সম্প্রতি সাজেকে বেড়াতে গিয়ে আমাদের নৈসর্গিক পার্বত্য অঞ্চলে কাঠ, বাঁশ, ছন বা প্রাকৃতিক উপকরণে নির্মিত পর্যটনকেন্দ্রের আধিক্য লক্ষ করেছি। বিশেষ করে রিসোর্ট সেন্টার, কটেজ, রেস্টুরেন্ট বা সরাইখানাসহ পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষেত্রে এমনটি বেশি পরিলক্ষিত হয়। পর্যটনশিল্পের ক্রমবিকাশের ধারাবাহিকতায় এটা ইতিবাচক বটে। তবে সাজেকের অভিজ্ঞতার নিরিখে একজন স্থপতি হিসেবে পর্যটন স্পটগুলোর নির্মাণমান বা সার্বিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বিষয়ে পর্যালোচনার অবকাশ রয়েছে বলে মনে করি।
সাজেকে যা দেখেছি, দু-একটি বাদে এ অঞ্চলে নির্মিত পর্যটনকেন্দ্রগুলো মূলত কাঠ বা বাঁশের তৈরি, যার ছাদ নির্মিত হয়েছে ছন বা টিন দিয়ে। পরিবেশবান্ধবতার নামে এবং পর্যটকদের প্রকৃতির স্বাদ দিতে এসব তৈরি করা হলেও মূলত দ্রুততম সময়ে এবং নির্মাণের খরচ ও ঝক্কি কমাতেই উদ্যোক্তারা প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে এসব রিসোর্ট বানাচ্ছেন। এখানে নেই কোনো মান নিয়ন্ত্রণের বালাই! এ ধরনের পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণে যে দক্ষতা, পূর্বসতর্কতা ও স্থাপত্য প্রযুক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন, সেসবের অনেক কিছুই আমলে না নিয়েই অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনাগুলো নির্মিত হচ্ছে।
গভীর বিস্ময়ে লক্ষ করি, এখানকার বৈদ্যুতিক ওয়্যারিংগুলো উন্মুক্তভাবেই কাঠ/বাঁশ/ছনের মতো অগ্নিসংবেদনশীল নির্মাণসামগ্রীর সঙ্গে শুধু ক্লিপিং করে সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলে স্থাপিত তারগুলোতে পৃথক্করণ নিরোধক স্তর না থাকার কারণে শর্ট সার্কিট হলে মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়। উপরন্তু এসব সংবেদনশীল স্থাপনায় স্বয়ংক্রিয় অগ্নিশনাক্তকরণ এবং সুরক্ষাব্যবস্থাও সুদূর পরাহত। কী সাংঘাতিক কথা! এমনিতেই সাজেকের মতো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উঁচু স্থানে প্রাকৃতিক পানির উত্স না থাকায় রয়েছে পানির স্বল্পতা। এমন একটি জায়গায় এরকম সংবেদনশীল স্থাপনা নির্মাণ করে যেন ‘দুর্ঘটনা প্রবল অঞ্চল’ তৈরি করা হচ্ছে।
জানা যায়, সাজেকে আজ অব্দি পাঁচটি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রথম অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছিল ২০১৭ সালে। সবশেষ গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনায় প্রায় ১৪০টি রিসোর্ট-কটেজ, রেস্তোরাঁ, দোকান ও বসতঘর সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায়। এমন একটি অবস্থায় পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়ে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
প্রথমত, যে কোনো ইকো রিসোর্ট, বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের ইকো রিসোর্টে আগুন থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে টেকসই প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব নকশার সমন্বয়ের যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রথমেই নজর দিতে হবে নির্মাণসামগ্রীর বিষয়ে। আগুন প্রতিরোধের জন্য বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত কাঠ বা বাঁশ এসব রিসোর্ট নির্মাণে ব্যবহার করা উচিত। কাঠ/বাঁশ/বেড়ার দেওয়ালগুলোর মধ্যে নিরোধক বা ইন্স্যুলেশন ব্যবহার করলে শব্দ ও আগুন দুটোরই নিয়ন্ত্রিত পরিবহন নিশ্চিত করা যাবে। মাটির ঘর বা মাটি দিয়ে তৈরি দেওয়াল ব্যবহার করলেও এর পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি অগ্নিনিরোধী পরিবেশ দেওয়া সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে এসব পর্যটনকেন্দ্রের ল্যান্ডস্কেপ নকশার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের স্থাপনার চারপাশে প্রায় প্রতি দিনই গাছের শুকনো ঝরাপাতা জমা হয়, যা বেশ দাহ্য। তাই নিয়মিত এসব পাতা পরিষ্কার করা উচিত। আবার এসব স্থাপনার নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে যে বৈশিষ্ট্যের গাছ রোপণ করলে অগ্নিনিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে তেমন গাছ লাগাতে হবে। এমন সব গাছ নির্বাচন করা উচিত, যেসব গাছের পাতা সহজেই ঝরে পড়ে না (যেমন—কামিনী, গর্জন, চন্দন, নারিকেল)। যেসব গাছ যথেষ্ট পানি ধরে রাখতে পারে, এমন গাছও নির্বাচন করা যেতে পারে। পাথুরে হাঁটাপথ, পাথরের প্রাচীর একদিকে যেমন নান্দনিক ও প্রাকৃতিক নির্মিত পরিবেশ সৃষ্টি করবে, তেমনিভাবে পাথরেরর এসব উপকরণ Fire Breaker হিসেবে কাজ করে আগুন ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা হ্রাস করবে। সম্ভব হলে এসব কটেজের ছাদে গাছ লাগিয়ে যদি সবুজায়ন করা যায়, তাহলে তা তাপ ও আগুনপ্রতিরোধী হয়ে দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার উদ্রেক করবে। এ ধরনের প্রাকৃতিক রিসোর্ট সেন্টার স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক পানির উেসর ক্ষতিসাধন না করে তার কাছাকাছি স্থাপন করলে নিকটবর্তী প্রাকৃতিক পানির উত্স (পুকুর, ছরা, প্রপাত, হ্রদ) জরুরি প্রয়োজনে কাজে আসতে পারে।
তৃতীয়ত, যেহেতু সাজেকসহ অন্যান্য পার্বত্য অঞ্চলে পানির উেসর স্বল্পতা থাকে, তাই এ ধরনের পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনের সময় Rain Water Harvesting বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ পদ্ধতিতে প্রতিটি রিসোর্টে পানির আধার তৈরি করলে জরুরি পরিস্থিতিতে সেটি আগুন নেভানোর কাজে সহায়ক হবে। আবার সম্প্রতি মেঘ/কুয়াশা থেকে পানি সংগ্রহের পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির প্রচলন হয়েছে। এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে আমাদের দেশের পার্বত্য অঞ্চলের পর্যটনকেন্দ্র এবং বসতবাড়িতে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করলে এসব অঞ্চলের পানির সংকট অনেকাংশেই দূর করা সম্ভব।
সর্বোপরি, স্থায়ী উপাদানে নির্মিত স্থাপনার মতো এসব পর্যটনকেন্দ্রেও ধোঁয়া শনাক্তকারী ও স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, ড্রাই পাউডার বা শুষ্ক গুঁড়ো অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। জরুরি নির্গমনের নির্দেশিত পথ এবং আপত্কালীন উদ্ধারকারী যানবাহনের উপযোগী পথ তৈরিসহ সংবেদনশীল স্থানসমূহে বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপকের সহজলভ্যতা সঠিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং পর্যটকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করলে ক্ষয়ক্ষতি বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
লেখক :প্রতিষ্ঠাতা, আর্ক-বাংলা ডট কম

