জনজীবন জিম্মি করতে আনলাকি থার্টিন?

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২৫, ১৩:০৬

চলো চলো জিরো পয়েন্টে চলো, আসো আসো বত্রিশে আসো – আওয়াজে দুবার প্যানিক তোলার চেষ্টা কেবল ব্যর্থ হয়নি, আবেগী কর্মীদের ডেকে এনে মার খাওয়ানো হয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের আবারও সেই ধাঁচের চেষ্টা ১৩ নভেম্বর। দিনটিতে সাব্যস্ত হবে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে করা মামলার রায়ের তারিখ তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারকাজ শেষ প্রায় । রায় কবে হবে, তা জানাতে ১৩ নভেম্বর তারিখ রাখা হয়েছে।

তারিখটি ঘনিয়ে আসায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ দুষ্টুবুদ্ধিতে অনলাইনে ঘোষণা দিয়েছে, ১৩ নভেম্বর ঢাকা 'লকডাউন' করার। দিনটি সামনে রেখে তাদের গুপ্ত আয়োজন আর গুপ্ত থাকেনি। এ ব্যাপারে সরকারের মনোভাব স্পষ্ট । বারে বৃহস্পতি হলেও দিনটিতে কার জন্য কী শনি বা মঙ্গল অপেক্ষা করছে, সেই আলামত এরই মধ্যে পরিষ্কার। বহিরাগত ও অপরিচিতদের আনাগোনা দৃষ্টে সুপ্রিম কোর্ট কম্পাউন্ড, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, বার অ্যাসোসিয়েশন ভবন সংশ্লিষ্ট এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে জাতীয় ঈদগাহ মাঠে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে কোর্ট প্রশাসন ।

সোমবার সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি রেজিস্ট্রার ডক্টর মো. আতিকস সামাদের সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা দিয়ে জানানো হয়েছে, জাতীয় ঈদগাহ মাঠ ও প্রধান বিচারপতির সুপ্রিম কোর্টে প্রবেশের জন্য ব্যবহৃত মূল ফটক সংলগ্ন ফোয়ারা এলাকায় বহিরাগত ও অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা বেড়েছে। এটা বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। ১৩ নভেম্বরের 'লকডাউন কর্মসূচি' কঠোরভাবে মোকাবিলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ, দলটির সমর্থক এবং গণহত্যাকারী নেতারা মনে করছেন, এটি ২০০৬-এর সেই লগি-বৈঠার ২৮ অক্টোবর। তাদের ভাবনা, প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষ হত্যার পর রাস্তা দখল করার জন্য হাজার-হাজার দুর্বৃত্তের দলকে ঢাকায় পাঠাবেন । তিনি বলেছেন, জুলাই বিপ্লবীদের ধৈর্য পরীক্ষা করবেন না। ভয় ও দখলদারিত্বের সময় আর নেই । আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতিও ব্যাপক ।

কর্মসূচিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ নিজেদের সক্ষমতা ও পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করতেই পারে। হতে পারে সামনে বড় কোনো কর্মসূচির রিহার্সালও। গেল বছরের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুতির পর দলীয় অন্তঃপ্রাণদের অনিরাপদে ফেলে রেখে আওয়ামী লীগের দুষ্ট তথা দুষ্কর্মে লিপ্ত শীর্ষ নেতৃত্বের বিরাট অংশই পলাতক। কিছু সংখ্যকের ঠাঁই কারাগারে। বিদেশে আয়েশে থাকা পলাতকদের কেউ কেউ মাঝেমধ্যেই অডিও-ভিডিওতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভ্যাংচি কাটছেন। এর মধ্যেই ছোটখাটো কিছু ঝটিকা মিছিল। উদ্দেশ্য হাইপ তোলা, জনমনে ভয় জাগানো। আওয়ামী লীগের ব্যাপক জনপ্রিয়তা জানান দেওয়া। প্রকারান্তরে দলের আবেগী এবং সরলপ্রাণদের রাস্তায় নামিয়ে এনে মার খাওয়ানো। এতে ব্যাপক ফায়দা আশা করছে আওয়ামী লীগে ফেরার নেতৃত্ব।

চলমান ট্রাইব্যুনালকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট' নামে ব্যাপক প্রচার করছে আওয়ামী লীগ। দলের পলাতক সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের একটি বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে, যেখানে তিনি বলছেন, জনগণ এই ক্যাঙ্গারু কোর্টের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। বিদেশে আরেক পলাতক জাহাঙ্গীর কবির নানকের একটি ভিডিও ভ্যাংচিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছাড়া হয়েছে। সেখানে তিনি দরাজ গলায় লকডাউন কর্মসূচি সফলের আহ্বান জানিয়েছেন । বিদেশি গণমাধ্যমে দেওয়া শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার তো রয়েছেই। বলা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট রিপোর্টাররা সরাসরি শেখ হাসিনার কাছে গিয়ে সেই সাক্ষাৎকার নেননি। বরং পুরো কাজটি হয়েছে অনলাইনে। আলামতে স্পষ্ট—নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, এসব তৎপরতা বাড়তে থাকবে। পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে আরো যা দরকার, কিছুই বাদ রাখা হবে না। সেসঙ্গে ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলো সংঘাতে জড়ালে কেবল নির্বাচন ব্যাহত নয়, দেশও চরম অস্থিরতায় পড়বে। জনগণ পড়ে যাবে জিম্মিদশায় ।

অভ্যুত্থানে বিতাড়নের পরও ফিরে আসা বা প্রাসঙ্গিক থাকার চেষ্টা আওয়ামী লীগ করবে; এটাই স্বাভাবিক । সেক্ষেত্রে দেশে অস্থিরতাই দলটির প্রধান কামনা ও চেষ্টা । শেখ হাসিনা পালালেও কাছেই আছেন। যে কোনো সময় ভারত থেকে চট করে চলে আসার একটি বার্তা তিনি দিয়েই রেখেছেন। ভারত ঐতিহাসিকভাবে কেবল তার আশ্রয়দাতা নয়, প্রশ্রয়দাতা তথা ভ্রসাও। তার পতনের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। এটি তার জন্য যারপরনাই আশা জাগানিয়া। দেশে আশাবাদ কোথায়? মানুষকে জয় করে নাকি ত্যক্ত- বিরক্ত বা জিম্মি করে ? যে কারণে প্রশ্ন ঘুরছে, ১৩ নভেম্বর কি আওয়ামী লীগ ঘোষিত লকডাউনে সাধারণ মানুষ বা তার দলের কর্মী-সমর্থকরাও
সাড়া দেবে? নৈরাজ্য যেন মাথা চাড়া দিতে না পারে, এ ব্যাপারে সরকার, সাধারণ মানুষ, এমনকি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অন্যতম স্টেকহোল্ডার সেনাবাহিনী একটি জায়গায় ঐকমত্যে শামিল। কোনো অজুহাতে যেন ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বানচাল না হয়—এ তাগিদও রয়েছে। এর মধ্যে আনলাকি থার্টিন ভর করা সবার জন্যই আপদের; বিপদেরও। সরকারের দিক থেকে অভয় দেওয়া হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরও বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে প্রয়োজনীয় নজরদারি ও আগাম তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা তৎপরতায় কোনো ঘাটতি নেই। এমন ভরসা ও অভয়ের পরও আনলাকি থার্টিন বলে কথা। আওয়ামী লীগও আর দলের বৈশিষ্ট্য রাখেনি। ক্ষমা দূরে থাক, দেড় হাজার ছাত্র-জনতাকে খুন, কয়েক হাজার মানুষকে পঙ্গু করার সামান্যতম দুঃখবোধও তাদের নেই। এর পরও ১৩ বলে কথা। 'আনলাকি থার্টিন' বলতে ১৩ সংখ্যাটিকে দুর্ভাগ্যজনক বা অশুভ বলে মনে করাকে বোঝায়। ১৩ সংখ্যাটিকে দুর্ভাগ্যজনক মনে করার এ ধারণাটি অনেক সংস্কৃতিতে প্রচলিত । কেবল বাংলাদেশ নয়, আধুনিক বিশ্বের সভ্য- শিক্ষিত অনেক দেশেও ১৩ সংখ্যা বা তারিখটিকে অপয়া ভাবার দৃষ্টান্ত রয়েছে । কয়েকটি দেশে অনেক বড় হোটেল বা ভবনে ১৩ তলা থাকে না । ১৩ সংখ্যাকে ভয় পাওয়ার এই মানসিক অবস্থাকে 'ট্রাইস্কাইডেকাফোবিয়া' বলা হয়, যা এসেছে গ্রিক শব্দ থেকে। এর পেছনের কারণ হিসেবে মূলত খ্রিষ্টধর্মের শেষ নৈশভোজের ঘটনাকে উল্লেখ করা হয়, যেখানে যিশুর সঙ্গে ১৩ জন অতিথি ছিল এবং তাদের মধ্যে ১৩তম অতিথি জুডাস ছিলেন, যিনি পরে যিশুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। এছাড়া, নর্স পুরাণে দেবতা লোকিকেও ১৩তম অতিথি হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যিনি ভালহাল্লার এক ভোজসভায় এসে গন্ডগোল সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু, প্রচলিত ধারণায় ১৩-এর কল্পিত দুর্ভাগ্যের জন্য কয়েকটি উৎসকে দায়ী করা হয় । দৃশ্যত বাংলাদেশে সেই নমুনা না থাকলেও উৎসগতভাবে ফ্যাসিজম ক্ষমতাচ্যুত হলেও হারিয়ে যায়নি। তাই সতর্কতার সমান্তরালে জাতীয় ঐক্যের এত তাগিদ ও আবশ্যকতা।

লেখক : সাংবাদিক

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন