বিশ্বে অভিবাসীর ইতিহাস সুপ্রাচীন। মানবজাতি বহুবিধ প্রয়োজনে এক দেশ হইতে অন্য দেশে অভিবাসন গ্রহণ করিয়া আসিতেছে। মূলত নিজ জীবনের নিরাপত্তা, আর্থসামাজিক নিশ্চয়তা, শান্তি ও সমৃদ্ধি-প্রভৃতি কারণে মানুষ অভিবাসন গ্রহণ করিয়া থাকে। আমরা যদি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করি, তাহা হইলে দেখিতে পাই, মানুষের অভিবাসনের পশ্চাতে রহিয়াছে ভালোবাসাও। আদিপিতা হজরত আদম (আ.) ও আদিমাতা হজরত বিবি হাওয়াকে (আ.) আল্লাহ তায়ালা জান্নাত হইতে এই ধূলির ধরায় পাঠাইলেন পৃথক দুই স্থানে।
ইতিহাসের বর্ণনা মোতাবেক একজনকে শ্রীলঙ্কায়, অন্যজনকে সৌদি আরবের জেদ্দায়। তাহার পর তাহারা হৃদয়ের টানে এই পৃথিবীতে একা বিচরণ করিতে করিতে বর্তমান সৌদি আরবের আরাফাত ময়দানে গিয়া মিলিত হইলেন। তাহারা যদি এই ভালোবাসার আকর্ষণে নিজ নিজ স্থান ত্যাগ করিয়া অন্যত্র না যাইতেন, তাহা হইলে এই পৃথিবীতে মানবজাতির বংশবৃদ্ধি ও এত বিচ্ছুরণ কি ঘটিত? ইহার পর কালের বিবর্তনে মানুষ গড়িয়া তুলিল বিভিন্ন সমাজ-সংসার, গোত্র, অঞ্চল ও দেশ। তৈরি করিল রাজনৈতিক মানচিত্র, ভিসা পদ্ধতিসহ নানা শাসন-অনুশাসন। তবে ইহার মধ্য দিয়া মানুষের স্বাধীন অভিবাসন হইয়া পড়িল নিয়ন্ত্রিত। অতঃপর ইন্টারনেটসহ বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারের ফলে যাতায়াতের প্রতিকূলতা ও সময়ের সীমাবদ্ধতা দূর হইয়া গেলে বিশ্ব আবার কার্যত ছোট্ট হইয়া আসিল। পরিণত হইল একটি গ্লোবাল ভিলেজ বা বৈশ্বিক গ্রামে।
এইরূপ গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বমোড়লগণ দাবি তুলিলেন পুঁজির চলাচলে কোনো বাধা থাকিবে না। তখন পালটা এমন দাবিও উঠিল-তাহা হইলে শ্রমের চলাচলে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকিতে পারিবে না। তাহারা এমনকি ভিসামুক্ত পৃথিবীর পক্ষে সোচ্চার হইলেন; কিন্তু সেই দাবি আজও পূরণ না হওয়ায় ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা থাকায় অভিবাসী সংকট ক্রমেই বাড়িতে থাকিল।
বিশ্বব্যাপী অভিবাসন লইয়া কাজ করে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা বা আইওএম। গত শুক্রবার এই সংস্থাটি এক প্রতিবেদনে জানাইয়াছে সেই দুর্ভোগ ও দুর্গতির কথা। তাহাদের মতে, অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য সবচাইতে বিপজ্জনক বৎসর ছিল গেল ২০২৪ সাল। কেননা এই বৎসরটিতে বিশ্ব জুড়িয়া বিভিন্ন অভিবাসন রুটে অন্তত ৯ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রাণ হারাইয়াছেন। গত এক দশকের মধ্যে ইহাই সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। জাতিসংঘ মৃত্যুর এই সংখ্যাটিকে ‘অগ্রহণযোগ্য এবং প্রতিরোধযোগ্য’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছে। বিশেষত ২০২০ সাল হইতে অভিবাসন রুটে মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণেরও অধিক বৃদ্ধি পাইয়াছে।
আরো উদ্বেগজনক বিষয় হইল, এই মৃত্যুর সংখ্যায় শীর্ষে রহিয়াছে এশিয়া মহাদেশ। মৃতের হিসাবে দ্বিতীয় অবস্থানে রহিয়াছে ভূমধ্যসাগর। আর মৃত্যুর তৃতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যা আফ্রিকায়। তবে এই পরিসংখ্যান বিভিন্ন দেশের সরকারি সূত্রে পাওয়া গিয়াছে। ফলে অভিবাসীদের মৃত্যু এবং নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা নিঃসন্দেহে আরো অনেক বেশি।
মানুষ কেন স্বদেশ ছাড়িয়া বিদেশমুখী হয়? বরাবরের মতো এই বৎসরও বিশ্বের সবচাইতে সুখী দেশের তালিকায় নাম লিখিয়াছে ফিনল্যান্ড; কিন্তু সেই দেশের মানুষের মধ্যে বিদেশমুখিতা বা তাহার প্রবণতা নাই বলিলেই চলে। একটি রাষ্ট্রে যখন নাগরিকগণ জীবনের নিরাপত্তা ও আর্থসামাজিক নিশ্চয়তা পান না, বেকারত্ব চরম সীমায় উপনীত হয়, মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সুখ, সমৃদ্ধি ও শান্তি বিপন্ন হয়, দেশে যুদ্ধবিগ্রহ পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন মানুষ সেই দেশ ছাড়িতে মরিয়া হইয়া উঠেন।
তাহারা জীবনের ঝুঁকি লইয়া বিদেশ পাড়ি দেন, চলার পথে নানাভাবে প্রতারণার শিকার হন, এমনকি গভীর সমুদ্রে কখনো কখনো তাহাদের সলিল সমাধিও হয়। অথচ প্রতিটি রাষ্ট্র নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলি পূরণ করিতে পারিলে এমন হতাশাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হইত না। বাংলাদেশেরও অনেক তরুণ-তরুণী এমন নির্মম ও হতভাগ্য পরিণতি বরণ করিয়াছেন।
আইওএমের হিসাব অনুযায়ী-২০১৪ সাল হইতে এখন পর্যন্ত ৭৪ হাজারের অধিক অভিবাসী মারা গিয়াছেন বা নিখোঁজ হইয়াছেন। এই জন্য বিশ্বনেতৃবৃন্দের উচিত-শ্রমের বিশ্বায়ন নিশ্চিত করিয়া অভিবাসন প্রক্রিয়াকে সহজতর করা। ইহার পাশাপাশি প্রতিটি দেশের শাসকদের উচিত নিজ নিজ নাগরিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন মৌলিক এবং গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকারগুলি নিশ্চিত করা: কিন্তু এই ব্যাপারে তাহাদের বোধোদয় হইবে কখন?
