শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

উন্নয়ন দলিলে শিল্পায়ন

আপডেট : ২৩ মে ২০২৪, ০৪:৩০

উন্নত দেশ মানেই শিল্পোন্নত দেশ। বিশ্বে যেসব দেশ উন্নয়নের চরম শিখরে উঠেছে, তারা শিল্পায়নের পথ ধরেই উন্নত হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ইন্সটিটিউট কর্তৃক মে ২০১৬-এ প্রকাশিত ৫৭৩ নম্বর গবেষণাপত্রে আমরা পাই, ‘No country has become a major economy without becoming an industrial power’। জাতির পিতার স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ অর্জনের পথে ২০৪১ সালের মধ্যের উন্নত দেশে উত্তরণের লক্ষ্যে নির্ধারণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনের পথে বাংলাদেশকে পাড়ি দিতে হবে শিল্পায়নের বন্ধুর সিঁড়ি।

শিল্পায়নে বাংলাদেশের আগামী দিনে করণীয় এবং চ্যালেঞ্জসমূহ বুঝতে হলে আমাদের চোখ রাখতে হবে সরকারের উন্নয়ন দলিলসমূহে। কারণ সরকার উন্নয়ন দলিলে বিধৃত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার অর্জনের প্রয়াস নিয়ে থাকে। বর্তমানে গৃহীত উন্নয়ন দলিলসমূহের মধ্যে রয়েছে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, রূপকল্প ২০৪১, ডেল্টা প্লান ২১০০, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহার-২০২৪ ইত্যাদি। শুরুতেই বাংলাদেশ আওয়ামী-লীগের নির্বাচনি ইশতেহার-২০২৪-এ চোখ বোলানো যাক। দেশি-বিদেশি চক্রান্ত ও মিথ্যাচার উপেক্ষা করে গত ৭ জানুয়ারি, ২০২৪ তারিখ নির্বিঘ্নে হয়ে গেল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা চতুর্থ বারের মতো সরকারপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঘোষণা করেছে জনগণকে দেওয়া তাদের অঙ্গীকার, নির্বাচনি ইশতেহার, ২০২৪।

এবারের ইশতেহারের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ :উন্নয়ন দৃশ্যমান, বাড়বে এবার কর্মসংস্থান’। নির্বাচনি ইশতেহার কেবল দলভুক্ত রাজনীতিবিদের চর্চার বিষয় নয়। আমরা যারা অরাজনীতিবিদ, কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের তত্ত্বাবধানে সরকারি কর্মে নিযুক্ত অথবা রাজনৈতিক নিরপেক্ষ একান্ত সাধারণ জনতা, তারাও জানার চেষ্টা করি শিল্পায়ন নিয়ে বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার। ইশতেহারের ‘৩.৩ অর্থনীতি’ অধ্যায়ের ‘চ) শিল্প উন্নয়ন’ উপঅধ্যায়ে ‘দেশের শ্রমশক্তিতে প্রতি বছর নতুন যুক্ত হওয়া ২০ লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এটি অর্জনে আমরা ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছি। নতুন নতুন শিল্প স্থাপন করে আমরা শিল্প খাতের বিকাশ ঘটাব’—এরূপ অঙ্গীকার করা আছে। আগামী পাঁচ বছর সরকার এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকবে।

‘রূপকল্প ২০৪১’ বাংলাদেশের এক পরম কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন দলিল। এই দলিলে জাতির পিতার ‘স্বপ্নের সোনার বাংলা’ গড়ার প্রত্যয়ে শিল্প খাতকে বিশেষ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ‘রূপকল্প ২০৪১’-এর ‘নির্বাহী সারসংক্ষেপ’ অংশে ‘শিল্পায়ন ও বাণিজ্যের সঙ্গে ত্বরান্বিত প্রবৃদ্ধি’ শিরোনামে শিল্পায়নের গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আমাদের প্রতিযোগ-দক্ষতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে উন্নত আয় ও মানসম্মত কর্ম-সৃজনে বহির্মুখী শিল্পায়নেই রয়েছে বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। এখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে শিল্পায়নের সমানুপাতিক সম্পর্ক নিয়ে নিকোলাস কালডোর বহুল চর্চিত সূত্র Kaldor’s first law of growth স্মরণ করা যেতে পারে।

শিল্পায়নে উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে চলমান অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় গৃহীত কর্মসূচিতে শিল্প খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পঞ্চবার্ষিকীর ‘বাণিজ্যনীতি ও শিল্পায়ন’ শীর্ষক অধ্যায়ে বাংলাদেশের শিল্পনীতির মূল লক্ষ্যসমূহকে ‘আমদানি বিকল্প শিল্প উন্নয়ন’ এবং ‘রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন’—এই দুটো ধারায় বর্ণিত হয়েছে। মুশকিল হলো, প্রণোদনা প্রদানের ক্ষেত্রে এই দুই ধারার শিল্পনীতির একই সঙ্গে ‘সম্পূরক ও দ্বান্দ্বিক’ সম্পর্ক বিরাজমান। দ্বান্দ্বিক এই শিল্পনীতির দ্বন্দ্বে রপ্তানি বৃদ্ধির সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে আমদানিনির্ভরশীলতা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মোতাবেক ২০১৩-১৪ অর্থ বছর ২২.৬২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানির বিপরীতে আমদানি হয়েছে ৩১.৫৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাণিজ্যঘাটতি ছিল ৮.৯৫৪ বিলিয়ন ডলার।

এক দশক পর ২০২২-২৩ অর্থ বছর বাণিজ্যঘাটতি বেড়ে হয়েছে ৩৬.৪৬০ বিলিয়ন ডলার; ৫৭.৩১৬ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির বিপরীতে আমদানি করতে হয়েছে ৯৩.৭৭৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাণিজ্যঘাটতি বেড়েই চলছে, এক দশকে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় চার গুণ। রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের প্রসার ঘটিয়ে বাণিজ্যঘাটতি কমিয়ে আনাই হবে আগামী দিনে শিল্পায়নের চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তির শিল্প স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করে গেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সোয়া শত বছর আগে ‘সাধনা’ পত্রিকার মার্চ ১৯০১ সংখ্যায় ‘বাঙালির কাপড়ের কারখানা ও হাতের তাঁত’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘আজকের দিনের পৃথিবীতে যারা সক্ষম, তারা যন্ত্রশক্তিতে শক্তিমান। ...বাংলাদেশেও একদিন বিষম ব্যর্থতার তাড়নায় ‘বঙ্গলক্ষ্মী’ নাম নিয়ে কাপড়ের কল দেখা দিয়েছিল। সাংঘাতিক মার খেয়েও আজও সে বেঁচে আছে। তারপর দেখা দিল ‘মোহিনী’ মিল; একে একে আরো কয়েকটি কারখানা মাথা তুলেছে।...এদের যেমন করে হোক, রক্ষা করতে হবে.—বাঙালির ওপর এই দায় রয়েছে।’

বাঙালির ওপর অর্পিত সব দায় মেটানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ অঞ্চলের শিল্পায়ন আজকের এ অবস্থানে আসার পেছনে রয়েছে জাতির পিতার সুদীর্ঘ সংগ্রামী ইতিহাস।  ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৫৬ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলে জাতির পিতাকে দেওয়া হয়েছিল শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতিরোধ এবং গ্রামীণ সহায়তা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। যদিও পরে দলের জন্য সম্পূর্ণ সময় ব্যয় করার তাগিদে ১৯৫৭ সালে ৩০ মে তিনি মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে প্রথমেই তিনি এ অঞ্চলের  শিল্প বিকাশে মনোনিবেশ করেন। ২১ নভেম্বর ১৯৫৬ তারিখে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের বরাতে জাতির পিতাকে পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য ন্যায্য আদায়ের সপক্ষে ‘যে ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তান দ্রুত উন্নতি ক্রিয়া চলিয়াছে এবং শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে পৌঁছিয়াছে, তখন পূর্ব পাকিস্তান শিল্পায়িতকরণের প্রথম পর্যায়েও পৌঁছায় নাই’—এরূপ যৌক্তিক দাবি উত্থাপন করতে দেখা যায়।

স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমরা এই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে সোনার দেশে পরিণত করব। ...তোমরা কলে-কারখানায়, ক্ষেতে খামারে উত্পাদন বাড়াও। আমরা অবশ্যই পরিশ্রম করে দেশকে গড়ে তুলবো।’ সদ্য স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প বিকাশের ধারা বেছে নিয়েছিলেন। তিনি পাকিস্তানি মালিকদের ছেড়ে যাওয়া সমস্ত ব্যাংক, বীমা, পাটকল, চিনিকল, বস্ত্র কারখানা জাতীয়করণ করেছিলেন। পাকিস্তানি মালিকেরা তাদের প্রতিষ্ঠান পরিত্যাগ করে চলে গেলে যে অর্থনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা পূরণের জন্য তিনি এসব প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করেন। উপরন্তু তিনি সারা জীবন সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে ছিলেন। তাই তিনি সরকারি এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষের পক্ষে রাষ্ট্রের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিপরীত দিকে তার সরকারের আমলে ১৩৩টি পরিত্যক্ত শিল্প ইউনিট ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরিত হয়। সুতরাং এটি স্পষ্ট যে, তার সরকারের আমলেই বেসরকারি শিল্পায়ন প্রসারের উদ্দেশ্যে শিল্পের বিরাষ্ট্রীয়করণ-প্রক্রিয়া সূচিত হয়। শিল্পোন্নয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৭৩ সালের ৮ জানুয়ারি প্রণীত হয় Industrial Investment Policy 1973। এটিই মূলত এদেশের শিল্পোন্নয়নের প্রথম পরিকল্পনা দলিল।

জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃঢ় নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনায় শিল্পমন্ত্রণালয় ও তার আওতাধীন দপ্তর/সংস্থাসমূহ নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। দেশব্যাপী পরিবেশবান্ধব শিল্পের দ্রুত বিকাশ, অভ্যন্তরীণ সম্পদের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, শিল্প খাতে উদ্ভাবন ও গবেষণা জোরদারকরণ, দেশীয় প্রযুক্তির প্রসার, বিনিয়োগ ত্বরান্বিতকরণ, দক্ষ জনশক্তি ও উদ্যোক্তা তৈরি, বেসরকারি শিল্প খাতে প্রণোদনা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানাসমূহে লোকসান হ্রাসকরণ ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর, ক্ষুদ্র, কুটির ও গ্রামীণ শিল্পের বিকাশ, খাতভিত্তিক উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি, স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে শিল্পমন্ত্রণালয় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ প্রেক্ষিতে শিল্পমন্ত্রণালয়ের ভিশন হিসেবে আমরা পাই, ‘উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ বিনির্মাণে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন’।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব আর সাহসী উন্নয়ন-কৌশল বাস্তবায়নের ফলে বিগত দিনগুলোতে বাংলাদেশ সাক্ষী হয়েছে দুর্দান্ত সব অর্জনের। তার সুদৃঢ় নেতৃত্বে সামগ্রিকভাবে দেশ প্রস্তুত হয়েছে শিল্পোন্নত দেশে উত্তীর্ণ হওয়ার জয়যাত্রায়। সব সমালোচনা, দেশি-বিদেশি অপপ্রচার আর চক্রান্তের বিপরীতে উন্নয়নের মহাসড়কে ‘দাবায়া রাখতে পারবা না’র বাংলাদেশের এ অদম্য অভিযাত্রায় শিল্পায়ন হবে উন্নয়নের প্রধানতম হাতিয়ার, এ আমাদের দৃঢ়প্রত্যয়।

লেখক :পরিচালক, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন