মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ঘূর্ণিঝড় রেমাল

বাঁধে ভাঙন,বহু গ্রাম প্লাবিত

আপডেট : ২৭ মে ২০২৪, ০০:৫৫

সাইক্লোন ‘রেমাল’ আঘাত হানার আগেই উপকূলীয় জেলাসমূহের নিম্নাঞ্চলের বহু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বাঁধ ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষেতের ফসল। নিরাপত্তাজনিত কারণে মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দরে কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। পানিবন্দি অবস্থায় বহু মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। কুয়াকাটায় জোয়ারের পানিতে ভেসে গিয়ে শরীফুল ইসলাম নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে লোকজনকে সাইক্লোন শেল্টারসহ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে গতকাল সন্ধ্যার দিকে স্থানীয় একটি আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শওকত মোড়ল (৫৫) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকাসমূহ থেকে ইত্তেফাকের প্রতনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর: 

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) :বঙ্গোপসারে ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে সাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে। সকাল থেকে ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে  মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হয়। উচ্চ জোয়ারের পানিতে ভেসে গিয়ে গতকাল দুপুরে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধূলাসর ইউনিয়নের কাউয়ারচর এলাকায় শরীফুল ইসলাম (২৪) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়। ঘটনার শিকার শরীফুল কলাপাড়া উপজেলার অনন্তপাড়া গ্রামের আবদুর রহিমের ছেলে। কুয়াকাটা সৈকতসংলগ্ন কাউয়ারচর এলাকায় শরীফুল ইসলামের ফুপু মাতোয়ারা বেগম বসবাস করেন। ঐ বাড়িতে তার বোনও ছিলেন। জোয়ারের সময় পানি বেড়ে যাওয়ায় দুপুরের দিকে শরীফুল লোকজন নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য ফুপুর বাড়িতে রওনা দেন। এ সময় সাগরের জোয়ারের কারণে প্লাবিত এলাকা কাউয়ারচর দিয়ে সাঁতার কেটে ফুপুর বাড়িতে যাওয়ার সময় ঢেউয়ের তোড়ে শরীফুল ভেসে যান। ঘণ্টাখানেক পর ঐ স্থান থেকেই শরীফুলের লাশ উদ্ধার করে স্থানীয় লোকজন।

পাথরঘাটা (বরগুনা) : পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পাথরঘাটা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ১৫টির মতো গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় চরম বিপাকে পড়েছে এসব এলাকার হাজার হাজার মানুষ। বসতবাড়ি ও চুলা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার কারণে রান্না করতে পারেনি এসব এলাকার বাসিন্দারা। পাথরঘাটা সদর ইউনিয়নের জিনতলা এলাকার বাসিন্দা মো. মজিবর জানান, তার এলাকায় জোয়ারের চাপে বেড়িবাঁধের বাইরে দুই শতাধিক পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। এদিকে অতিরিক্ত জোয়ারের কারণে বরগুনার বাইনচটকি, বড়ইতলা ও পুরাকাটা ফেরিঘাটের সংযোগ সড়কসহ গ্যাংওয়ে তলিয়ে ফেরি চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। সরজমিনে গিয়ে বিকাল ৫টার দিকে দেখা যায়, বিষখালী নদীর তীরবর্তী হরিণঘাটা, জিনতলা এলাকার শতাধিক ঘরবাড়ি পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে।

আমতলী (বরগুনা) : ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে রবিবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন পায়রা নদীতে স্বাভাবিত জোয়ারের চেয়ে চার-পাঁচ ফুট পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় আমতলীর আরপাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের বালিয়াতলী  বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে  জোয়ারের পানি ভেতরে প্রবেশ করে দুই গ্রামসহ আমতলী ও তালতলীর বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরে আরো ২৭ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানির তোরে ভেসে গেছে শত শত পুকুরের কোটি টাকার মাছ। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। ইতিমধ্যে দুর্যোগ আতঙ্কে আমতলী তালতলী উপজেলার ২৫৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। বন্ধ রয়েছে আমতলী-বরগুনা রুটের ফেরি চলাচল। ভেসে গেছে বোরো ধানের খেত। পশুরবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে দায়সারাভাবে বাঁধ নির্মাণ করায় এখন পানির তোড়ে বাঁধ ভেঙে মানুষের কোটি কোটি টাকার বোরো, আউশ এবং পুকুর ও ঘেরের মাছ ভেসে গেছে। রবিবার দুপুরে সরেজমিন ফেরিঘাট, বৈঠাকাটা ও লঞ্চঘাট বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জেলেপল্লির ঘরগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে, সেখানে বেসরকারি সংগঠন এনএস, ওয়ার্ল্ড ভিশন, সিপিপি স্বেচ্ছাসেবকরা স্থানীয় বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার জন্য কাজ করাসহ ঘূর্ণিঝড়ের বার্তা প্রচার করছে।

বরিশাল :ঘূর্ণিঝড় রেমেলের প্রভাবে বরিশাল নগরীর নিম্নাঞ্চলসহ গুরুত্বপূর্ণ একাধিক সড়ক প্লাবিত হয়েছে। এ কারণে পানিবন্দি অবস্থায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে নগরীর অসংখ্য মানুষ। তাছাড়া নগরীর বেশ কিছু প্রধান সড়কে নদীর পানি উঠে যাওয়ায় পথচারীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। সরেজমিন দেখা যায়, নগরীর রূপতলীর জিয়ানগর, খ্রিষ্টানপাড়া, পলাশপুর, বেলতলা, মোহাম্মদপুর, রসুলপুর, দক্ষিণ রূপাতলী, ভাটিখানা, কাউনিয়া, প্যারারা রোড, সদর রোড, কেডিসি, ত্রিশ গোডাউন, দপদপিয়া, কালিজিরা এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার বাসিন্দাদের ঘরে পানি উঠে যাওয়ায় তারা ঘরবন্দি রয়েছে। এসব এলাকার গুরুত্বপূর্ণ একাধিক সড়ক চলে গেছে পানির নিচে। বরিশাল নগরীর রসুলপুরের বাসিন্দা আবদুর রহমান বলেন, ঝড় শুরুর আগেই নদীর পানি ঘরে উঠে গেছে।

ভোলা :ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে প্রবল বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে জোয়ারে প্লাবিত হয় ভোলার সদরের ধনিয়া, নাছির মাঝি, রাজাপুর, শিবপুর, চটকিমারার চর, চরফ্যাশন উপজেলার ঢালচর, কুকরী-মুকরি ও চর পাতিলা, দৌলতখানের সৈয়দপুরসহ মনপুরার বেশ কিছু নিচু এলাকা। জেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৫ হাজার পরিবার। জোয়ারের পানিতে ঢালচরসহ নিম্নাঞ্চলের  ঘরবাড়ি ধসেপড়ার খবর পাওয়া গেছে।

সাতক্ষীরা :ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে অনেক বসতবাড়ি। রবিবার দুপুরে স্বাভাবিকের তুলনায় পানির উচ্চতা বৃদ্ধি হলে উপজেলার কলবাড়ি জেলেপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান হাজি নজরুল ইসলাম। ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় রবিবার ভোর রাত থেকেই শুরু হয় বৃষ্টি।

পিরোজপুর :ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে উত্কণ্ঠিত হয়ে পড়ে ইন্দুরকানীর নদীপাড়ের বাসিন্দারা। যতই বেলা বাড়তে থাকে, ততই নদীর পানি ফুলে ফেঁপে লোকালয়ে প্রবেশ করা শুরু করে। তলিয়ে যায় কৃষিখেত ও বসতবাড়ি। রবিবার সকাল থেকেই প্রবল ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে দমকা হাওয়া ও বৃষ্টি শুরু হয় ইন্দুরকানীতে। আতঙ্কিত হয়ে লোকজন ছুটে যায় নিরাপদ আশ্রয়ে। উপজেলার নদী তীরবর্তী অধিকাংশ এলাকায় বেড়িবাঁধ না থাকায় চরম সংকটে পড়েছে ঐ এলাকার বাসিন্দারা। বেড়িবাঁধ না থাকায় জোয়ারের অতিরিক্ত পানিতে প্লাবিত হওয়ায় ইন্দুরকানীর চাড়াখালী, পাড়েরহাট, কলারন, কাজিকান্দা, কালাইয়া ও সাঈদখালী আবাসনের অধিকাংশ ঘরেই রান্না হয়নি। তাদের রান্নার চুলাও পানিতে ডুবে গিয়েছে।

মোংলা (বাগেরহাট) :মোংলায় রেমাল আঘাত হানার আগেই বন্দরে অবস্থানরত সব বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্য ওঠানামা ও পরিবহনের কাজসহ অপারেশনাল কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। সব জাহাজকে নিরাপদ স্থানে নোঙর করে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম :ঘূর্ণিঝড় রেমাল আঘাত হানার আগেই চট্টগ্রাম বন্দরে নিজস্ব সতর্কতা সংকেত অ্যালার্ট-৪ জারি করে সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক জানান, আবহাওয়া অফিস ৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত জারির পর বন্দরের সর্বোচ্চ সতর্কসংকেত অ্যালার্ট-৪ জারি করা হয়। সতর্কতার অংশ হিসেবে জেটিতে থাকা ১৩টি জাহাজকে ইতিমধ্যে বহির্নোঙরে পাঠানো হয়েছে। 

ইত্তেফাক/এনএন