রোববার, ২৬ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

হবিগঞ্জে পাঁচ দশকে নদীর সংখ্যা অর্ধেকে নেমেছে

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৪০

নদীর উজানে ব্যারেজ, বাঁধ নির্মাণ, পলি পড়া, অবৈধ দখল, শিল্পদূষণসহ নানা কারণে হবিগঞ্জের নদনদীগুলো এখন অস্তিত্ব সংকটে। গত পাঁচ দশকে নদীর সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। হারিয়ে গেছে অনেক নদী। খরস্রোতা নদীগুলো হারিয়েছে স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও নাব্য।

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যালয়ে জেলায় নদীর সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ জানান, বর্তমানে জেলায় প্রায় ২৫টি নদীর তথ্য পাওয়া যায়। যদিও জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেশের ১ হাজার আটটি নদনদীর তালিকা প্রকাশ করেছে। এতে হবিগঞ্জ জেলায় ৪৩টি নদীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

জানা যায়, হবিগঞ্জ শহরকে খোয়াই নদীর গ্রাস থেকে রক্ষাকল্পে ১৯৭৭-১৯৭৮ সালে স্বেচ্ছাশ্রমে মাছুলিয়া থেকে রামপুর পর্যন্ত তিন কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁককাটা (লুপকাটিং) প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। এতে খোয়াই নদী শহর থেকে পূর্ব দিকে সরে যাওয়ার পর নদীর পুরাতন অংশে শুরু হয় অবৈধ দখল ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা নির্মাণ। দীর্ঘদিনও এ সকল অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ কার্যক্রম সফল হয়নি। পরবর্তীকালে বৃহত্তর খোয়াই নদী প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও নদীটির স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরে আসেনি। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সুতাং নদী শিল্পদূষণে দৈন্যদশাগ্রস্ত। নদী তীরের মানুষ এখন চরম বিপাকে। মাধবপুর উপজেলার সোনাই নদীতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য পড়ে পানি দূষিত হচ্ছে। এই দূষিত পানি খাস্টি নদী হয়ে চলে যাচ্ছে মেঘনা নদীতে। নদীগুলো সময়মতো খনন না করা, নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন করায় করাঙ্গী, বিজনা, ভেড়া মোহনা, বিবিয়ানা, সুটকি, শাখাবরাক, বছিরা, হাঙ্গর ভাঙা নদীতেও পানির প্রবাহ কমে গেছে। বিঘ্নিত হচ্ছে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ও সেচকাজ।

নবীগঞ্জ উপজেলার দিনারপুর কলেজের অধ্যক্ষ ও রিভার উইংস, নবীগঞ্জের আহ্বায়ক তনুজ রায় বলেন, দখলদূষণের কারণে নবীগঞ্জ উপজেলার নদীগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। তিনি বলেন, বিভিন্ন নদীকে প্রকল্পের নামে খাল বানানো হচ্ছে। মাধবপুর উপজেলার পরিবেশ কর্মী আব্দুল কাইয়ুম বলেন, স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ না থাকা ও শিল্পদূষণের কারণে মাধবপুর উপজেলায় অনেক নদী অস্তিত্ব সংকটে।

জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল হাসান শরীফ বলেন, এক সময় খোয়াই নদী দিয়ে বড় বড় মালবাহী নৌকা ও লঞ্চ চলাচল করত। কিন্তু জেলার প্রধান এই নদী তার খরস্রোতা রূপ হারিয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ১৯৭১ সালে জেলায় ৭০টি নদনদীর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। গত পাঁচ দশকে এই সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। বর্তমানে এগুলোও সংকটাপন্ন। জেলা বাপা সভাপতি অধ্যক্ষ ইকরামুল ওয়াদুদ বলেন, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য নদী রক্ষার বিকল্প নেই।

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ জানান, জেলার নদীগুলোর নাব্য ও পানির ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে সেচ সুবিধা ও নৌ যোগাযোগ অব্যাহত রাখার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ৫৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেজিংসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। চলতি মৌসুমে সোনাই, করাঙ্গী, খাসটি এবং বিজনা নদী আংশিকভাবে পুনঃখনন করা হয়েছে। প্রকল্পের অধীনে কুশিয়ারা নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ অব্যাহত রয়েছে। ৭ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের সংশোধিত কাজ হিলাল নগর-মার্কুলী বাজার-দিগলবাক পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হবে। এছাড়াও বাঁধ নির্মাণের ফলে বিবিয়ানা পাওয়া প্ল্যান্ট এলাকা নদীভাঙন থেকে রক্ষা পাবে।

তিনি আরো জানান, ১ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষ খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ, ড্রেজিং এবং বাঁধ পুনরাকৃতিকরণসহ একটি বড় পরিকল্পনার প্রস্তাবনা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ দল প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ইত্তেফাক/এসটিএম