তরুণদের চোখকে ফাঁকি দেওয়া যায় না

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৪০

রাজনীতির একটি চিরন্তন সত্য হইল, ক্ষমতাসীনরা অনেক সময় নিজেদের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হইয়া পড়েন। তাহারা ভাবেন, রাষ্ট্রক্ষমতা, প্রচারযন্ত্র, রাজনৈতিক সংগঠন এবং বিপুল অর্থবিত্তের জোরে জনমতকে নিজেদের অনুকূলে রাখা সম্ভব; কিন্তু ব্যালট বাক্সে যখন মানুষের প্রকৃত অসন্তোষের প্রতিফলন ঘটে, তখন সেই আত্মবিশ্বাসের ভিত মুহূর্তেই ভাঙিয়া পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক মধ্যবর্তী নির্বাচন তাহারই একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। বিশেষত, এই নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের অবস্থান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাহার রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয় ডাকিয়া আনিয়াছে। 

নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হইয়াছে, ট্রাম্পকে রুখিয়া দিয়াছে তরুণদের ভোট। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, ভবিষ্যৎ লইয়া অনিশ্চয়তা এবং পুরাতন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি বিরক্তি তরুণদের ভোটের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করিয়াছে। প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে ১৮ হইতে ২৯ বৎসর বয়সি ভোটারদের মধ্যে দুই দলের ভোটের ব্যবধান প্রায় ৪০ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের অনুকূলে গিয়াছে। তরুণ পুরুষের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের মাত্রা ছিল ৩৯ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ২৭ শতাংশ। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যেই তরুণ পুরুষের একটি বড় অংশ ট্রাম্পকে সমর্থন করিয়াছিল, তাহাদের মধ্যেও সমর্থনের এই নাটকীয় পরিবর্তন বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

অথচ এই পরিবর্তনের পূর্বাভাস মিলিয়াছিল অনেক পূর্বেই। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘Young Voters Are Turning Away From Trump. Here's Why.’ অর্থাৎ, তরুণ ভোটাররা ট্রাম্পের দিক হইতে মুখ ফিরাইতেছেন। প্রতিবেদনটিতে বিভিন্ন জনমত জরিপের পরিসংখ্যান তুলিয়া ধরিয়া দেখানো হইয়াছিল, তরুণদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা দ্রুত কমিতেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ১৮ হইতে ২৯ বৎসর বয়সিদের মধ্যে তাহার সমর্থন ছিল ৩৯ শতাংশ। অথচ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইকোনমিস্ট জরিপে এই বয়সিদের মধ্যে তাহার প্রতি সমর্থন নামিয়া আসে মাত্র ২৫ শতাংশে। ৬৭ শতাংশ তাহার কর্মকাণ্ডের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

প্রশ্ন হইল, এত অল্প সময়ের মধ্যে তরুণদের মনোভাবের এই পরিবর্তন কেন ঘটিল? টাইমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনীতি, অভিবাসননীতি এবং পররাষ্ট্রনীতি-প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ট্রাম্প প্রশাসনের উপর তরুণদের অসন্তোষ বাড়িয়াছে। অন্যদিকে, নিউ ইয়র্ক টাইমসের নির্বাচনি বিশ্লেষণে বাড়িভাড়া, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং ইরান যুদ্ধ ও ইসরায়েলনীতি লইয়া অসন্তোষের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। অর্থাৎ, তরুণেরা রাজনৈতিক স্লোগানের চাইতে নিজেদের জীবনের বাস্তব হিসাবকে অধিক গুরুত্ব দিয়াছেন। তাহাদের কাছে রাজনীতির মূল্যায়ন হইয়াছে দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতায়। এইখানেই রাজনীতিকদের জন্য বড় শিক্ষা রহিয়াছে। তরুণেরা যে সকল সময় একই রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী থাকেন, তাহা নহে। ২০২৪ সালে যাহারা ট্রাম্পকে ভোট দিয়াছিলেন, তাহারাই ২০২৬ সালে তাহার বিরোধিতা করিয়াছেন। আবার ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিলেও তাহাদের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য ঘোষণা করেন নাই। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা প্রতিশ্রুতি পালন করিতেছেন কি না, তাহাও তাহারা পর্যবেক্ষণ করিবেন।

এই প্রবণতা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। নিউ ইয়র্ক টাইমস বাংলাদেশ, ভারত, সার্বিয়া ও ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে তরুণদের অসন্তোষ ও আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলিয়াছে। কর্মসংস্থানের সংকট, আবাসনের অসাধ্য ব্যয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার চাপ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে ভবিষ্যৎ কর্মজীবন লইয়া অনিশ্চয়তা তরুণদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করিতেছে। পুরাতন প্রজন্মের অর্জিত সুযোগ-সুবিধার তুলনায় নিজেদের বঞ্চনাও তাহাদের ক্ষুব্ধ করিতেছে। তরুণেরা ভুল করেন না, এমন নহে। আবেগ, অপরিপক্বতা কিংবা সাময়িক জনপ্রিয়তার মোহ তাহাদের সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করিতে পারে; কিন্তু তাহাদের একটি বড় শক্তি হইল, তাহারা ভবিষ্যৎকে বর্তমানের মধ্যেই খুঁজিয়া বেড়ান। তাহাদের সিংহভাগ আত্মমগ্ন থাকিবার পরিবর্তে সচেতনতার কষ্টিপাথরে যে কোনো কিছু যাচাই করিতে সক্ষম। তাহারা নিজেদের সংশোধন করিতেই দ্বিধা করে না। সুতরাং তরুণদের চোখকে ফাঁকি দেওয়া চলে না।

ইত্তেফাক/এমএস