। মাংস সচরাচর ভারি হলে একেবারেই খাওয়া যায় না। অনেক সময় খাবার নষ্ট হয়। ভুনার থেকে স্টু রান্না করার পদ্ধতিটি একটু ভিন্ন হয়ে থাকে। মাংস প্রথমে গোলমরিচ, লেবুর রস ও লবণ দিয়ে পানিতে সেদ্ধ করতে হয়। তারপর কিছু সবজি হালকা তেলে ভেজে সেদ্ধ মাংসে ছেড়ে বিট লবণ ও গোলমরিচ দিয়ে দিতে হয়। স্টু অনেকটা স্যুপজাতীয় খাবার যা রাতের জন্য খুবই স্বাস্থ্যসম্মত ও উপাদেয়। বেক করা সল্ট রোস্টেড চিকেন ক্ষতিকর ক্যালরি ও ফ্যাট থেকে কিছুটা রক্ষা করে। এভাবে ঈদের পরেরদিন পর্যন্ত পেট ভারী লাগার মতো সমস্যা আর থাকে না।
শিশুদের জন্য
শিশুদের ক্ষেত্রে তেমন বাধানিষেধ থাকে না। তাদের জন্য এই আনন্দের আয়োজন হয় অন্যরকম। কিন্তু বেশি চিনি, বেকারির খাবার, কোমল পানীয় যাতে মাত্রা ছাড়া না খায়, সেদিকে মনোযোগ রাখা জরুরি।
ড. নাজমা শাহীন, অধ্যাপক, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঈদের আগের দিনের প্রস্তুতি