মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

বেড়েছে ধান উৎপাদন, রোদ যেন চাষিদের আশির্বাদ

আপডেট : ১১ মে ২০২৪, ১৯:২৯

চলতি বোরো মওসুমে ধানে বাম্পার ফলন হয়েছে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর কিছুটা লাভের মুখ দেখছেন কৃষক। সব মিলিয়ে রাজশাহী-বগুড়া অঞ্চলের ধানচাষিদের জন্য এপ্রিলের রোদ আশির্বাদ বয়ে এনেছে।

কৃষি অধিদপ্তর বলছে, এ অঞ্চলে কালবৈশাখী এবং শিলাবৃষ্টি না হওয়ায় ধানের কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে এপ্রিল মাসজুড়ে তীব্র তাপ বয়ে যাওয়ায় কিছুটা সেচ সংকট হলেও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বিঘায় ধানের ফলন হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ মণ হারে। চলতি বোরো মওসুমে রাজশাহী অঞ্চলে ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৩০ এবং বগুড়া অঞ্চলে ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৩৩৭ হেক্টর জমির ধান কাটতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক। মঙ্গলবার পর্যন্ত রাজশাহী অঞ্চলে ২৪ এবং বগুড়া অঞ্চলে ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।

কৃষি অধিদপ্তরের রাজশাহী ও বগুড়া আঞ্চলিক অফিসের তথ্য মতে, ধান চাষের ক্ষেত্রে ২০১৫ সাল থেকে ২৪ পর্যন্ত উত্তরাঞ্চলের পাবনা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ এবং জয়পুরহাট জেলায় ২৩ হাজার ৯৪৮ হেক্টর ধানি জমি বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন বেড়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯৭০ মেট্রিক টন। এ ছাড়া ২০১৪ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত রাজশাহী অঞ্চলে ১ হাজার ৭৬২ হেক্টর জমিতে ধান চাষ বাড়ায় উৎপাদন বেড়েছে ২ লাখ ৯ হাজার ১৫৭ মেট্রিক টন।

এ অঞ্চলের কৃষকরা জানিয়েছেন, চলতি মওসুমে প্রতি বিঘায় বোরো ধান রোপন থেকে গোলায় তোলা পর্যন্ত কৃষকের সার্বিক খরচ হয়েছে ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকা। এরমধ্যে জমি প্রস্তুতে ২ হাজার, রোপন খরচ ১ হাজার ৫শ, সার-কীটনাশক ও নিড়ানী মিলে ১২ হাজার, সেচ খরচ ২ হাজার ৫শ এবং ধান কাটা বাবদ ৪ হাজার ৫শ টাকা ব্যয় করেছেন কৃষক। তবে জমি লীজ নিয়ে ধানের আবাদ করলে সেই খরচ বেড়েছে আরও সাড়ে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজা টাকার মতো।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ধানের এই উঠতি সময়ে আঞ্চলিক হাট-বাজারে কৃষক মণপ্রতি ধানের দাম পাচ্ছেন ৯৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ২শ টাকা পর্যন্ত। সে হিসেবে খুব ভালো ফলন ফলালে চলতি মওসুমে বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ উঠে লাভের সম্ভাবনা রয়েছে ২ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া খড় বিক্রি বাবদ বিঘায় আসবে ন্যূনতম ৬ হাজার টাকার মতো।
   
কৃষি অধিদপ্তরের রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বোরো মওসুমে এই অঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৩০ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয়সহ মোট ৯৬ জাতের ধানের আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহী জেলায় ৭০ হাজার ২০০, নওগাঁয় ১ লাখ ৯২ হাজার ৯২০,  নাটোরে ৬০ হাজার ৯৭৫ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫১ হাজার ৯৩৫ হেক্টরে আবাদ হয়েছে। এই মওসুমে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ লাখ ৫৯ হাজার ৮২০ মেট্রিকটন। এ ছাড়া বগুড়া অঞ্চলে চলতি মওসুমে ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৩৩৭ হেক্টর আবাদের মধ্যে পাবনায় ৫৬ হাজার ৮৩২, সিরাজগঞ্জে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭৫০, বগুড়ায় ১ লাখ ৮৭ হাজার ১৫০ এবং জয়পুরহাট জেলায় ৬৯ হাজার ৬০৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৯ লাখ ৪৭ হাজার ২৪৯ মেট্রিক টন।

কৃষি অধিদপ্তরের বাজার সংযোগ বিভাগের তথ্য মতে, গত ১০ বছরে গড়ে ধানের দাম বেড়েছে ৪৭৩ থেকে ৫৭৪ টাকা পর্যন্ত। তাদের হিসেব মতে, ২১-২২ মওসুমে সরু ধান ১২০৪, মাঝারি ১০৫৯, মোটা ৯৬৮, ২০-২১ মওসুমে কৃষক ধানের দাম পেয়েছে ১২৩২ থেকে মাঝারি ১১৩৬ মোটা ১০৫১ টাকা, ১৯-২০ মওসুমে তিন জাতের ধান ৬৩৮ থেকে ৮৯৬ টাকা, ১৮-১৯ মওসুমে ৬৬৩ থেকে ৭০৩ এবং ৮২৮ টাকা, ১৭-১৮ মওসুমে ৯১৩ থেকে ১০৩৬, ১১৩৫ টাকা, ১৬-১৭ মওসুমে ৭৮২ থেকে ৮৬২ এবং ৮৯০টাকা, ১৫-১৬ মওসুমে ৫৪৯ থেকে ৬৬২ এবং ৬৭৭ টাকা, ১৪-১৫ মওসুমে মোটা ৬৭৪, মাঝারি ৭১৭ এবং সরু ধানের মণপ্রতি ৭৮২ টাকা দাম পেয়েছে কৃষক।

বগুড়ার শেরপুরের কৃষক আবুল হোসেন, তফিজ মিয়া, শফিকুল ইসলামসহ এই অঞ্চলের অন্তত ৫০ জন কৃষক ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, এবছর নিজের জমিতে একবিঘা ধান চাষ করতে খরচ হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। বর্গা চাষিদের আরও ৫ হাজার টাকা বেশি খরচ হয়েছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ধানের ফলনও হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ মণহারে। ধানের বাজার মূল্য ১২শ থেকে ১৫শ টাকা বাড়লে এই মওসুমের ধানে তারা লাভবান হবেন।

রাজশাহী অঞ্চলের কৃষক আনিসুর, বিল্লাল শেখ, ফজুলল মোল্লাসহ অন্তত ২০ জন কৃষক জানালেন, প্রতি বছর লাখ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন করছেন তারা। বাজার দরের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এ বছর ধানে তারা লাভবান হবেন।

কৃষি অধিদপ্তরের রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সামসুল ওয়াদুদ ইত্তেফাককে বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চলতি মওসুমে লক্ষ্য মাত্রার তুলনায় ধান উৎপাদন বেশি হওয়ার আশা তার। তা ছাড়া উচ্চ ফলনশীল জাতের ধানের ফলন হয়েছে বিঘায় ৩০ মণহারে। বর্তমান বাজার দরও ভালো। কৃষকরা সময় মতো ধান ঘরে তুলতে পারলে স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ভালো দামে বিক্রিও করতে পারবেন।

ইত্তেফাক/পিও