পারমাণবিক পরীক্ষাবিরোধী দিবস প্রসঙ্গে

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৫, ০৬:০০

সার বিশ্বে ২৯ আগস্ট পারমাণবিক পরীক্ষাবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য বিশ্ববাসীর মধ্যে পরমাণু অস্ত্রবিরোধী সচেতনতা গড়ে তোলা। ২০০৯ সালের ২ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ সভার ৬৪তম অধিবেশনে দিনটি ঘোষণা করা হয়।

এই দিনে, জাতিসংঘ একটি ইভেন্টের আয়োজন করে, যা পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা এবং বিস্ফোরণের প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করে এবং এই ধরনের পারমাণবিক পরীক্ষা বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তাকে আরো হাইলাইট করে।

বেশির ভাগ দেশ যারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে তারা তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের কার্যকারিতা এবং বিস্ফোরক ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য পরমাণু পরীক্ষা চালায়। পারমাণবিক পরীক্ষা একটি দেশের পারমাণবিক শক্তির লক্ষণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম ১৯৪৫ সালের জুলাই মাসে এবং ১৯৪৯ সালে প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক পরীক্ষা করে। এটি ১৯৫২ সালে যুক্তরাজ্য, ১৯৬০ সালে ফ্রান্স এবং ১৯৬৪ সালে চীন এ পথ অনুসরণ করে। ভারত প্রথম বার পরীক্ষা করেছিল ১৯৭৪ সালে।

জাতিসংঘের রেজ্যুলেশনে 'পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার বিস্ফোরণ বা অন্য কোনো পারমাণবিক বিস্ফোরণের প্রভাব এবং পারমাণবিক অস্ত্র-মুক্ত বিশ্বের লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম উপায় হিসেবে পরীক্ষা বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা এবং শিক্ষা বৃদ্ধির আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রস্তাবনায় জোর দেওয়া হয়েছে যে 'মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের ওপর ধ্বংসাত্মক এবং ক্ষতিকারক প্রভাব এড়াতে পারমাণবিক পরীক্ষা বন্ধ করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করা উচিত।'

ট্রিনিটি নামক প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষাটি ১৬ জুলাই, ১৯৪৫ সালে নিউ মেক্সিকোতে একটি মরুভূমিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। ম্যানহাটন প্রকল্পের জে রবার্ট ওপেনহেইমারের অধীনে পারমাণবিক প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছিল। প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষার পর, ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট যথাক্রমে হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলা হয়, যা কয়েক লক্ষ মানুষের জীবন থামিয়ে দেয়। জাপানের সেই শহরগুলোর পরের প্রজন্মগুলো বিকিরণ-প্ররোচিত ক্যানসার এবং জন্মগত ত্রুটিতে ভুগছিল।

পরবর্তী সময়ে, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন শীতল যুদ্ধের পর্বে (১৯৪৭-১৯৯১) যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা দেখা যায়।
পারমাণবিক পরীক্ষা স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনে। কারণ এটি তেজস্ক্রিয় পদার্থ নির্গত করে, যা সাধারণত বাতাসে এবং পৃথিবীর পৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৫ সাল থেকে বায়ুমণ্ডলে, ভূগর্ভস্থ বা জলের নিচে সমস্ত পরিবেশে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করা হয়েছে। এই পরীক্ষার অবশিষ্ট বর্জ্য অনেক বছর ধরে থাকে। বিকিরণের এক্সপোজার অঙ্গ, হাড়, ত্বক এবং চোখের ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে, লিউকেমিয়া, থাইরয়েড, ফুসফুস এবং স্তন ক্যানসারের মতো ক্যানসারের প্রকোপ বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত। বিকিরণ একজন ব্যক্তির জিনেও মিউটেশন ঘটাতে পারে, সন্তানদের মধ্যে প্রবাহিত হতে পারে। ভূপৃষ্ঠের তেজস্ক্রিয় পদার্থ উদ্ভিদের শিকড়ে প্রবেশ করতে পারে এবং ফলস্বরূপ প্রাণীদের দ্বারা গ্রাস করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা তার ছাপ ফেলেছিল পুরো বিশ্বে। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি এয়ার ফোর্সের একটি বিমান থেকে 'লিটল বয়' এবং ৯ আগস্ট 'ফ্যাট ম্যান' নামে দুটি বোমা ফেলা হয় জাপানের যথাক্রমে হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে। আদর করে 'ফ্যাট ম্যান' ও 'লিটল বয়' নাম রাখা হলেও এ দুটি বোমার ধ্বংসলীলায় পুরো বিশ্ব হতবাক হয়ে পড়ে। এর তেজস্ক্রিয়তা এখনো বিদ্যমান। যুদ্ধে একসঙ্গে এত করুণ মৃত্যু ইতিহাসে বিরল। বিশ্বকে যেন আর এমন বীভৎসতার মধ্য দিয়ে যেতে না হয়, সেজন্য পারমাণবিক বোমার উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধের প্রশ্নে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই আলোচনা চলছে।

পারমাণবিক অস্ত্রের ভান্ডার যাদের রয়েছে, সেই দেশগুলোরও উৎপাদন সীমিত করার প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে আসে আলোচনায়। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পারমাণবিক বোমা আবিষ্কার ও ব্যবহারের পর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ২৯ আগস্ট, ১৯৪৯ সালে প্রথম বারের মতো এ অস্ত্র পরীক্ষা সম্পন্ন করে। এরপর ১৯৬১ সালের অক্টোবরে সোভিয়েত ইউনিয়নের চালানো আরেকটি পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণে তৈরি হয় মাশরুম আকৃতির বিরাট কৃত্রিম মেঘমালা; যা দেখা যায় ১৬০ কিলোমিটার দূর থেকেও। পারমাণবিক বোমার মারাত্মক ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করেও এর উৎপাদন ও মজুত থেকে পিছিয়ে আসেনি বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন যেমন পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষাকার্য অব্যাহত গতিতে চালাতে থাকে, সে ধারায়ই অংশ নিয়ে একে একে আরো ছয়টি দেশ গড়ে তোলে পারমাণবিক অস্ত্রের ভান্ডার। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া নিয়ে ঘোষিত পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র আটটি।ইসরাইল পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন ও মজুত গড়ে তুললে প্রকাশ্যে তা স্বীকার করেনি।

হিরোশিমা-নাগাসাকি মানব জাতির ইতিহাসে দগদগে ঘা সত্ত্বেও পরমাণু অস্ত্রে শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের অস্ত্রভান্ডার থেকে পরমাণু শক্তি কমাতে চায় না। পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারই শুধু নয়, তার পরীক্ষায় সরাসরি মানুষের মৃত্যু না হলেও এর বিপুল ক্ষতি সহ্য করতে হয় প্রকৃতিকে। যার প্রভাব পড়ে মানবদেহেও। এজন্যই জাতিসংঘের ৬৪তম অধিবেশনে কাজাখস্তানের প্রস্তাবে প্রতি বছর ২৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পরীক্ষাবিরোধী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কাজাখস্তান প্রস্তাবটি এনেছিল ১৯৯১ সালের ২৯ আগস্ট তাদের পারমাণবিক পরীক্ষার সাইট বন্ধের কথা স্মরণ করে। এরপর ১৯৯৬ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি উত্থাপন হলেও মানব জাতির দুর্ভাগ্য, চুক্তিটিতে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর একটি অংশ, যাদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা রয়েছে, তারা স্বাক্ষর করেনি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই চুক্তিটি কার্যকর হতে পারেনি।

জলবায়ু পরিবর্তন যে সংকটের বার্তা প্রকাশ করছে, সেদিকে নজর না দিয়ে, ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে না দিয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থের বিনিয়োগে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো মজুত করছে হাজার হাজার পারমাণবিক অস্ত্র। যাদের হাতে এ অস্ত্র নেই, তারাও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এই প্রাণঘাতী অস্ত্রভান্ডারে যোগ করতে মরিয়া হয়ে উঠছে। কিন্তু তা প্রয়োগ হবে কার বিরুদ্ধে? মানবসভ্যতা ধ্বংসের জন্যই তো!

সম্প্রতি পশ্চিমা মদতপুষ্ট রাষ্ট্র ইসরাইল কাপুরুষোচিতভাবে ইরানে হামলা চালিয়ে ইরানের সাহসী প্রতিরোধের শিকার হয়েছে। ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে টানা ১২ দিনের সংঘর্ষ ঘটে। এই সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছিল। এই সংঘাত নতুন করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, কোন কোন দেশ পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক এবং এই অস্ত্রগুলো কোথায় সংরক্ষিত রয়েছে?

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসঅঅইপিআরআই) ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টস (এফএএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে বিশ্বে ৯টি দেশের কাছে প্রায় ১২ হাজার ২৪১টি পারমাণবিক ওয়ারহেড (ক্ষেপণাস্ত্র) রয়েছে বলে জানা যায়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হাতে রয়েছে বিশ্বের ৮৭ শতাংশ পারমাণবিক অস্ত্র। বাকি সাতটি দেশ-ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া ও ইসরাইল ১৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

অনেক পারমাণবিক ওয়ারহেডের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও সেগুলো নিষ্ক্রিয় করা হয়নি। প্রায় ৯ হাজার ৬১৪টি ওয়ারহেড সক্রিয় সামরিক ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত, যার মধ্যে ৩ হাজার ৯১২টি মোতায়েনকৃত কৌশলগত ও অ-কৌশলগত ওয়ারহেড হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ এসব ওয়ারহেড আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র, বোমারু বিমান ঘাঁটিতে সক্রিয় অবস্থায় আছে। (বাকি অংশ আগামীকাল)

লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন